অস্ত্রধারীদের পাহারায় ৮ দিন, মুক্তি পেলেন ৫৬ জিম্মি

ছবি: আগামীর সময়
কক্সবাজারের টেকনাফের রঙ্গীখালীর দুর্গম পাহাড়ে মানব পাচারকারীদের আস্তানা থেকে ৫৬ জনকে উদ্ধার করেছে যৌথ বাহিনী। তাদের মধ্যে একজন ফরিদপুরের বাসিন্দা আসাদুজ্জামান। আট দিন ধরে পাহাড়ের একটি ঝুপড়ি ঘরে বন্দী ছিলেন তিনি। দুইবার পালানোর চেষ্টা করেও পারেননি। চারপাশে ছিল অস্ত্রধারীদের পাহারা। কখনো খাবার জুটেছে, কখনো সইতে হয়েছে নির্যাতন।
আসাদুজ্জামানের মতো আরও অর্ধশতাধিক মানুষকে আটকে রাখা হয়েছিল ওই আস্তানায়। তাদের সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচারের পরিকল্পনা ছিল। বৃহস্পতিবার যৌথ বাহিনীর অভিযানে তারা মুক্তি পান। গতকাল শুক্রবার সকালে উদ্ধার হওয়াদের টেকনাফ মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়।
তবে তাদের উদ্ধারে পরিচালিত অভিযানে মানব পাচারকারীদের গুলিতে সেনাবাহিনীর এক সদস্য নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। পাহাড়ে সশস্ত্র পাচারকারীদের আস্তানা নির্মূলে সাঁড়াশি অভিযানের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিরা। শুক্রবার জুমার নামাজের পর টেকনাফের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধনের ডাক দিয়েছেন ছাত্র প্রতিনিধিরা।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, বৃহস্পতিবার বিকেলে রঙ্গীখালীর দুর্গম পাহাড়ে মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে যৌথ বাহিনী অভিযান চালায়। এ সময় সশস্ত্র পাচারকারীদের সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে পাচারকারীদের গুলিতে সেনাসদস্য সৈনিক মো. তিতাস শেখ (২৭) নিহত হন।
অভিযানে মানব পাচারকারী চক্রের ছয় সদস্যকে আটক করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে একটি পিস্তল, দেশীয় তৈরি একটি বন্দুক ও চার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন, বিজিবি ও পুলিশ অভিযানে অংশ নেয়।
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, পাহাড়ে মানব পাচারকারীদের আস্তানা থেকে উদ্ধার হওয়া ৫৬ জনকে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তাদের পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়া চলছে।
ওসি আরও বলেন, বৃহস্পতিবার প্রথমে ৫৭ জনকে উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছিল। পরে যাচাই-বাছাই করে দেখা যায়, তাদের মধ্যে একজন দালাল ছিলেন। এ কারণে প্রকৃত জিম্মির সংখ্যা ৫৬।
আট দিন ঝুপড়িতে বন্দী, দুইবার পালানোর চেষ্টা
থানা হেফাজতে থাকা ফরিদপুরের বাসিন্দা আসাদুজ্জামান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আট দিন ধরে তাকে পাহাড়ের একটি ঝুপড়ি ঘরে বন্দী করে রাখা হয়েছিল। দুইবার পালানোর চেষ্টা করেও সফল হননি। পাহাড়ে ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি সশস্ত্র পাহারাদল ছিল।
আসাদুজ্জামান জানান, কক্সবাজারের একটি সেতুতে চাকরি করার সুবাদে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পের রোহিঙ্গা ইমামুলের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে তাদের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে ক্যাম্পে কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আট দিন আগে তাকে ডেকে নেওয়া হয়। তার মুঠোফোনসহ সঙ্গে থাকা সবকিছু কেড়ে নেওয়া হয়। পরে রাতে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে তাকে পাহাড়ে নিয়ে মানব পাচারকারীদের হাতে তুলে দেন ওই রোহিঙ্গা নাগরিক।
