দুই বছর বেতন পান না পদ্মা সেতু পুনর্বাসনের চার স্কুলের শিক্ষকরা

প্রায় দুই বছর ধরে বেতন-ভাতা ছাড়াই দায়িত্ব পালন করছেন পদ্মা সেতু পুনর্বাসনের চার স্কুলের শিক্ষকরা। ছবি: আগামীর সময়
পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য ঘরবাড়ি হারানো মানুষের সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে গড়ে তোলা হয়েছিল চারটি পুনর্বাসন বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর পর এখন এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীরাই পড়েছেন অনিশ্চয়তায়। প্রায় দুই বছর ধরে বেতন-ভাতা ছাড়াই দায়িত্ব পালন করছেন তারা। সরকারি বরাদ্দ না থাকায় শিক্ষা উপকরণ, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে বিদ্যালয়গুলো।
মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার যশলদিয়া ও কুমারভোগ, শরীয়তপুরের নাওডোবা এবং মাদারীপুরের বাখরেরকান্দি পদ্মা সেতু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। চার বিদ্যালয়ে শিশু শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত কয়েক হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।
পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য যেসব পরিবারকে বসতভিটা ছেড়ে দিতে হয়েছিল, তাদের পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর ও মাদারীপুরের চার এলাকায় পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়। পুনর্বাসন এলাকার শিশুদের শিক্ষার কথা বিবেচনায় নিয়ে সেখানে প্রতিষ্ঠা করা হয় পদ্মা সেতু প্রাথমিক বিদ্যালয়।
২০১৭ সালে বিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রম শুরু হয়। ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে বিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হয়েছে। প্রথমে রিসোর্স ইন্টিগ্রেশন সেন্টার (রিক) এবং পরে সমাহার এনজিও পরিচালনার দায়িত্বে ছিল। ওই সময় শিক্ষক-কর্মচারীরা নিয়মিত বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পেতেন।
২০২৪ সালের জুনে বিদ্যালয়গুলো সরকারি ব্যবস্থাপনায় নেওয়ার পরই নতুন সংকট তৈরি হয়। একই বছরের জুলাইয়ে সরকারি গেজেটে বিদ্যালয়গুলো অন্তর্ভুক্ত হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি কার্যক্রম শুরু হয়নি। ফলে শিক্ষক-কর্মচারীরা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করলেও তাদের বেতন-ভাতা দেওয়া হচ্ছে না। বিদ্যালয়গুলোর জন্যও নেই নিয়মিত সরকারি বরাদ্দ।
শিক্ষকদের অভিযোগ, প্রায় দুই বছর ধরে বেতন না পেলেও শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনায় নিয়ে তারা নিয়মিত পাঠদান করছেন। দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়ায় অনেক শিক্ষক-কর্মচারী আর্থিক সংকটে পড়েছেন। কারও কারও চাকরির বয়সও শেষ হয়ে যাচ্ছে। এরইমধ্যে কয়েকজন শিক্ষক চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। শিক্ষকসংখ্যাও কমে গেছে।
তারা জানালেন, প্রচণ্ড গরমে নষ্ট ফ্যানের নিচে শিক্ষার্থীদের ক্লাস করতে হচ্ছে। অনেক শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত বেঞ্চ নেই। কোথাও নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও নেই। ফলে শিক্ষার্থীদের বাড়ি থেকে বোতলে করে পানি নিয়ে আসতে হচ্ছে।
সরকারি বরাদ্দ না থাকায় চক, ডাস্টারসহ প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণও অনেক সময় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় কিনতে হচ্ছে। এতে বিদ্যালয়গুলোর স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
কুমারভোগ পদ্মা সেতু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা উম্মে সিদ্দিকা লিপি জানালেন, বিদ্যালয় সরকারি হওয়ার পর শিক্ষক-কর্মচারীরা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করলেও এখনো সরকারি সুযোগ-সুবিধা পুরোপুরি চালু হয়নি। এতে তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
যশলদিয়া পদ্মা সেতু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা লাকি আক্তার জানিয়েছেন, বিদ্যালয়গুলো দ্রুত সরকারি ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির ব্যবস্থা করা জরুরি। দীর্ঘদিন এভাবে চললে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দাবি, দ্রুত সরকারি কার্যক্রম শুরু করে বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধান করা হোক। পাশাপাশি শিক্ষক-কর্মচারীদের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি চালু করা হোক।
লৌহজং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. এনায়েতুর রহমান জানিয়েছেন, বিদ্যালয়গুলো এখনো পুরোপুরি সরকারি কার্যক্রমের আওতায় না আসায় নিয়মিত সরকারি বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সরকারি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা ববি মিতু জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে সচিবের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। দ্রুত এসব সমস্যার সমাধান করা হবে বলে সচিব আশ্বাস দিয়েছেন।





