রংপুরে চার খুন
‘দুজন মাদকাসক্ত যুবক চারজনকে হত্যা করতে পারে না’

রংপুরে চার খুনের ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্তের দাবি জানিয়ে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন। ছবি: আগামীর সময়
রংপুরে চার খুনের ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্তের দাবি জানিয়ে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন। এ সময় পুলিশের তদন্ত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বক্তব্যে অমিল থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের আহ্বান জানান সংগঠনটির নেতারা।
আজ বুধবার দুপুরে রংপুর প্রেসক্লাব চত্বরে জেলা ও মহানগর সুজন এ সমাবেশের আয়োজন করে। বক্তারা পুলিশের তদন্তে নানা অসংগতি তুলে ধরে হত্যাকান্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও হুকুমদাতাদের আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানান।
সমাবেশে সুজনের নেতারা ছাড়াও সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন।
সমাবেশে সুজন জেলা সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘রংপুরে থানা ও পুলিশের বিভিন্ন উইং বাড়লেও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা কাটেনি। জনগণের সঙ্গে কাঙ্খিত সেতুবন্ধন তৈরি হয়নি। রাষ্ট্র ও নাগরিক পুলিশের কাছ থেকে সেবা ও নিরাপত্তা চায়।’
তিনি উল্লেখ করেন, দুজন মাদকাসক্ত যুবক চারটি মানুষকে এভাবে হত্যা করতে পারে না। শুধুমাত্র ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার কারণে এমন নির্মম হত্যাকান্ডের মধ্যদিয়ে একটি পরিবারকে নিঃশেষ করে দেওয়ার দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। প্রকৃত ঘটনা বা কারণ আড়াল হতে পারে, এই ধারণাও উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। তাই কোনো অজুহাত দিয়ে প্রকৃত অপরাধী, পরিকল্পনাকারী ও হুকুমদাতাদের আড়াল করার চেষ্টা চলছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে।
সুজনের এই সংগঠক ঘটনাটিতে পুলিশের আইজিপি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নীরবতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। একই সাথে তিনি স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।
তদন্তের গাফিলতি তুলে ধরে মহানগর সভাপতি অ্যাডভোকেট জোবায়দুল ইসলাম বুলেট বললেন, ‘আসামিদের আরও ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন ছিল, কিন্তু তাদের নেপথ্যে কোনো চক্রান্ত রয়েছে কি না তা বের করা হয়নি। আসামিদের ডোপ টেস্ট করা হয়নি এবং যে ব্যক্তি আগাম তথ্য দিয়েছিল, সে কীভাবে জানল তা-ও খতিয়ে দেখা হয়নি। ঘটনার সময় বিদ্যুতের সংযোগ কে বিচ্ছিন্ন করল তাও তদন্তের দাবি রাখে। এ ঘটনায় পুলিশের প্রেস ব্রিফিংয়ের পর জনমনে যেসব প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে তার উত্তর সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বের করাই দায়িত্বশীল পুলিশিং হতে পারে। কিন্তু আমরা সেটি এখনো দেখতে পাচ্ছি না।’
সুজনের উপদেষ্টা সদস্য ও নারীনেত্রী মঞ্জুশ্রী সাহা মিডিয়ায় উঠে আসা ধর্ষণের আলামত নিয়ে মর্গের ডোম ও ময়নাতদন্তের ফরেনসিক চিকিৎসকের বক্তব্যের গরমিল এবং ধর্ষণ প্রসঙ্গে প্রশাসনের এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন।
একই সময়ে এ দাবির সাথে সংহতি জানিয়ে মানববন্ধনে অংশ নেয় ফোর্ব জেলা ফোরাম ও ইয়ুথ এন্ডিং হাঙ্গারের নেতা, সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবীরা। তারা বক্তব্যে রংপুর নগরীর সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করা, রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত হয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত দোষীদের বিচারের মুখোমুখি করার আহ্বান জানান।
সমাবেশে বক্তব্য দেন সুজন রংপুর মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন স্বাধীন, সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহে আলম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বেলাল হোসেন, প্রচার সম্পাদক ফরহাদুজ্জামান ফারুক, ফোর্ব জেলা ফোরামের সদস্য জাকিয়া সুলতানা মলি, আফরোজা রাধন, ভারতী রানী, ইয়ুথ লিডার রাকিবুল ইসলাম, লাবিব প্রমুখ।
গত শনিবার রাতে নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার নিজ বাসা থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।
এ ঘটনায় রবিবার ভোরে মুগ্ধ দাস (২৩) ও
সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই দিন
দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ
জানিয়েছিলেন, ইয়াবা সেবনের উদ্দেশ্যে তারা গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে
উঠেছিলেন। শব্দ শুনে গণপতি সেখানে গেলে তাকে হত্যা করা হয়। পরে পরিবারের
অন্য তিন সদস্যকেও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের ভাষ্য।
রবিবার
নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী কোতোয়ালি
থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। ওই রাতেই গ্রেপ্তার
দুই আসামি আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।
আলোচিত
এ মামলার তদন্তভার কোতোয়ালি থানা থেকে গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) হস্তান্তর
করা হয়েছে। রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শক জিন্নাত
আলীকে মামলার নতুন তদন্ত কর্মকর্তা করা হয়েছে।
গণপতি চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অবসর নেওয়ার পর তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসেবে রোগী দেখতেন। নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ শুরু করেছিলেন তিনি। দোতলা বাড়িটির নিচতলার কাজ শেষ না হলেও দুই-তিন বছর ধরে পরিবার নিয়ে দোতলায় বসবাস করছিলেন।









