তাহলে সেই ফুলের অর্থ কী?

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে। নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থাকবে। কে সামনে থাকবেন, কে আগে কথা বলবেন— এসব নিয়েও টানাপড়েন থাকবে। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যদি শ্রদ্ধার জায়গাটি গ্রাস করে ফেলে, তাহলে সেটি আর সুস্থ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে বিশৃঙ্খলার প্রকাশ।
সোমবার জিয়া উদ্যানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের যে হুড়োহুড়ি, ঠেলাঠেলি ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটেছে, সেটিকে তাই শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি দলের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। সবচেয়ে দৃষ্টিকটু দিক হলো— এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়েছেন দলের সদ্য দায়িত্ব পাওয়া ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী নিজেই। নেতাকর্মীর ধাক্কাধাক্কিতে তার প্রায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। সামনে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ধাক্কায় তার চোখ থেকে চশমা খুলে যায়। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর তিনি ঠিকমতো প্রার্থনায়ও অংশ নিতে পারেননি। বেদিতে দুই হাত রেখে তিনি নিজেকে কোনোমতে সামাল দিয়েছেন।
একটু ভেবে দেখুন, যিনি মাত্রই দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পেয়েছেন, তার প্রথম দিককার কর্মসূচির একটি দৃশ্য যদি এমন হয়, সেটি কতটা বিব্রতকর! তার ওপর কর্মসূচিটি ছিল দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের। অথচ দৃশ্য দেখে মনে হয়েছে, শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়ার চেয়ে সামনে যাওয়াটাই যেন বড় হয়ে উঠেছে।
শুধু মাইকিং করে, নির্দেশনা দিয়ে বা কর্মসূচির আগে সতর্ক করে এ সমস্যার সমাধান হবে না। সাংগঠনিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। প্রয়োজনে প্রশিক্ষণ দিতে হবে
এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের হুড়োহুড়ির ঘটনা আগেও ঘটেছে। গত বছরের শেষদিকে এমনই এক ঘটনায় বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনকে ধাক্কাধাক্কিতে জড়াতে দেখা যায়। সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। জাতীয় দিবস, দলীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কিংবা কেন্দ্রীয় নেতাদের কর্মসূচিতেও অতিরিক্ত ভিড় ও বিশৃঙ্খলার ঘটনা মাঝেমধ্যে সামনে আসে। এই জায়গাটিতে বিএনপিকে একটু গভীরভাবে ভাবতে হবে। কারণ, ক্ষমতায় থাকা একটি দলের কর্মী-সমর্থকদের আচরণ শুধু দলের অভ্যন্তরীণ বিষয় থাকে না; সেটি রাষ্ট্র ও সমাজের কাছেও একটি বার্তা দেয়।
সোমবারের ঘটনাটিও এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ সমালোচনা করেছেন, কেউ ব্যঙ্গ করেছেন, কেউ হাসাহাসি করেছেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তো সুযোগ নেবেই। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাধারণ মানুষ ও তরুণ প্রজন্ম কী দেখছে? তারা দেখছে, একজন সিনিয়র নেতা সামনে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, আর তার চারপাশে কর্মীদের ধাক্কাধাক্কি। তারা দেখছে, যারা শৃঙ্খলা, সংগঠন ও ঐক্যের কথা বলেন, বাস্তবে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে সেই শৃঙ্খলাই ভেঙে ফেলছেন।
