সম্পাদকীয়
যে বিচারে অবিচার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
অপরাধীর কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা যেমন বিচার বিভাগের আমানত, তেমনি নিরপরাধ মানুষকে সাজা দেওয়া চরমভাবে নীতিবিরুদ্ধ কাজ। ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার রায় এবং বিনা বিচারে আটকে রাখার বিষয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)-এর প্রতিবেদন দেশের বিচারব্যবস্থার এক ভয়াবহ চেহারা উন্মোচিত করেছে।
নুসরাত হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতের বিচারক যেভাবে হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততা না থাকা মানুষকে মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত দণ্ড দিয়ে কনডেম সেলে পাঠিয়েছেন, তা কোনো স্বাভাবিক বিচারিক ভুল নয়— বরং এটি আইনি প্রক্রিয়ার ছদ্মবেশে এক প্রাতিষ্ঠানিক নির্যাতন। বিচারকের এহেন কাজকে আপিল বিভাগ ‘বিবেকহীন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছেন। আপিল বিভাগ নিম্ন আদালতের সেই বিচারকের বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার নির্দেশ দিলেও প্রশ্ন থেকে যায়— যে নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণা, সামাজিক লাঞ্ছনা ও কনডেম সেলের নির্মম অন্ধকার নিরপরাধ এই মানুষগুলোকে তিলে তিলে সইতে হলো, তার হিসাব কে দেবে? রাষ্ট্র কি তাদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান নিশ্চিত করবে? বিচারব্যবস্থা যদি জনতুষ্টির হাতিয়ারে পরিণত হয়, তবে তা রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়।
অন্যদিকে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে সংস্কার ও সুবিচারের বড় বড় কথা বললেও বাস্তবচিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বুলি আওড়ানো সেই অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিয়ে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বিনা বিচারে অনির্দিষ্টকাল আটকে রেখে নির্যাতন করার পুরনো ব্যাধি থেকে মুক্তি মেলেনি। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদন বলছে, কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের প্রমাণ ছাড়াই শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে শত শত মানুষকে মাসের পর মাস কারারুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। অশীতিপর বৃদ্ধ, মারাত্মক অসুস্থ রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সাবেক জনপ্রতিনিধি— কোনো অভিযোগ গঠন ছাড়াই ২২-২৩ মাস ধরে কারাগারে। ৮৫ বছর বয়সী রমেশ চন্দ্র সেন কিংবা ৬৫ বছর বয়সী জিয়াউল হক যখন জামিন ও চিকিৎসার সুযোগ না পেয়ে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন, তখন সেই মৃত্যুকে রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড ছাড়া আর কী বলা যায়!
নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে উচ্চ আদালত পর্যন্ত পদে পদে জামিন আটকানোর যে মরিয়া অপচেষ্টা, তা রাষ্ট্রযন্ত্রের চরম অমানবিকতাকেই প্রকাশ করে। এক মামলায় জামিন পেলে তৎক্ষণাৎ অন্য ভুয়া মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে মুক্তি ঠেকানোর খেলা বহু বছর ধরে চলমান। কোনো অভিযোগ ছাড়া মানুষকে আটকে রাখা, বিচার শুরুর আগেই তাদের কারাগারে রাখা শুধু সর্বজনীন আইনি নীতিকেই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায় না, বরং গোটা বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ক্ষেত্র করে তোলে।
নুসরাত হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতের রায়ে নিরপরাধ থেকে কনডেম সেলে দিন কাটানো ব্যক্তিদের যেমন পূর্ণ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের বন্দোবস্ত করা জরুরি, তেমনি বিচার বিভাগীয় সংস্কারের অংশ হিসেবে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই বিনা বিচারে আটক বন্দিদের আইনি অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। বিনা বিচারে কারাগারে যাদের মৃত্যু হয়েছে এবং যারা আইনি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের অনেকেই বিচারিক প্রতিহিংসার মুখে পড়েছিলেন। ফলে মানুষ আশা করে যে, তারা বিচারিক অবিচারের এ সংস্কৃতি থেকে দেশকে মুক্তি দেবেন। ক্ষমতার পালাবদলে যদি শুধু নির্যাতকের চেহারা বদলায় আর নির্যাতিত হওয়ার নিয়ম একই থাকে, তবে সংস্কার ও সুবিচার শুধুই এক পরিহাস।






