ঈদের ছুটিতে কক্সবাজারে উপচে পড়া ভিড়

ছবি: আগামীর সময়
ঈদুল আজহার ছুটি ঘিরে দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজারে নেমেছে পর্যটকের ঢল। ঈদের দ্বিতীয় দিন থেকে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতসহ জেলার বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। গত দুই দিনে অন্তত দুই লাখ পর্যটক কক্সবাজারে ভ্রমণ করেছেন বলে জানিয়েছেন পর্যটন সংশ্লিষ্টরা। আর পুরো আট দিনের ছুটিতে এ সংখ্যা সাত লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশা করছেন তারা।
পর্যটকরা উপভোগ করছেন সমুদ্রস্নান। পাহাড়-ঝরনা, মেরিন ড্রাইভ, দ্বীপ ও ধর্মীয়-ঐতিহাসিক স্থাপনা ঘুরে দেখছেন তারা।পর্যটকদের পদচারণায় সরগরম হয়ে উঠেছে হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন খাত, বিপণিবিতান ও স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।
শনিবার দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত লাবণী, সুগন্ধা, সিগাল ও কলাতলী সৈকত এলাকায় দেখা যায় হাজারো পর্যটকের ভিড়। কেউ সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে খেলায় মেতেছেন, কেউ জেটস্কিতে চড়ে গভীর সমুদ্রে ঘুরে আসছেন। অনেকে আবার বালুচরে বসে উপভোগ করছেন সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। বিচবাইক, ঘোড়ায় চড়া ও ছবি তোলাতেও ব্যস্ত দেখা গেছে দর্শনার্থীদের।
কক্সবাজার হোটেল-গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেছেন, ‘ঈদের সাত দিনের ছুটিতে প্রায় সাত লাখ পর্যটক কক্সবাজারে আসতে পারেন। এর মধ্যে গত দুই দিনেই অন্তত দুই লাখ পর্যটক এসেছেন। আগামী ৬ জুন পর্যন্ত পর্যটকের চাপ অব্যাহত থাকবে বলে আমরা আশা করছি।’
তিনি জানিয়েছেন, শহরের পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল, গেস্টহাউস, কটেজ ও রিসোর্টের প্রায় ৯৫ শতাংশ কক্ষ এরইমধ্যে বুকিং হয়ে গেছে। অধিকাংশ আবাসিক হোটেলে আর কোনো কক্ষ খালি নেই।
ঢাকার কমলাপুর থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা পর্যটক গিয়াস উদ্দিন বললেন, ‘ঈদের দ্বিতীয় দিন কক্সবাজারে এসেছি। সমুদ্রস্নান, সূর্যাস্ত দেখা ও বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে খুব ভালো সময় কাটছে। তবে পরিবহন, হোটেল ও খাবারের দাম কিছুটা বেশি মনে হয়েছে।’
মিরপুর থেকে আসা মাহমুদ মিঞার ভাষ্য, শহরের কর্মব্যস্ত জীবন থেকে কিছুটা স্বস্তি পেতে ঈদের ছুটিতে কক্সবাজারে এসেছি। সমুদ্রের পরিবেশ সত্যিই মনকে প্রশান্ত করে।
রাজশাহী থেকে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে আসা কলেজশিক্ষার্থী শশী জান্নাত আনন্দ প্রকাশ করলেন, ‘প্রথমবার কক্সবাজারে ঈদের ছুটি কাটাচ্ছি। সৈকতের পরিবেশ ও মানুষের উচ্ছ্বাস দেখে খুব ভালো লাগছে।’
গাজীপুর থেকে আসা ব্যবসায়ী সিরাজ হাসান জোর দিলেন, ‘ভাবছিলাম পর্যটক কম থাকবে। কিন্তু সৈকতে এসে দেখলাম মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি। ঈদের আনন্দটা এখানে অন্যরকম।’
শুধু সমুদ্রসৈকত নয়, পর্যটকদের ভিড় বেড়েছে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানেও। দরিয়ানগর ইকো-ট্যুরিজম পার্ক, শাহেনশাহ গুহা, প্যারাসেইলিং স্পট, হিমছড়ি ঝরনা ও পাহাড়, ইনানী ও পাটোয়ারটেকের পাথুরে সৈকতে দর্শনার্থীদের আনাগোনা ছিল দিনভর।
এ ছাড়া টেকনাফ সৈকত, নাফ নদীর তীর, নেটং পাহাড়, কুদুম গুহা ও টেকনাফ ন্যাচার পার্কেও বেড়েছে পর্যটকের উপস্থিতি। সাগরপথে অনেক পর্যটক ভ্রমণ করছেন মহেশখালী, সোনাদিয়া ও কুতুবদিয়া দ্বীপে। মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির, রাখাইন পল্লি এবং সোনাদিয়ার প্রাকৃতিক পরিবেশও আকর্ষণ করছে ভ্রমণপিপাসুদের।
কক্সবাজার থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরের রামুতেও বেড়েছে দর্শনার্থীদের আনাগোনা। সেখানে রাংকূট বনাশ্রম, কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহার, বিশাল শায়িত বুদ্ধমূর্তি এবং বৌদ্ধধর্মীয় বিভিন্ন স্থাপনা দেখতে যাচ্ছেন পর্যটকরা। চকরিয়ার ডুলাহাজারা সাফারি পার্কেও দেখা গেছে উপচে পড়া ভিড়।
ঈদের ছুটিতে আগত পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমুদ্রসৈকত ও দর্শনীয় স্থানগুলোতে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। বিভিন্ন পয়েন্টে দায়িত্ব পালন করছেন ট্যুরিস্ট পুলিশ, লাইফগার্ড ও জেলা প্রশাসনের কর্মীরা।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের পুলিশ সুপার নাহিদ আদনান তাইয়ান জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। সৈকতের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ছাড়াও ইনানী, হিমছড়ি ও পাটোয়ারটেক এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
সি-সেইফ লাইফগার্ডের সুপারভাইজার সিফাত সাইফুল্লাহ জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত কোনো পর্যটক নিখোঁজ হননি বা প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। তবে ঢেউয়ের তোড়ে ভেসে যাওয়ার সময় কয়েকজনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
কলাতলী থেকে লাবণী পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সৈকতে সি-সেইফের ২৬ জন লাইফগার্ড এবং জেলা প্রশাসনের ২৫ জন বিচকর্মী দায়িত্ব পালন করছেন। জোয়ার-ভাটা, রিপ কারেন্ট ও উত্তাল ঢেউ সম্পর্কে পর্যটকদের সচেতন করতে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পরিবেশবিষয়ক সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’ কক্সবাজার শাখার সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী অভিযোগ করেন, ‘প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক পর্যটক এলেও নিরাপদ সমুদ্রস্নানের জন্য পর্যাপ্ত সুইমিং জোন ও আধুনিক উদ্ধারব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
পর্যটকদের আগমনে স্থানীয় অর্থনীতি আবারও চাঙা হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবদুস শুক্কুর আশাবাদ ব্যক্ত করেন, ‘হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, বিপণিবিতান ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের লেনদেন হচ্ছে। আমাদের ধারণা, এবারের ঈদে পর্যটন খাতকেন্দ্রিক ব্যবসার পরিমাণ ৭০০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।’
এদিকে অতিরিক্ত কক্ষভাড়া ও খাবারের মূল্য আদায় ঠেকাতে মাঠে রয়েছে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান আশ্বাস দিলেন, ‘পর্যটকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া বা মূল্য আদায়ের কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পর্যটকদের স্বস্তিদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে।’