তরুণ প্রজন্ম এখন রাজনীতিকে শুধু বক্তৃতা দিয়ে বিচার করে না। তারা আচরণ দেখে। তারা ভিডিও দেখে। একজন নেতা মঞ্চে কী বললেন, তার চেয়ে কখনো কখনো তিনি মঞ্চের বাইরে কেমন আচরণ করলেন— সেটিই বেশি মনে রাখে। রাজনীতির প্রতি তরুণদের এমনিতেই নানা ধরনের অনীহা ও হতাশা আছে। তারা যদি দেখে রাজনীতিতে প্রবেশ মানেই ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়ার প্রতিযোগিতা, সিনিয়রকে পাশ কাটিয়ে সামনে যাওয়ার চেষ্টা, ক্যামেরায় নিজের মুখ দেখানোর লড়াই— তাহলে রাজনীতির প্রতি তাদের আস্থা আরও কমবে।
শুধু সমাধির সামনে নয়; দলীয় সংবাদ সম্মেলন কিংবা বিভিন্ন কর্মসূচিতেও একই ধরনের একটি সংস্কৃতি চোখে পড়ে। অনেক সময় দেখা যায়, সিনিয়র নেতা এসে দাঁড়িয়ে আছেন, অথচ জুনিয়ররা চেয়ার দখল করে বসে আছেন। একজন প্রবীণ নেতা দাঁড়িয়ে আছেন, পাশে অপেক্ষাকৃত নবীনরা বসে আছেন— দৃশ্যটি রাজনৈতিকভাবে যেমন দৃষ্টিকটু, মানবিকভাবেও তেমনি বিব্রতকর। এটি শুধু বিএনপির জন্য নয়, সব রাজনৈতিক দলের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
রাজনীতিতে সিনিয়রদের প্রতি সম্মান শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ। একজন প্রবীণ নেতা কোনো অনুষ্ঠানে এলে তার জন্য চেয়ার ছেড়ে দেওয়া, তাকে সামনে জায়গা দেওয়া, তার বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনা— এই ছোট ছোট আচরণের মধ্যেই একটি দলের ভেতরের সংস্কৃতি প্রকাশ পায়। একজন সিনিয়র নেতা যখন মাজারে আসবেন, তাকে ধাক্কা দিয়ে সামনে যাওয়ার চেষ্টা না করে বরং তার জন্য জায়গা করে দেওয়া উচিত। তিনি যখন কোনো সংবাদ সম্মেলনে আসবেন, তার জন্য চেয়ার ছেড়ে দেওয়া উচিত। তিনি যখন কথা বলবেন, তখন ক্যামেরার সামনে নিজেকে রাখার চেয়ে তার বক্তব্য শোনাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ, নেতৃত্ব শুধু পদবির বিষয় নয়; বয়স, অভিজ্ঞতা, ত্যাগ এবং রাজনৈতিক অবদানেরও সম্পর্ক আছে।
বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বের সামনে তাই এটি একটি বড় সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ যে, কীভাবে দলের বিপুল কর্মী-সমর্থককে শৃঙ্খলার মধ্যে রাখা যায়। শুধু মাইকিং করে, নির্দেশনা দিয়ে বা কর্মসূচির আগে সতর্ক করে এ সমস্যার সমাধান হবে না। সাংগঠনিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। প্রয়োজনে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। আর এই দায়িত্ব এখন সবচেয়ে বেশি নতুন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর। সোমবারের ঘটনাটি তার জন্য বিব্রতকর হলেও একই সঙ্গে এটি তার জন্য একটি বড় বার্তাও। তিনি নিজেই শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বলেছেন, তার দায়িত্ব হলো দলকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা।
কোনো নেতাকর্মী যদি সিনিয়র নেতাকে ধাক্কা দিয়ে সামনে যেতে চান, তাকে থামাতে হবে। কোনো কর্মী যদি মঞ্চ বা সংবাদ সম্মেলনে সিনিয়র নেতার জায়গা দখল করেন, তাকে সরিয়ে দিতে হবে। কোনো কর্মসূচিতে ভিড় হলে সারিবদ্ধতার ব্যবস্থা করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, দলের মধ্যে এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে, যেখানে সামনে থাকা নয়; শৃঙ্খলা মেনে চলাই হবে গর্বের বিষয়। নইলে ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে যদি আমরা শ্রদ্ধাবোধটাই হারিয়ে ফেলি, তাহলে সেই ফুলের অর্থ কী?
লেখক: উপসম্পাদক, আগামীর সময়






