ব্যবসা উন্নয়ন সূচকে অবনতি
- গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটকে দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শিল্প খাতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও টেকসই বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ী এবং নীতিনির্ধারকরা। একই সঙ্গে শিল্প খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশল প্রণয়ন, রপ্তানিমুখী শিল্পে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং লোডশেডিংয়ের আগাম ও নির্ভরযোগ্য সূচি প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে।
গতকাল রবিবার রাজধানীর গুলশানে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) সম্মেলনকক্ষে ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চ্যালেঞ্জ: উন্নত ব্যবসায়িক পরিবেশের জন্য নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বললেন ব্যবসায়ী এবং বিশেষজ্ঞরা। এমসিসিআই ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ যৌথভাবে অস্ট্রেলিয়া সরকারের ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেডের সহায়তায় এ গোলটেবিলের আয়োজন করে। আলোচনায় বাংলাদেশ বিজনেস ইনডেক্স (বিবিএক্স) ২০২৪-২৫-এর তথ্য তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায়, ব্যবসায়িক অবকাঠামো সূচক ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ৭১ দশমিক ১ থেকে কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬৮ দশমিক ৮-এ নেমেছে।
বিবিএক্সের তথ্য অনুযায়ী, ৭৪ দশমিক ২ শতাংশ ব্যবসায়ী কোনো না কোনো সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। বিপরীতে মাত্র ২০ দশমিক ১ শতাংশ ব্যবসায়ী অবকাঠামো উন্নয়নে কাঠামোগত বা নিয়ন্ত্রক উদ্যোগ দেখতে পেয়েছেন। ফার্মাসিউটিক্যালস ও কেমিক্যাল এবং ইলেকট্রনিকস ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাটে তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আলোচনায় বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে চলা গ্যাস সংকট, কম গ্যাসের চাপ, জ্বালানি সরবরাহে সীমাবদ্ধতা, বাড়তি জ্বালানি ব্যয় ও বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন শিল্প উৎপাদন, ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং বিনিয়োগ পরিকল্পনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আগস্টের শুরুতে দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। পাশাপাশি গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানাকে উৎপাদন কমাতে বা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে।
গোলটেবিলের প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল, লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী, ইএসটেক্স ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. ইজাজ হোসেন এবং বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মইনুল ইসলাম। আলোচনা সঞ্চালনা করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম মাসরুর রিয়াজ।
মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী বললেন, বিদ্যমান শিল্প বিনিয়োগ সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহের বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য ও পূর্বানুমানযোগ্য পরিকল্পনা প্রয়োজন। এজন্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং টেকসই উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের একটি সুস্পষ্ট জ্বালানি কৌশল প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সিরামিক শিল্পের জন্য গ্যাসকে শুধু জ্বালানি নয়, উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উপকরণ হিসেবে উল্লেখ করেন মইনুল ইসলাম। দীর্ঘদিন গ্যাস সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ হুমকির মুখে পড়বে বলে সতর্ক করেন তিনি।
ড. ইজাজ হোসেন বললেন, জ্বালানি সংকট এখন শুধু সরবরাহের সমস্যা নয়, এটি অর্থনীতি ও পরিকল্পনারও বড় চ্যালেঞ্জ। এ সংকট মোকাবিলায় জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ, জ্বালানি বরাদ্দ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বাস্তবসম্মত জ্বালানি মিশ্রণের দিকে নজর দিতে হবে।
বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বললেন, শিল্পের জন্য একটি পৃথক জ্বালানি নীতি প্রণয়নের পাশাপাশি জ্বালানিনির্ভর ও রপ্তানিমুখী শিল্পকে সুরক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বললেন, কম গ্যাসের চাপ ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিকল্প ব্যয়বহুল জ্বালানি ব্যবহারের কারণে রপ্তানিকারকদের ওপর চাপ বাড়ছে। এ অবস্থায় রপ্তানিমুখী শিল্প ও বড় শিল্পাঞ্চলগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ এবং কারখানাগুলোকে উৎপাদন পরিকল্পনার সুযোগ দিতে আগাম ও বিশ্বাসযোগ্য লোডশেডিং সূচি প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়।
বৈঠকে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক ফজলুল হক অতিথির বক্তব্য দেন। সমাপনী বক্তব্য দেন এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি. রহমান।







