শরণখোলা
এক মাসে তালের শাঁসে কোটি টাকার বাণিজ্য

ছবি: আগামীর সময়
পানি তাল বা তাল শাঁস। অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন নাম রয়েছে এই মৌসুমি ফলটির। তবে যে নামেই পরিচিত হোক না কেন, গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদে তৃষ্ণা নিবারণে জুড়ি নেই পানি তালের শাঁসের। এই পানি তাল শুধু যে তৃষ্ণা মেটায় তা নয়, এর রয়েছে নানা স্বাস্থ্য উপকারিতা। এ ছাড়া গ্রামে বাড়িতে বাড়িতে ধুম পড়ে ভাদ্রমাসের পাকা তালের পিঠা, পুলি, পায়েসের।
অপরদিকে পানি তালের উপকারিতার পাশপাশি প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে তাল গাছেরও। এই গাছ সুউচ্চ, শক্তিশালী এবং দীর্ঘজীবী। বিশেষ করে বজ্রপাত নিরোধে এবং ঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি থেকে বাঁচাতে উপকূলের রক্ষাকবজ হিসেবে ভূমিকা পালন করে তাল গাছ।
গ্রামবাংলার জনপ্রিয় এবং রসালো এই ফলটির চলছে এখন ভরা মৌসুম। একসময় মানুষ সখ করে খেত পানি তাল। কিন্তু সেই খাওয়ার সখ এখন পরিণত হয়েছে বাণিজ্যিক উৎস হিসেবে। যার বাড়িতে তাল গাছ আছে তারা নিজেরা না খেয়ে রেখে দিচ্ছেন বিক্রির জন্য। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে গাছ থেকে তাল সংগ্রহ করে তা চালান করছেন শহরে।
পানি তালকে কেন্দ্র করে উপকূলীয় জনপদ বাগেরহাটের শরণখোলায় গড়ে উঠেছে প্রায় কোটি টাকার মৌসুমি ব্যবসা। জ্যৈষ্ঠ মাসই এই ব্যবসার এবং শাঁস খাওয়ার উপযুক্ত সময়। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এই ব্যবসায় সম্পৃক্ত রয়েছেন অন্তত ১৫ জন ব্যবসায়ী। এ ছাড়া গাছ থেকে তাল কাটা ও পরিবহনে কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে এলাকার আরও শতাধিক হতদরিদ্র মানুষের। শহুরে মানুষের কাছে এই পানি তালের চাহিদা দিন দিন বাড়ায় ফলটির স্বাদ আগের মতো আর নিতে পারছেন না গ্রামের মানুষ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাল গাছ প্রকৃতির জন্য এক আশীর্বাদ। কিন্তু উপকূলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় কমছে গাছের সংখ্যা। আগের মতো গাছের বৃদ্ধি হচ্ছে না। আবার গাছ থাকলেও তাতে ফল ধরছে কম। শাঁস তালের চাহিদা থাকলেও সেতুলনায় হচ্ছে না উৎপাদন। তাছাড়া সচেতনতার অভাবে অপ্রয়োজনীয় মনে করে গাছ কেটে বিক্রি করাসহ নানা কাজেও ব্যবহার করছেন মানুষ। এর ফলে বিরূপ প্রভাব পড়ছে প্রকৃতিতেও।
মৌসুমি পানি তাল ব্যবসায়ী শরণখোলার রায়েন্দা ইউনিয়নের খাদা গ্রামের এমাদুল হক ও সবুর আকনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা প্রায় ১০ বছর ধরে এই তালের ব্যবসা করছেন।
এ ছাড়া উপজেলার খোন্তাকাটা, ধানসাগর এবং সাউথখালী ইউনিয়নেও আরও ১০ থেকে ১২ জন পাইকারী ব্যবসায়ী রয়েছেন। তারা একেকজন পাইকার প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ হাজার তাল সংগ্রহ করেন। এই তাল পিকাপে করে চালান করেন ঢাকার সদর ঘাটের শাম বাজার আড়তে।
এই ব্যবসায়ীদের তথ্য মতে, তালে পরিপূর্ণ শাঁস আসার অন্তত দুই মাস আগে গ্রামে ঘুরে ঘুরে গাছের মালিকদের অগ্রীম টাকা দিয়ে আসেন তারা। এরপর সময় মতো শ্রমিক দিয়ে সেই তাল কেটে সংরক্ষণ করেন। প্রতি পিচ তাল মালিকের কাছ থেকে গড়ে কেনা পড়ে দেড় টাকা থেকে দুই টাকা করে। আর তাল কাটার জন্য গাছ প্রতি শ্রমিককে দিতে হয় ২০০ টাকা। এর পরে ঢাকায় নেওয়া পর্যন্ত সব খরচ মিলিয়ে একটি তালের কেনা দাম দাড়ায় ৭ থেকে ৮ টাকা। সর্বশেষ ঢাকার আড়তে প্রতি পিচ বিক্রি হয় ৯ থেকে ১০ টাকায়।
তারা আরও জানান, একেকজন পাইকার মৌসুমের এক মাসে ৮ লাখ টাকা থেকে ১০ লাখ টাকার তাল ঢাকায় চালান করেন। তাতে ১০-১২ জন ব্যবসায়ী মিলে প্রায় কোটি টাকার তাল চালান করছেন প্রতি বছর। গাছের সংখ্যা ও ফলন দিন দিন কমছে। গাছে তাল কম হলেও শ্রমিকের মজুরি গাছ প্রতি ২০০ টাকাই দিতে হয়। পরিবহন খরচও বেড়ে গেছে বহুগুণ। যে কারণে আগের মতো লাভ করতে পারছেন না বলে হাতাশা প্রকাশ করেন তারা।
পানি তালের উপকারিতা সম্পর্কে জানতে চাইলে শরণখোলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. প্রিয় গোপাল বিশ্বাস বললেন, পানি তাল গরমে শরীরে পানির ঘাটতি পূরণ করে এবং শরীরকে শীতল রাখে। এর কচি শাঁসে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, আয়রন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং হাড় শক্ত করে। এ ছাড়া মানবদেহের জন্য নানা উপকারী উপাদান রয়েছে এই পানি তালে। তাই একবার হলেও সবার খাওয়া উচিৎ এই মৌসুমী ফলটি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দেবব্রত সরকার জানালেন, উপকূলীয় শরণখোলায় লবণাক্তার পরিমাণ বৃদ্ধির কারণে এই গাছের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এরপরও শরণখোলায় গাছের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। কৃষিবিভাগ থেকে প্রতিবছর সড়কের পাশে তালের বীজ রোপণ করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন এনজিও থেকেও বীজ রোপনের কর্মসূচি পরিচালিত হয়ে আসছে। কেউ যাতে তাল গাছ ধ্বংস না করে, সেব্যাপারে সচেতন করা হয়ে থাকে কৃষি বিভাগ থেকে।




