ট্রাম্পের সঙ্গই ইনফান্তিনোর সর্বনাশ!

ফিফায় তিনি এসেছিলেন প্রশাসক হিসেবে। তার নেতৃত্বে ভালোই করছিল বিশ্ব ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ২০২৬ বিশ্বকাপ আসতেই যেন সব গুলিয়ে গেল জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর। ভুলে গেছেন হিতাহিত জ্ঞান। বিশ্বকাপ যত এগিয়েছে, ততই বেড়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার সখ্যতা।
ট্রাম্পের সঙ্গে তার কূটনৈতিক সফর, রাজনৈতিক বৈঠক, বোর্ড অব পিসের সভায় উপস্থিত—ফিফা সভাপতির কাঁধে তখন শুধু ফুটবলের দায়িত্ব নয়, যেন আরও বেশি কিছু এসে ভর করেছে। তখনই কি বদলে গেল ইনফান্তিনোর চিন্তাধারা?
ইনফান্তিনো যেন রাষ্ট্রনায়ক!
ইনফান্তিনো যেন এখন আর শুধু ফুটবল অঙ্গনের মানুষের সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। বরং তার আগ্রহ ও স্বাচ্ছন্দ্য আরও ওপরে, বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রনায়কদের সান্নিধ্য। ক্ষমতার এই বলয়ে চলাফেরাই তার কাছে এখন বেশি উপভোগ্য। যেমন শুক্রবার তিনি কলম্বিয়া সফর গিয়েছিলেন কোনো ফুটবলীয় বৈঠকে অংশ নিতে নয়, গিয়েছিলেন দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলার অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে।
সেখানে
উপস্থিত হয়ে কনমেবল-এর সভাপতি আলেহান্দ্রো দোমিঙ্গেস ইনফান্তিনোকে একটু সাহস দিয়ে
বলেন, ‘ইনফান্তিনো অত্যন্ত সফলভাবে ২০২৬ বিশ্বকাপ শেষ করেছেন। আমরা জিয়ান্নির পাশে
আছি।’ পুরো দক্ষিণ অমেরিকাই হয়তো তার পক্ষে আছে। বিপক্ষে দাঁড়িয়ে গেছে ইউরোপের দেশগুলো, যারা ১০ বছর আগে তাকে বসিয়েছিল
ফিফা সভাপতি পদে। উয়েফা, কনকাকাফ ও এএফসি
মিলে যৌথ বিবৃতি দিয়েছে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে। প্রতিদিনই যেন একটু একটু নড়বড়ে হচ্ছে
তার চেয়ারটা।
এই চেয়ার পেয়ে ইনফান্তিনো যেন নিজেকে ছাড়িয়ে গেছেন। হারিয়ে গেছে তার স্বাভাবিক ফুটবল সংগঠকের চরিত্র। বেসরকারি ইকুইটি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিশ্বকাপের ২০ শতাংশ বিক্রির পরিকল্পনা নিয়ে যখন ফুটবল বিশ্বে তোলপাড় তখনও তিনি এতটা বিচলিত নন। গত সপ্তাহের শুরুতে মরক্কোর রাবাতে ফিফা অফিসে তিনি হাজির হন কালো কাচে ঢাকা একাধিক মার্সিডিজ গাড়ির বহর নিয়ে। সেই বহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে পুলিশের গাড়ির আরেকটি বহর। সেখানে তিনি ডেকে পাঠান ফিফার ব্যবস্থাপনা বোর্ডের পছন্দের কয়েকজন সদস্যকে। আলোচনার বিষয় ছিল তার ওই বিতর্কিত বিশ্বকাপ বিক্রির প্রকল্প।
এখন সুইস-ইতালীয় ইনফান্তিনোর ভ্রমণ মানেই এমন বহর ও বিশেষ নিরাপত্তা বলয়। মাঝে মাঝে কাতার এয়ারওয়েজের একটি এক্সিকিউটিভ জেটে করেও ঘুরে বেড়ান, যা সরবরাহ করা হয়েছে তার ব্যবহারের জন্য। বিশ্বকাপ চলাকালে দিনে তিনবারও এই বিমানে চেপে বিভিন্ন দেশ-শহরে ঘুরে বেড়িয়েছেন। পুরো টুর্নামেন্টে দিনে দুটি করে ম্যাচ দেখেছেন মাঠে বসে।
গত এপ্রিলে ভ্যাঙ্কুভারে ফিফা কংগ্রেসে গিয়েছিলেন ইনফান্তিনো। তাকে নিয়ে যেতে কানাডার লেভেল-ফোর মোটারকেডকে বলা হয়েছিল নিরাপত্তা প্রোটোকল দিতে। সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সরকার। সাধারণত রাষ্ট্রপ্রধান বা পোপকে দেওয়া হয় এ ধরনের নিরাপত্তা প্রটোকল।
বিশাল গাড়িবহর ও ব্যক্তিগত চার্টার ফ্লাইটের পাশাপাশি তার আছে বড় অঙ্কের বেতনও। ২০১৬ সালে নির্বাচিত হওয়ার সময় তিনি যে বেতন পেতেন, এখন তার প্রায় তিন গুণ। ১০ বছর আগে ইনফান্তিনোর ১৩ লাখ পাউন্ড বেতন এখন তিন গুণ- ৪০ লাখ পাউন্ড। সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর জন্য পান বছরে ২০ হাজার ৫০০ পাউন্ড।
