আইনজীবীদের অভিমত
‘চাপের বিচারে’ নির্দোষদের হাহাকার
- বিচারকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে হবে বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের এখতিয়ারের ক্ষেত্রে
- ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের দায় নিতে হবে রাষ্ট্রকে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিচারিক ভুল শুধু একটি মামলার রায়ে ভুল সিদ্ধান্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, কখনো কখনো এর মূল্য দিতে হয় একজন নিরপরাধ মানুষকে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হারিয়ে। আদালতের একটি ভুল সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের মতো চরম শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে, একজন মানুষের জীবনে ডেকে আনতে পারে অপূরণীয় পরিণতি। মুহূর্তেই বিপর্যস্ত হয়ে যেতে পারে তার জীবন, পরিবার ও ভবিষ্যৎ।
এ ধরনের ভুল যেমন একজন মানুষের জীবনকে ওলটপালট করে দেয়, তেমনি তা ক্ষতিগ্রস্ত করে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস। কারণ ন্যায়বিচারের জায়গায় একটি ভুল রায় শুধু একজন ব্যক্তির অধিকারকেই বিপন্ন করে না, প্রশ্নের মুখে ফেলে পুরো বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা, জবাবদিহি ও বিশ্বাসযোগ্যতাকেও।
বিচারিক ভুল শোধরানোর জন্য আছে আপিল আদালত। তাই বলে আপিল আদালতের ওপর পুরো দায়ভার ছেড়ে দেওয়ার কোনো উপায় নেই। ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের রায় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ব্যাপকভাবে। প্রশ্ন তুলেছেন স্বয়ং হাইকোর্ট। কেড়ে নিয়েছেন ওই বিচারকের ফৌজদারি মামলা বিচারের ক্ষমতা। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়ার মতে, ‘যেসব বিচারক ফৌজদারি মামলার বিচারের দায়িত্বে থাকবেন, তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে এমন মামলা যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া কাউকে িবচারের এখতিয়ার দেওয়া উচিত না।’
নুসরাত হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামির মধ্যে দুজনের সাজা বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। বাকি আসামিদের মধ্যে চারজনকে যাবজ্জীবন ও ১০ জনকে খালাস দিয়েছেন আদালত। এ মামলার ডেথ রেফারেন্স, জেল আপিল ও আসামিদের করা আপিল শুনানি করে বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার বেঞ্চ সোমবার এ রায় দেন।
ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশীদ ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর আলোচিত এই মামলার রায়ে ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড দেন। ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশীদ সম্পর্কে হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণে বলেছেন, নুসরাত জাহান হত্যাকাণ্ডে কোনো সম্পৃক্ততা না থাকা কয়েকজন আসামির বিরুদ্ধে তিনি বিবেকহীন ও দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে (মাইন্ডলেস অ্যান্ড ইরেসপন্সিবল) মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। এ ধরনের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কারণে কয়েকজন দণ্ডিত আসামিকে কারাগারে নির্জন কারাবাসে (সোলিটারি কনফাইনমেন্ট) রাখা হয়েছিল। এমন রায় দেওয়ার জন্য বিচারককে বিচারিক কার্যক্রম থেকে দূরে রাখা উচিত।
পরে হাইকোর্ট মামুনুর রশীদের ফৌজদারি মামলার বিচার এবং দণ্ডপ্রদানের ক্ষমতা অবিলম্বে প্রত্যাহার করেতে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেন।
শুধু এ মামলায়ই নয়, বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের বেশিরভাগ রায় টিকছে না হাইকোর্টে। হাইকোর্টের এই বিশেষ বেঞ্চের প্রথম ১৪টির রায় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, এসব মামলায় নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছিলেন ৩০ জন। কিন্তু হাইকোর্টে এসে তাদের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড বহাল রয়েছে মাত্র সাতজনের। ১০ জন সম্পূর্ণ খালাস পেয়েছেন, আর ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে দেওয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
