ঢাকা-দিল্লির রেল বৈঠক হচ্ছে না

ফাইল ছবি
পিছিয়ে গেল বাংলাদেশ-ভারত আন্তঃসরকার রেল বৈঠক। কথা ছিল ৮-১০ সেপ্টেম্বর ঢাকায় হবে বৈঠকটি। সে অনুযায়ী সব প্রস্তুতিও নিয়েছিল ঢাকা। তবে ভারতের অনাগ্রহে শেষ মুহূর্তে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য পিছিয়ে গেছে বৈঠকটি।
ভারতীয় রেলওয়ে বোর্ড অনানুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ রেলওয়েকে জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ে তাদের প্রতিনিধিদল বৈঠকে অংশ নিতে পারছে না। কিন্তু কেন পারছে না, কিংবা কবে বৈঠকটি হতে পারে— সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি নয়াদিল্লি। বাংলাদেশও এ বিষয়ে ভারতীয় পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি পায়নি।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপের ক্ষেত্রগুলো এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে অনেকটা স্থবির। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এখন পর্যন্ত ঢাকায় দুই দেশের কোনো দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়নি। সে প্রেক্ষাপটে দিল্লির প্রতিনিধিদলের এ সফর এবং ৩৮তম ইন্টার-গভর্মেন্টাল রেলওয়ে মিটিং (আইজিআরএম) বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। কারণ এটি শুধু রেল খাতের নিয়মিত আলোচনা ছিল না; বরং ঢাকা-দিল্লির মধ্যে স্থবির হয়ে পড়া প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ আবার সচল করারও একটি সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘বৈঠক পেছাচ্ছে এতটুকু শুনেছি। এখনো সুনির্দিষ্ট কারণ জানা নেই। আশা করি, সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হবে।’
বৈঠকটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল গত জুনে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ জুন ভারত প্রথম চিঠি দিয়ে ১ থেকে ৩ সেপ্টেম্বর বৈঠকের প্রস্তাব দেয়। জবাবে বাংলাদেশ ২ জুলাই চিঠি দিয়ে ৮ থেকে ১০ সেপ্টেম্বরের প্রস্তাব করে। আয়োজক দেশ হিসেবে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রস্তাব করা তারিখই চূড়ান্ত হয়। কিন্তু সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ হওয়ার পর এখন সে তারিখে বৈঠকে বসতে রাজি হচ্ছে না ভারত।
বাংলাদেশ রেলওয়ের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় এবারকার বৈঠকটি ছিল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দুই দেশের মধ্যে বন্ধ থাকা যাত্রীবাহী ট্রেন চালুর বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল। তার ভাষায়, এসব ট্রেন থেকে সরকারের বড় অঙ্কের রাজস্ব আসে— বিষয়টি এমন নয়; বরং দুই দেশের মানুষের যোগাযোগ ও সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবেই এর গুরুত্ব বেশি।
তিনি বললেন, ‘এখানে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার না চাইলে দিল্লির কোনো প্রতিনিধিদলের ঢাকায় আসার সুযোগ নেই। ফলে বৈঠকটি পিছিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক বিবেচনা একেবারেই নেই— এমনটি বলা কঠিন।’
প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ, সীমান্ত, বাণিজ্য ও অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে নির্দিষ্ট সময় পরপর বৈঠক হওয়া অনেকটা নিয়মিত প্রক্রিয়া। পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের ‘ফরেন অফিস কনসালটেশন’ বা এফওসি, স্বরাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের ‘হোম সেক্রেটারি লেভেল টকস’, যৌথ নদী কমিশন, যৌথ বাণিজ্য কমিটি বা জেটিসি এবং নৌপথ ও প্রটোকল রুট নিয়ে পিআইডব্লিউটিটি স্ট্যান্ডিং কমিটির বৈঠক এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। কোনোটি হয় ঢাকায়, কোনোটি দিল্লিতে। কিন্তু নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের