জামায়াত এমপি শাহজাহানের ‘পিএস’ নিয়ে অস্থির প্রশাসন

সংগৃহীত ছবি
চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী। সংসদ সদস্য একজনই, কিন্তু তার প্রাইভেট সেক্রেটারি (পিএস) বা ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) পরিচয়ে দাপিয়ে বেড়ান কয়েকজন।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান আগামীর সময়কে জানালেন, অন্তত পাঁচজন পিএস পরিচয়ে নিয়মিত প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। বললেন, ‘পিএস পরিচয়ে একেক সময় একেকজন আসেন। আরমান নামে একজন আগে থেকেই আছেন। এখন দিদার, মুজাহিদ, রবিউল— এমন আরও কয়েকজন মৌখিকভাবে পিএস পরিচয় দেন। যদিও ওনাদের পিএস বলা উচিত নয়। এমপি মহোদয়ের কাজে সহায়তা করেন।’
তাদের মধ্যে মোহাম্মদ আরমান উদ্দিনের বিরুদ্ধে দুই বছর ধরে একের পর এক অপরাধে জড়ানোর অভিযোগ উঠছে। চাঁদাবাজি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখল, মব-সন্ত্রাস, খাসজমি দখল, আধিপত্য বিস্তারসহ অনেক অভিযোগ। প্রচার আছে, পিএস আরমানের অপকর্মের কারণে ২০২৫ সালের ১৩ জুন মহানগর জামায়াত আমিরের পদ হারান শাহজাহান চৌধুরী। যদিও সংসদ সদস্য হয়ে রাজনৈতিক প্রভাব অক্ষুণ্ন রাখতে পেরেছেন তিনি। নানা অভিযোগের পরও আরমানকে নিয়মিতই দেখা যায় শাহজাহান চৌধুরীর ডানে-বামে। এসব পিএস নিয়ে এলাকার লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক আছে। স্থানীয় প্রশাসনে অস্থিরতা। জামায়াতে অস্বস্তি।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের রুকনপর্যায়ে এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানালেন, সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর পিএস পরিচয়ে আরমানসহ কয়েকজনের কর্মকাণ্ডে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। এ নিয়ে দলের ভেতর আলোচনা-সমালোচনা হলেও সাংগঠনিক বিধিনিষেধের কারণে তারা বাইরে মুখ খুলতে পারছেন না। চট্টগ্রামে জামায়াত নেতাদের মধ্যে যারা একসময় শাহজাহান চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তাদের কেউ কেউ তাকে ছেড়ে গেছেন। টিকতে না পেরে অনেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছেন। দেশের বিদ্যমান আইনে একজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী পিএস-এপিএস ছাড়াও সরকারি বেতনে ব্যক্তিগত স্টাফ নিয়োগ দিতে পারেন। কিন্তু সংসদ সদস্যদের জন্য সরকারিভাবে এমন নিয়োগের কোনো বিধান নেই।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য তিনবার শাহজাহান চৌধুরীর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে কল দেওয়া হয়। তিনবারই রবিউল পরিচয় দিয়ে একজন জানালেন, ‘তিনি প্রোগ্রামে ব্যস্ত।’ রবিউলের পরিচয় জানতে চাইলে বললেন— ‘এমপি সাহেবের সঙ্গে থাকি।’ আরমান উদ্দিন নামে এমপির কোনো পিএস আছেন কি না— জানতে চাইলে রবিউল জানালেন, ‘এখন নেই। এমপি সাহেবের পিএস এখন মুজাহিদ বিন আলী।’ কথা বলতে না পেরে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন লিখে বার্তা দেওয়া হলেও শাহজাহান চৌধুরীর কাছ থেকে কোনো জবাব আসেনি।
মোহাম্মদ আরমান উদ্দিন আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমার নামে পিএসের কোনো গেজেট নেই। সাংবাদিকরা যার যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে নিউজ করেন। শাহজাহান চৌধুরীর পিএস আরমান— এ পরিচয় দিলে অনলাইনে ভিউ-ক্লিক বাড়ে। এজন্য একের পর এক ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রকাশ করা হয়। আসলে লোহাগাড়ায় আমার বিচরণ অনেকেই সহ্য করতে পারেন না। সেজন্য তারা আমার বিরুদ্ধে নানা মিথ্যা কাহিনি প্রচার করেন।’
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দৃশ্যপটে আসেন মোহাম্মদ আরমান উদ্দিন। শুরুতেই লোহাগাড়ার ব্যবসায়ী খোরশেদ আলম ওরফে ডেম্পার খোরশেদকে তুলে নিয়ে নির্যাতন ও টাকা আদায়ের পর পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগে আলোচনায় আসেন।