তার নিরাপত্তার বহর, নানাবিধ আয়োজন ও সুযোগ-সুবিধা দেখলে ইনফান্তিনোকে কোনো ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি মনে হয় না। বরং কোনো দেশের প্রেসিডেন্টের মতোই মনে হয়।
প্রশ্নের মুখে তার রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা
বিশ্বকাপ আয়োজনের সুবাদে আমেরিকান প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সম্পর্ক যত গভীর হয়েছে, ইনফান্তিনোর ক্ষমতার পরিধিও যেন তত বেড়েছে। ফুটবল তখন আর শুধু খেলা নয়; জড়িয়েছে বিশ্ব রাজনীতির সঙ্গে এবং হয়ে উঠেছে বিপুল অর্থের এক বৈশ্বিক ব্যবসা।
২০২৫ সালের মে মাসে ট্রাম্পের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে একটি কূটনৈতিক সফরে গিয়েছিলেন ইনফান্তিনো। এজন্য তিনি প্যারাগুয়েতে অনুষ্ঠিত ফিফা কংগ্রেসে যান দুই ঘণ্টা দেরিতে। উয়েফা অভিযোগ করেছিল, ইনফান্তিনো ‘ব্যাক্তিগত রাজনৈতিক স্বার্থকে’ প্রাধান্য দিচ্ছেন। এর প্রতিবাদে বেরিয়ে গিয়েছিলেন ইউরোপের অনেক সদস্য।
‘ফিফা শান্তি’ পুরস্কারের কথাই ধরুন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে এই পুরস্কার তুলে দেওয়া কোনো সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ছিল না। কিন্তু সেই শান্তি পুরস্কার নেওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর ট্রাম্প সামরিক অভিযান চালিয়ে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে আনেন। এরপর হামলা শুরু করেন ইরানে।
এ বছরের শুরুতে ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এর সভায় হঠাৎ করে হাজির হয়েছিলেন ইনফান্তিনো। এই সংস্থার লক্ষ্য ছিল গাজা পুনর্গঠনে তদারকি করা। এসব ঘটনা একের পর এক মেলালে দেখা যায়, ইনফান্তিনো পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছেন রাজনীতির সঙ্গে। অথচ ফিফা সভাপতি হিসাবে তার রাজনৈতিক নিরপেক্ষ থাকারই কথার ছিল। এত প্রশ্ন ও সমালোচনার পরও ফিফা এথিক্স কমিটি ছিল নীরব।
ট্রাম্পের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা
বোঝাই যাচ্ছে ইনফান্তিনো নিজেকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ অবস্থানে নিয়ে গেছেন। সেটা আরও জোরালো হয় যখন বিশ্বকাপের একটি ম্যাচে লাল কার্ড পাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগুন নিষেধাজ্ঞা থেকে রেহাই পেয়ে যান। ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটির এই সিদ্ধান্ত নিয়ে হয়েছে প্রচুর সমালোচনা। ট্রাম্প নিজেই বলেছিলেন, ইনফান্তিনোকে ফোন করে ওই লাল কার্ডের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেছিলেন তিনি। যদিও ইনফান্তিনো শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করার মতোই বলেছিলেন, ‘এটা স্বাধীন সংস্থার নেওয়া সিদ্ধান্ত।’
এরপর ট্রাম্প-ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি হিসেবে সামনে আসে ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ। এই বিতর্কিত প্রকল্পে ছিল একটি বেসরকারি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। যার সঙ্গে জড়িত ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই- জসুয়া কুশনার। যদিও এই প্রকল্পের বিষয়ে কোনো ধারনা ছিল না বলেই দাবি করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ফিফা সভাপতির অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
ট্রাম্পের সঙ্গে সখ্যতা যদি ইনফান্তিনোকে আরও ক্ষমতাবান করে থাকে, তাহলে সেই ক্ষমতার সঙ্গে এসেছে বড় ঝুঁকিও। ক্ষমতা যত বাড়ে, ভুল সিদ্ধান্তের মূল্যও তত বাড়ে।
এবার ইনফান্তিনোকে কি চরম মূল্য দিতে হবে, তার উত্তর সময়ই দেবে।