কোনো বৈঠক ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়নি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সাহাব এনাম খান মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য দিল্লি সফরের সঙ্গে রেল বৈঠক পেছানোর সরাসরি সম্পর্ক নাও থাকতে পারে, তবে পরোক্ষ সম্পর্ক উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তিনি বললেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের সঙ্গে এর কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে হয় না। তবে পরোক্ষ সম্পর্ক থাকতে পারে। সরকারপ্রধানের সফরের সঙ্গে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুতিরও সম্পর্ক থাকে। সরকার যেহেতু অনুকূল পরিবেশ চায়, তাই কূটনৈতিক প্রস্তুতিতে পরিবর্তন আসাটা স্বাভাবিক। এমন পরিস্থিতিতে বৈঠক পিছিয়ে যাওয়াও অস্বাভাবিক নয়।’
রেলপথ মন্ত্রণালয় বলছে, এবারই বাংলাদেশ-ভারত আইজিআরএমের ৩৮তম বৈঠক হওয়ার কথা। এর আগে ২০২৫ সালের ২০-২২ জানুয়ারি নয়াদিল্লির রেলভবনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ৩৭তম বৈঠক। সে ধারাবাহিকতায় এবার আয়োজনের দায়িত্ব ছিল ঢাকার।
এবারের বৈঠকের জন্য বাংলাদেশ এর মধ্যে দফায় দফায় প্রস্তুতি বৈঠক করে আলোচ্যসূচি ঠিক করেছে। মৈত্রী, মিতালী ও বন্ধন এক্সপ্রেস আবার চালুর বিষয়টি আলোচনায় জোরালোভাবে তোলার প্রস্তুতি ছিল। একই সঙ্গে যাত্রীদের অতিরিক্ত মালপত্র বহনের সুবিধায় ট্রেনের সঙ্গে লাগেজ ভ্যান যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া, রাজশাহী-কলকাতার মধ্যে নতুন যাত্রীবাহী ট্রেন চালুর দাবি জানানো এবং বিদ্যমান রেল যোগাযোগ আরও কার্যকর করার বিষয়গুলোও আলোচ্যসূচিতে ছিল।
বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আটটি আন্তঃদেশীয় রেল ইন্টারচেঞ্জ থাকলেও সচল রয়েছে পাঁচটি। স্বাধীনতার আগে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক রেলপথগুলোর সঙ্গে পরবর্তী সময়ে বাণিজ্য ও যাত্রী চলাচলের সুবিধার জন্য যুক্ত হয়েছে নতুন সংযোগ। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে যাত্রী পরিবহনে। পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল অব্যাহত থাকলেও যাত্রীবাহী ট্রেন বন্ধ থাকায় দুই দেশের মানুষের সরাসরি রেল যোগাযোগ কার্যত স্থবির।
বৈঠকে অচল রেলসংযোগগুলো পর্যায়ক্রমে সচল করা, মালবাহী ট্রেন পরিচালনা আরও সহজ করা, সীমান্ত স্টেশনগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং আন্তঃদেশীয় রেল অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়েও আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। চলমান যৌথ প্রকল্পের অগ্রগতি, সীমান্ত রেলসংযোগ এবং কারিগরি সহযোগিতাও ছিল আলোচ্যসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামানের মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রেল যোগাযোগের গুরুত্ব শুধু যাত্রীসেবা বা বাণিজ্যিক আয়ের হিসাবে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না।
তিনি বলেছেন, ‘দুই দেশের মধ্যে ট্রেন চালানো যাত্রীসেবা বা আয়ের উৎসের চেয়ে সম্প্রীতির বড় প্রতীক হিসেবে কাজ করে। সে বিবেচনায় বৈঠকটির গুরুত্ব অনেক বেশি ছিল। আইজিআরএম শুধু রেল খাতের একটি নিয়মিত বৈঠক নয়; এটি ঢাকা-দিল্লির মধ্যে স্থবির হয়ে পড়া প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপ আবার সচল করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ছিল।’
সে পরীক্ষাই এখন আপাতত স্থগিত। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেই রেল বৈঠক পেছানোর সিদ্ধান্তকে তাই নিছক সময়সূচির পরিবর্তন হিসেবে দেখতে নারাজ সংশ্লিষ্টদের অনেকে। ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে কারণ জানালে হয়তো পরিষ্কার হবে, কেন নির্ধারিত সময়ে প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসছে না।