খোরশেদ আলম আগামীর সময়কে জানালেন, তাকে ‘আওয়ামী দোসর’ তকমা দিয়ে ১৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন আরমান। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রক্ষায় ও হয়রানি থেকে বাঁচতে ৩ লাখ টাকা এবং ৫ লাখ টাকার একটি চেক দেন। কিন্তু চেক পাস না হওয়ায় ২৮ আগস্ট আরমানের সহযোগীরা তাকে লোহাগাড়া থেকে মাইক্রোবাসে তুলে শহরের কল্পলোক আবাসিক এলাকায় নিয়ে আটকে রেখে নির্যাতন করে। কয়েকটি স্ট্যাম্পে জোর করে সই নিয়ে রাতে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ৩ মাস ১০ দিন পর ৮ ডিসেম্বর তিনি জামিনে মুক্ত হন।
এরপর খোরশেদ আদালতে আরমান ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ২০২৫ সালের ৩ এপ্রিল তাকে আবার পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তাকে মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের এপিএস সাজিয়ে ছাত্র হত্যাসহ পাঁচটি মামলা দেওয়া হয় পাঁচলাইশ থানায়। সংসদ নির্বাচনের পর ১৩ মার্চ তিনি জামিনে মুক্ত হন। নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে শাহজাহান চৌধুরীর কাছে গেলেও কোনো বিচার পাননি বলে জানালেন খোরশেদ আলম।
এরপরও আরমানের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ থেমে নেই। সর্বশেষ ২৩ আগস্ট ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে আরমান ও তার ভাই আরিফ উদ্দিনসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন লোহাগাড়ার প্রবাসী আমির হোসেন। তার অভিযোগ, আরিফের দাবিমতো চাঁদা না দেওয়ায় গত ৩ এপ্রিল অভিযুক্তরা লোহাগাড়ায় তার মালিকানাধীন একটি মার্কেট দখল করে নেয়। দেশে ফিরে গত ২০ আগস্ট তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। এ সময় আরিফ ২০ লাখ টাকা না দিলে মার্কেটের দখল ছাড়বেন না বলে জানিয়েছেন। এ সময় আরমান উদ্দিন মোবাইলে তার সঙ্গে কথা বলেন। আরিফের কথামতো চলার জন্য আমির হোসেনকে চাপ দেন আরমান। বৈঠকের মধ্যে তাকে কয়েক দফা মারধর করা হয়।
জানতে চাইলে আরমান উদ্দিন আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমি ৭ আগস্ট থেকে সৌদি আরব আছি। ২০ আগস্ট আমি কীভাবে বাংলাদেশে একজনকে কিল-ঘুসি মারতে পারি! পরিষ্কার করে বলতে চাই, মামলার বাদীকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। তার সঙ্গে আমার কখনো দেখা বা কথা হয়নি। সুস্থ মস্তিষ্কে যতটুকু মনে পড়ে, তার সঙ্গে আমার এ জীবনে কোনো পরিচয় বা কথাবার্তা হয়নি।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরমানের ফাঁস হওয়া কয়েকটি ফোনালাপও এরই মধ্যে বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। যদিও আরমান এসব ফোনালাপের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। গত ১৯ জুন ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া এক ফোনালাপে জনৈক ব্যক্তি আরমানকে বলতে শোনা যায়, ‘লোহাগাড়ায় এমপি কেন আসবে? এলে পায়ে গুলি করে জিজ্ঞেস করব কেন এসেছে। এখানে আরমান সাহেবের কথাই চলবে। লোহাগাড়ার এমপি আরমান।’
ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার পর সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দেয় চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াত। একই ফোনালাপে স্থানীয় প্রশাসনকে ঘুষ দিয়ে ম্যানেজ করা-সংক্রান্ত কথাবার্তাও বলতে শোনা যায়।
জানতে চাইলে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী আগামীর সময়কে বললেন, ‘ওই ফোনালাপ নিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। কিন্তু যে দুজনের কথোপকথন তাদের শনাক্ত করা যায়নি। সেখানে এমপি মহোদয়কে নিয়ে হুমকির একটা বিষয় ছিল। এমপি মহোদয় সেটি নিয়ে আইনগত কোনো পদক্ষেপ নেননি। আমাদের পক্ষেও সেটি নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ হয়নি।’
তবে আরমানের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ শুনেছেন বলে জানালেন পুলিশ কর্মকর্তা আরিফুল, ‘অভিযোগ আছে। কিন্তু সব অভিযোগ তো আর আইনি পরিকাঠামোর মধ্যে আসে না। আদালতে মামলা আছে। থানায় তার বিরুদ্ধে কোনো জিডি কিংবা মামলা নেই।’






