ঈদের ছুটিতে শ্রীমঙ্গলে পর্যটক কম, হতাশ পর্যটন ব্যবসায়ীরা
- এর পেছনে রয়েছে, হাম রোগের প্রাদুর্ভাব, এইচএসসি পরীক্ষা এবং ট্রেনের টিকিট সংকট

ছবি: আগামীর সময়
শহরের ইট-পাথরের ব্যস্ত জীবন থেকে খানিকটা স্বস্তি খুঁজতে অনেকেই ছুটে আসেন সবুজ চা-বাগান, পাহাড় ও বনাঞ্চলঘেরা শ্রীমঙ্গলে। দেশের চায়ের রাজধানীখ্যাত এই পর্যটন নগরীতে ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটিকে কেন্দ্র করে পর্যটকের সমাগম বাড়বে বলে আশা করেছিলেন ব্যবসায়ী ও পর্যটনসংশ্লিষ্টরা। তবে ঈদের তৃতীয় দিন পর্যন্ত সেই প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, অন্যান্য বছরের তুলনায় শ্রীমঙ্গলে এবার পর্যটকের উপস্থিতি তুলনামূলক কম।
ঈদের দিন দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল খুবই সীমিত। পরদিন থেকে কিছুটা পর্যটক বাড়লেও তাঁদের বেশির ভাগই আশপাশের এলাকার ভ্রমণপিপাসু মানুষ। দূর-দূরান্ত থেকে আগত পর্যটকের সংখ্যা এখনো আশানুরূপ নয়। ফলে পর্যটননির্ভর ব্যবসাগুলোতেও কাঙ্ক্ষিত প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যাচ্ছে না।
চা-বাগান, পাহাড়, বনাঞ্চল, লেক ও ঝর্ণাবেষ্টিত শ্রীমঙ্গল দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য। প্রতিবছর ঈদের ছুটিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো পর্যটক এখানে ভিড় করলেও এবার সেই চিত্র অনেকটাই অনুপস্থিত।
শ্রীমঙ্গলের উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন চা-বাগান, বধ্যভূমি-৭১, সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা, টিপড়াছড়া গলফ মাঠ, বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই), রাবার বাগান, বাইক্কা বিল, চম্পা লেক, নীলকণ্ঠ টি কেবিন, লাল পাহাড়, বিটিআরআই সড়ক, খাসিয়া পল্লি ও মণিপুরি পাড়া। এ ছাড়া পাশের কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক, হামহাম জলপ্রপাত এবং বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমান স্মৃতি সৌধেও পর্যটকদের যাতায়াত রয়েছে।
পর্যটন সেবা সংস্থার সাধারণ সম্পাদক এস কে দাশ সুমন বলেছেন, ‘হোটেল ও রিসোর্টগুলোতে বুকিং ধীরে ধীরে বাড়ছে। বর্তমানে স্থানীয় পর্যটকদের উপস্থিতিই বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে টানা ছুটির বাকি দিনগুলোতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আরও বেশি পর্যটক শ্রীমঙ্গলে আসবেন বলে আমরা আশাবাদী।’
রাধানগর ট্যুরিজম এন্টারপ্রেনার অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি তাপস জানান, ‘রাধানগর এলাকার হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজগুলোতে এরইমধ্যে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ আগাম বুকিং সম্পন্ন হয়েছে। পর্যটকেরা ধীরে ধীরে আসতে শুরু করেছেন। তবে এবার প্রত্যাশিত সাড়া এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। এর পেছনে দেশে হাম রোগের প্রাদুর্ভাব, এইচএসসি পরীক্ষা এবং ট্রেনের টিকিট সংকটের মতো বিষয়গুলো প্রভাব ফেলতে পারে। আগামী কয়েক দিনে বুকিং আরও বাড়বে বলে আশা করছি। তবে শতভাগ বুকিং হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। যদিও ঈদের ছুটি সাত দিনের, তবু অধিকাংশ পর্যটক ঈদের পরের দিন থেকে ২৯, ৩০ ও ৩১ তারিখের জন্য কক্ষ বুক করেছেন। সাধারণত ঈদের আগের ছুটিতে মানুষ খুব একটা ভ্রমণে বের হন না।
নিসর্গ ইকো রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী কাজী শামসুল হক বললেন, ‘এবার ঈদে স্থানীয় পর্যটকই বেশি দেখা যাচ্ছে। হাম রোগের প্রাদুর্ভাব, সড়কের বেহাল অবস্থা এবং বৈশ্বিক প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত পরিস্থিতির কারণেও পর্যটক কম আসতে পারে। বর্তমানে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বুকিং হয়েছে। আশা করছি আগামী দিনগুলোতে শতভাগ বুকিং হবে।’
বধ্যভূমি এলাকায় কর্মরত ফটোগ্রাফার ইরফান মিয়া জানান, অন্য বছর ঈদের পরদিন থেকেই হাজার হাজার পর্যটকের ভিড় দেখা যায়। কিন্তু এবার ঈদের তৃতীয় দিনেও সেই চিত্র নেই। প্রচণ্ড গরম, ট্রেনের টিকিট সংকট এবং রেলের অনিয়মিত সময়সূচি এর পেছনে কারণ হতে পারে।
ভ্রাম্যমাণ আনারস বিক্রেতা মানিক মৃর্ধা উল্লেখ করেন, ঈদকে সামনে রেখে বিভিন্ন আকারের আনারস সংগ্রহ করেছি। কিন্তু আশানুরূপ পর্যটক না আসায় বিক্রি কম হচ্ছে। অনেক আনারস নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। লাভ হবে কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’
চাঁদের গাড়ির (জিপ) চালক বিল্লাল হোসেন হতাশা প্রকাশ করলেন, ‘ঈদ উপলক্ষে পর্যটক বাড়বে বলে আশা করেছিলাম। কিন্তু এখনো পর্যটক কম। বেশির ভাগ সময় স্ট্যান্ডে বসেই কাটাতে হচ্ছে।’
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা পর্যটক ফাহমিদা আক্তার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেন, ‘শ্রীমঙ্গলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও শান্ত পরিবেশ আমাদের মুগ্ধ করেছে। পরিবার নিয়ে খুব ভালো সময় কাটছে। কয়েক দিন অবস্থান করে আশপাশের দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখার পরিকল্পনা রয়েছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা শিমুল তরফদার জানান, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও নিরিবিলি পরিবেশের কারণে শ্রীমঙ্গল দিন দিন দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে দায়িত্ব পালন করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। শ্রীমঙ্গল ট্যুরিস্ট পুলিশের পরিদর্শক প্রজিত কুমার দাশ জোর দিলেন, ‘পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ট্যুরিস্ট পুলিশের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। নিয়মিত টহল কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পুলিশের সহযোগিতায় পর্যটকদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন ভ্রমণ নিশ্চিত করতে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছি।’
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বলেছেন, ‘পর্যটকদের নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যানজট নিরসনে ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকও নিয়োগ করা হয়েছে। পর্যটকেরা যাতে স্বস্তিতে ভ্রমণ করতে পারেন, সে বিষয়ে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। যদিও ঈদের প্রথম কয়েক দিনে পর্যটকের উপস্থিতি প্রত্যাশার তুলনায় কম ছিল, তবে ছুটির বাকি দিনগুলোতে পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে বলে আমরা আশা করছি।’










