স্মার্ট সাবমিশন সিস্টেমে রিপোর্ট জমা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব
- দুই বছরেও প্ল্যাটফর্মের আওতায় আসেনি সব কোম্পানি
- সচেতনতা ও যোগাযোগের অভাবই প্রধান কারণ

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন ও মূল্য সংবেদনশীল তথ্য (পিএসআই) জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে চালু করা হয়েছিল ‘স্মার্ট সাবমিশন সিস্টেম (এসএসএস)’। কিন্তু দুই বছর পার হলেও এখনো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কোম্পানি এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে না। এতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে সময়মতো তথ্য পৌঁছানো এবং বিনিয়োগকারীদের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এই বাস্তবতায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) চায়—তালিকাভুক্ত সব কোম্পানির জন্য এসএসএসের মাধ্যমে রিপোর্ট জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হোক।
গত ১৯ এপ্রিল বিষয়টি নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিএসইসির কমিশনার মো. সাইফউদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় ডিএসই ও সিএসইর প্রতিনিধিরা জানান, এসএসএস পুরোপুরি কার্যকর করা গেলে শেয়ারবাজারে তথ্য প্রকাশ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়বে। একই সঙ্গে কোম্পানিগুলোর তথ্য জমা দেওয়ার সময়ক্ষেপণ ও অসামঞ্জস্যতাও কমে আসবে।
জানা গেছে, বিএসইসির নির্দেশনায় ডিএসই ‘স্মার্ট সাবমিশন সিস্টেম’ তৈরি করে। ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফান্ডামেন্টাল ও নিউজ মডিউল’ চালুর মাধ্যমে এই প্ল্যাটফর্মের যাত্রা শুরু হয়। পরে এতে ত্রৈমাসিক ও বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন জমার সুবিধাও যুক্ত করা হয়। বর্তমানে প্রযুক্তিগতভাবে সিস্টেমটি সচল ও কার্যকর রয়েছে। তবে বাস্তবে এখনো অনেক কোম্পানি এসএসএস ব্যবহার করে নিয়মিত রেগুলেটরি রিপোর্ট জমা দিচ্ছে না। ডিএসইর পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, একসঙ্গে দুটি প্ল্যাটফর্ম (ম্যানুয়াল ও ডিজিটাল) চালু থাকা এবং এসএসএস সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতনতা ও যোগাযোগের অভাবই এর প্রধান কারণ।
বর্তমানে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশ এসএসএস প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়েছে। কিছু কোম্পানি এই সিস্টেম ব্যবহার করে তাদের মতামতও দিয়েছে। তবে ডিএসই জানিয়েছে, অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো নিয়মিতভাবে আর্থিক প্রতিবেদন, পিএসআই ও অন্যান্য রেগুলেটরি রিপোর্ট জমা দিচ্ছে না।
এ পরিস্থিতিতে ডিএসই প্রস্তাব দিয়েছে যে, ডিএসই ও সিএসইর মূল মার্কেটে তালিকাভুক্ত সব কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন, পিএসআই এবং অন্যান্য করপোরেট তথ্য শুধু এসএসএসের মাধ্যমেই জমা দেওয়ার বিষয়ে বিএসইসির একটি আনুষ্ঠানিক আদেশ জারি করা প্রয়োজন। ডিএসইর মতে, এমন নির্দেশনা জারি হলে সিস্টেমটির বাস্তবায়ন দ্রুত হবে এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর নিয়ম পরিপালনও নিশ্চিত হবে।
সভায় বিএসইসির পক্ষ থেকে জানানো হয়, শুধু প্রযুক্তি চালু করলেই হবে না, ইস্যুকারী কোম্পানিগুলোকে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। কোনো বাধ্যতামূলক নির্দেশনার আগে ডিএসইকে কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমেই ইস্যুকারীদের এই প্ল্যাটফর্মে অভ্যস্ত করে তোলা সম্ভব। এ ছাড়া একটি কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা ও পারফরম্যান্স মূল্যায়নের জন্য শুধু বর্তমান তথ্য নয়, অতীতের তথ্যও সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এতে বিনিয়োগকারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা উভয়েই কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক আচরণ বিশ্লেষণ করতে পারবে।
সূত্রে জানা গেছে, সভায় আলোচনা শেষে বাজারের শৃঙ্খলা ও আধুনিকায়ন নিশ্চিত করতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রথমত, এসএসএস সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে ডিএসইকে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ চালিয়ে যেতে হবে। দ্বিতীয়ত, এসএসএস বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং বর্তমানে কত কোম্পানি নিয়মিতভাবে সিস্টেম ব্যবহার করছে—সে বিষয়ে কমিশনকে নিয়মিত রিপোর্ট দিতে হবে ডিএসইকে। প্রয়োজনীয় সচেতনতা তৈরির পর শিগগিরই একটি আদেশের মাধ্যমে শুধু ডিজিটাল পদ্ধতি কার্যকর করা হবে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে দীর্ঘদিন ধরেই তথ্য প্রকাশে বিলম্ব, অসম্পূর্ণ তথ্য প্রদান এবং ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমে তথ্য জমার কারণে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এসএসএস পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে এই অস্বচ্ছতা অনেকটাই কমবে। তবে এ জন্য শুধু প্রযুক্তি নয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোরতা ও কোম্পানিগুলোর সদিচ্ছাও জরুরি।
প্রসঙ্গত, স্মার্ট সাবমিশন সিস্টেমে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মূল্য সংবেদনশীল তথ্য, রেগুলেটরি রিপোর্ট, আর্থিক বিবরণী ও প্রয়োজনীয় নথি সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জমা দেওয়া যাবে। এর ফলে হার্ড কপি সাবমিশন পদ্ধতি পুরোপুরি বাতিলের পথ সুগম হবে। এতে স্টেকহোল্ডারদের সময়, ব্যয় ও নথি-জট উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং তথ্য ব্যবস্থাপনা হবে নিরাপদ ও দ্রুত। পাশাপাশি কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতেও এ প্ল্যাটফর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এম সাইফুর রহমান মজুমদার আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘স্মার্ট সাবমিশন সিস্টেম এখনো পরীক্ষামূলকভাবে চলছে। এটা দ্রুত বাধ্যতামূলক করা জরুরি। বিএসইসিকে জানানো হয়েছে, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো তাদের প্রয়োজনীয় সব তথ্য এ প্ল্যাটফর্মে জমা দিলে সময় ও ব্যয়- দুটোই কমবে।
বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম আগামীর সময়কে বলেছেন, 'এটা প্রক্রীয়াধীন আছে। এখন ট্রায়াল অ্যান্ড এরর ভিত্তিতে দেখা হচ্ছে। খুব শিগগিরই এ সিস্টেমকে বাধ্যতামূলক করে আদেশ জারি করা হবে।'




