রংপুরে চার খুন
ফরেনসিক রিপোর্টে ধর্ষণের আলামত মেলেনি

রংপুরে নিহত গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবার। ছবি: সংগৃহীত
রংপুরে নিজ বাসায় খুন হওয়া অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ের ফরেনসিক প্রতিবেদন প্রস্তুত হয়েছে। প্রতিবেদনে শিক্ষক গণপতির স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর শরীরে যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। চারজনের মৃত্যুই শ্বাসরোধে হয়েছে বলে জানিয়েছেন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক।
গতকাল মঙ্গলবার রংপুর মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও চারটি মরদেহের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক বাবলু কিশোর বিশ্বাস এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানিয়েছেন, ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষায় পাওয়া তথ্যই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মা ও মেয়ের মরদেহে যৌন নির্যাতনের আলামত পাওয়া গেছে কি না, জানতে চাইলে ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস উল্লেখ করেছেন, কোনো যৌন নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। পরীক্ষার জন্য পাঠানো নমুনাতেও এ ধরনের কোনো আলামত মেলেনি।
ময়নাতদন্তে চারজনের গলায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। কারও কারও বুকে ও মাথায় আঘাতের চিহ্নও ছিল। তবে এসব আঘাত মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক। তার ভাষ্য, মরদেহগুলো উদ্ধারের পর অনেক দেরিতে ময়নাতদন্তের জন্য আসায় ততক্ষণে পচন শুরু হয়েছিল।
মরদেহগুলোর মুখ কালো হয়ে যাওয়ার বিষয়ে ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস জানিয়েছেন, এতে কোনো রাসায়নিক পদার্থ বা কেমিক্যাল বার্নের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পচন প্রক্রিয়ার কারণেই মরদেহের উন্মুক্ত অংশ ধীরে ধীরে কালো হয়ে যায়। পুরো শরীরেও পচনের সঙ্গে এ ধরনের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। এতে অ্যাসিড বা অন্য কোনো রাসায়নিক দিয়ে ঝলসানোর আলামত নেই।
মৃত্যুর সময় সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ফরেনসিক পরীক্ষায় নির্দিষ্ট ঘণ্টা বা মিনিট ধরে মৃত্যুর সময় নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। সাধারণত একটি আনুমানিক সময়সীমা উল্লেখ করতে হয়। চারজনের মধ্যে কে আগে বা পরে মারা গেছেন, সেটিও নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।
এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রংপুর মেডিকেল কলেজের মর্গের এক ডোমের বক্তব্যের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ধর্ষণের আলামত নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
ওই ডোম দাবি করেছিলেন, আগামী চক্রবর্তীর শরীরে ধর্ষণের আলামত এবং তার মা প্রীতিলতা চক্রবর্তীর শরীরে ধর্ষণের আলামতের পাশাপাশি বীর্য পাওয়া গেছে। বিষয়টি চিকিৎসককে জানালে তিনি ভ্যাজাইনাল সোয়াব ও বীর্যের নমুনা সংরক্ষণের নির্দেশ দেন বলেও দাবি করেন ওই ডোম।
এ বিষয়ে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক বাবলু কিশোর বিশ্বাস জানিয়েছেন, নমুনা সংগ্রহের সময় ডোমের মনে হতে পারে পরীক্ষায় এমন কোনো ফল আসতে পারে। তবে পরীক্ষার পর ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।
গত শনিবার রাতে নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার নিজ বাসা থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।
এ ঘটনায় রবিবার ভোরে মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। মুগ্ধ নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার কানুদাসের ছেলে এবং সিদ্ধার্থ বিনয় চন্দ্র দাসের ছেলে। ওই দিন দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ জানিয়েছিলেন, ইয়াবা সেবনের উদ্দেশ্যে তারা গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে উঠেছিলেন। শব্দ শুনে গণপতি সেখানে গেলে তাকে হত্যা করা হয়। পরে পরিবারের অন্য তিন সদস্যকেও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের ভাষ্য।
রবিবার নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। ওই রাতেই গ্রেপ্তার দুই আসামি আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।
আলোচিত এ মামলার তদন্তভার কোতোয়ালি থানা থেকে গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়েছে। রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শক জিন্নাত আলীকে মামলার নতুন তদন্ত কর্মকর্তা করা হয়েছে।
গণপতি চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অবসর নেওয়ার পর তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসেবে রোগী দেখতেন। নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ শুরু করেছিলেন তিনি। দোতলা বাড়িটির নিচতলার কাজ শেষ না হলেও দুই-তিন বছর ধরে পরিবার নিয়ে দোতলায় বসবাস করছিলেন।







