৮ বছর ধরে বন্ধ আদিবাসী স্কুল, শিক্ষাবঞ্চিত শিশুরা

আট বছর ধরে বন্ধ সেন্ট ফিলিপস শিশু শিক্ষাকেন্দ্র
পাবনার ঈশ্বরদীর আদিবাসী পল্লীর শিশুদের ঘরে এখনো শিক্ষার আলো পুরোপুরি পৌঁছায়নি। আর্থিক সংকট, সামাজিক বৈষম্য, অসচেতনতা ও কুসংস্কারের কারণে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অনেক শিশু।
উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে সাতটি আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ বসবাস করেন। এর মধ্যে দাশুড়িয়া ইউনিয়নের মারমী গ্রামে মাল পাহাড়িয়া এবং মুলাডুলি ইউনিয়নের পতিরাজপুর গ্রামে বাগদি সম্প্রদায়ের বসবাস বেশি।
মারমী ও পতিরাজপুরের আদিবাসী শিশুদের জন্য নিজস্ব কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। ফলে তাদের এক থেকে দেড় কিলোমিটার দূরের পার্শ্ববর্তী গ্রামের বিদ্যালয়ে হেঁটে যেতে হয়। দূরের পথের কারণে অনেক শিশু নিয়মিত স্কুলে যেতে চায় না। এতে কেউ কেউ পড়াশোনা ছেড়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে মাঠের কাজে যুক্ত হচ্ছে।
উপজেলার সবচেয়ে বড় আদিবাসী পল্লী মারমীতে ১৯৩২ সালে স্থানীয়দের উদ্যোগে সেন্ট ফিলিপস নামে একটি শিশু শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরে সেখানে পাকা অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। শুরু থেকেই শিক্ষাকেন্দ্রটিতে শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করত। প্রথমে খ্রিষ্টান মিশন এবং পরে কারিতাস নামে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করে। অর্থ সংকটে ২০১৮ সালে এর শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
পল্লীর বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেন্ট ফিলিপস শিশু শিক্ষাকেন্দ্র থেকে পড়াশোনার সুযোগ পেয়ে অনেকেই পরে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় নতুন প্রজন্মের শিশুরা সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একসময় শিশুদের কলকাকলিতে মুখর থাকা শিক্ষাকেন্দ্রটির প্রাঙ্গণ এখন নীরব।
মারমী আদিবাসী পল্লীর প্রধান বার্নাট বিশ্বাস বলেছেন, স্কুলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিশুদের খ্রিষ্টান ধর্ম ও নিজস্ব ভাষায় শিক্ষার সুযোগও বন্ধ হয়ে গেছে। পাশের গ্রামের বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করলেও সেখানে নিজেদের ধর্ম ও ভাষা সম্পর্কে শেখার সুযোগ নেই। নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে সেন্ট ফিলিপস শিক্ষাকেন্দ্রটি আবার চালু করা প্রয়োজন।
সেন্ট ফিলিপস শিশু শিক্ষাকেন্দ্রের সাবেক শিক্ষিকা আগনেশ মাধবী বিশ্বাস বলেছেন, অর্থের অভাবে আদিবাসী পল্লীর একমাত্র শিশু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এটি চালু করতে সরকারি-বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা এগিয়ে আসেনি। এক থেকে দেড় কিলোমিটার পথ হেঁটে পাশের বিদ্যালয়ে যেতে হয় শিশুদের। এতে অনেকেই শিক্ষাবিমুখ হয়ে পড়ছে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলাম জানালেন, শিক্ষাকেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মারমী পল্লীর শিশুদের পড়াশোনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। স্কুলটি চালুর জন্য তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে একাধিকবার যোগাযোগ করেও কোনো আশ্বাস পাওয়া যায়নি। কারিতাস ও খ্রিষ্টান মিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছিল, তবে সাড়া মেলেনি।
এ বিষয়ে ঈশ্বরদী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহিনা আক্তার বলেছেন, আদিবাসী পল্লীর এই শিশু শিক্ষাকেন্দ্র সম্পর্কে তিনি অবগত নন। তবে প্রতিষ্ঠানটি কেন বন্ধ রয়েছে, তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।