আসাদুজ্জামানের ভাষ্য, পাহাড়ে গিয়ে তিনি দেখেন, তার মতো আরও অর্ধশতাধিক মানুষকে আটকে রাখা হয়েছে। তখনই বুঝতে পারেন, তিনি মানব পাচারকারী চক্রের ফাঁদে পড়েছেন।
তিনি বলেন, দুই দিন আগে শতাধিক নৌকাসহ একটি ট্রলার সাগরপথে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তাকে আরও পাঁচজনের সঙ্গে সেখানে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু জায়গা না থাকায় সেদিন ট্রলারে তোলা হয়নি। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার তাদের পাচারের পরিকল্পনা ছিল। এর আগেই সেনাবাহিনী এসে তাদের উদ্ধার করে।
এক লাখ টাকায় বিক্রির অভিযোগ
পাহাড় থেকে উদ্ধার হওয়া উখিয়ার সেবতখালীর বাসিন্দা মো. সাইফুল ও মিজানুর রহমান সাগর বলেন, কাজ দেওয়ার কথা বলে নূরালী নামে এক দালাল তাদের মানব পাচারকারীদের হাতে তুলে দেন। পরে পাচারকারীদের কাছ থেকেই তারা জানতে পারেন, তাদের দুজনকে এক লাখ টাকায় কেনা হয়েছে।
সাইফুল ও সাগর বলেন, ‘পাঁচ দিন ধরে দেখেছি, প্রতিদিন চার-পাঁচজন করে নতুন মানুষ এনে সেখানে জড়ো করা হচ্ছে। কেউ কথা বলতে চাইলে তাকে ব্যাপক মারধর করা হতো। পালানোর চেষ্টা করায় আমরাও মারধরের শিকার হয়েছি। পরে আমাদের লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।’
তাদের ভাষ্য, দিনে মাত্র দুই বেলা খাবার দেওয়া হতো। খাবার হিসেবে দেওয়া হতো কাঁচা কদু ও ডাল। ক্ষুধায় তাদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠেছিল। বৃহস্পতিবার তাদের ট্রলারে তুলে সাগরপথে পাচারের পরিকল্পনা ছিল। এর আগেই যৌথ বাহিনী তাঁদের উদ্ধার করে।
পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযানের দাবি
পাহাড়ে সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। হ্নীলার বাসিন্দা নুর আলম বলেন, পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযান প্রয়োজন। তা না হলে মানব পাচারকারীদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ভাঙা সম্ভব হবে না। প্রতিদিনই পাহাড়ে গুলির শব্দ শোনা যায়। সশস্ত্র পাচারকারীদের কারণে পুরো এলাকা অনিরাপদ হয়ে উঠেছে।
নুর আলম আরও বলেন, বাহারছড়া, হ্নীলা ও হোয়াইক্যংয়ের পাহাড়ে অস্ত্রধারীদের আস্তানা গড়ে উঠেছে। এসব আস্তানা নির্মূলে একযোগে অভিযান চালানো জরুরি।
টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, পাহাড়কেন্দ্রিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে শীত মৌসুমে মানব পাচারকারীদের আনাগোনা চোখে পড়ার মতো। বৃহস্পতিবার পাচারকারীদের আস্তানায় গোলাগুলিতে একজন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। এর চেয়ে ভয়াবহ ঘটনা আর কী হতে পারে। সাধারণ মানুষ অপরাধীদের কাছে অনেকটা অসহায়। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযান অত্যন্ত জরুরি।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, পাহাড়ে অবস্থানরত সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। অপরাধ করে কারও পার পাওয়ার সুযোগ নেই।
তিনি আরও বলেন, সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের গুলিতে দায়িত্ব পালনরত একজন সেনাসদস্য নিহত হওয়ার ঘটনায় তারা গভীরভাবে মর্মাহত ও শোকাহত। এ ধরনের অপরাধ নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন।