নিঃসন্দেহে প্রমাণিত না হলে সাধারণত ফৌজদারি মামলায় কাউকে শাস্তি দেওয়ার নিয়ম নেই। কিন্তু বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড অনেকটা ‘ঢালাওভাবে’ দেওয়া হচ্ছে। নুসরাতের মামলায় হাইকোর্ট বিচারকের ফৌজদারি এখতিয়ার কেড়ে নিলেও অন্যান্য মামলার ক্ষেত্রে এমন নজির খুব বেশি নেই।
তা ছাড়া বিচারকের এই এখতিয়ার কেড়ে নেওয়ার মতো শাস্তি কোনোভাবেই ফিরিয়ে দিতে পারবে না এ মামলায় মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাসপ্রাপ্ত ১০ ব্যক্তির জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সাতটি বছর। অপরাধী না হয়েও কারাগারের নির্জন কক্ষে কেটেছে ভয়াবহ কষ্টের দিন। নিজের জীবনের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের হয়েছে অপূরণীয় ক্ষতি। আদৌ তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে কি না, সেটাও এক বিরাট প্রশ্ন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক আগামীর সময়কে বলেছেন, যেসব অভিযুক্ত কোনো অপরাধ ছাড়াই দীর্ঘদিন নির্জন কারাবাসে ছিলেন, খালাস পেলেও তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা কঠিন হবে। তারা নানাভাবে ক্ষতির শিকার হয়েছেন। পেশা ও পরিচয় হারিয়েছেন।
বিচারিক ভুলে সাজা পাওয়া নিরপরাধ ব্যক্তিদের প্রতিকার পাওয়ার কোনো উপায় নেই দেশে। ড. শরীফ ভূঁইয়া জানিয়েছেন, পৃথিবীর অনেক দেশে এমন ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার উপায় আছে। আমাদের দেশেও এমন সুযোগ থাকা উচিত। একজন নিরপরাধ আর্থিক, সামাজিক ও পারিবারিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন। রাষ্ট্রকে এর দায় নিতে হবে। তিনি আরও বলেছেন, মৃত্যুদণ্ড উচ্চআদালত কর্তৃক নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে নির্জন কারাবাসে রাখা উচিত নয়। আইন যেহেতু এই দণ্ড নিশ্চিত হওয়ার জন্য উচ্চআদালতের মুখাপেক্ষী, সেহেতু অন্তত সে পর্যন্ত কাউকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসািম হিসেবেও বিবেচনা করা উচিত নয়।
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ ইমাম হোসেন তারেক আগামীর সময়কে বলেছেন, এরকম ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার নজির নেই। কারণ বিচারকের ভুল হতে পারে। এটা প্রমাণ করা খুব কঠিন যে, বিচারিক আদালত কাউকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে শাস্তি দিয়েছেন। তবে প্রসিকিউশনের ভুলে কেউ সাজা পেলে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের মামলা করতে পারবেন।
নুসরাতের মামলায় সরকারপক্ষে লড়াইকারী এই আইনজীবী আরও জানিয়েছেন, এ মামলায় ১০ জনের বিরুদ্ধে কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়াই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ১৬ জনের সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, অথচ সবার অপরাধ কোনোভাবেই সমান নয়। কয়েকজনের অন্য সাজাও হতে পারত। তাহলে বিচারের ন্যায্যতা প্রতীয়মান হতো। কিন্তু এটা ‘হোলসেল’ (পাইকারি হারে) ফাঁসির রায়।
বাংলাদেশের নিম্ন আদালতের বিচারকের ক্ষেত্রে, ব্রিটিশ আমলে প্রণীত ১৮৫০ সালের দ্য জুডিশিয়াল অফিসার্স প্রটেকশন অ্যাক্ট এর ধারা-১ অনুযায়ী, দাপ্তরিক ও বিচারিক কার্যের জন্য কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে দেওয়ানি আদালতে মামলা করা যাবে না। ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ১৯৭(১) অনুসারে, দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনকালীন কাজের জন্য কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে সরকারের পূর্বানুমতি ব্যতীত আদালতে মামলা করা যাবে না।
এসব বিধানের মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সুরক্ষা বিধান ও বিচারক যাতে নিঃশঙ্ক চিত্তে রায় বা আদেশ দিতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করা। কিন্তু এসব বিধানের সুযোগ নিয়ে অনেক বিচারকই ‘দায়সারা’ রায় দিচ্ছেন।






