টঙ্গী-কালীগঞ্জ সড়ক
জোড়াতালির মেরামতে ঝুঁকিতে যাত্রীরা

ছবি: আগামীর সময়
রাজধানীর কোলঘেঁষা টঙ্গী-কালীগঞ্জ আঞ্চলিক সড়ক এখন খানাখন্দ, যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে জনদুর্ভোগের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির বিভিন্ন অংশে স্থায়ী ও টেকসই মেরামত না হওয়ায় ইট ও সুরকি দিয়ে সাময়িক সংস্কার চালিয়ে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। তবে এক পশলা বৃষ্টিতেই সেই মেরামত ধুয়ে গিয়ে আবারও সৃষ্টি হচ্ছে বড় বড় গর্ত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় দুই বছর ধরে সড়কটির স্থায়ী মেরামতের জন্য কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। বিভিন্ন সময় ইট ও সুরকি ফেলে সাময়িকভাবে চলাচলের উপযোগী করার চেষ্টা করা হলেও তা টেকসই হচ্ছে না।
রবিবার সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, টঙ্গী-কালীগঞ্জ সড়কের বিভিন্নস্থানে ছোট-বড় অসংখ্য খানাখন্দ। অনেক গর্তে জমে আছে বৃষ্টির পানি। কোথাও কোথাও ইট ও সুরকি দিয়ে মেরামত করা অংশের ইট সরে গিয়ে সড়কটি যানবাহন চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
এমন ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক দিয়েই প্রতিদিন শত শত ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, দূরপাল্লার বাসসহ ছোট ছোট ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে।
সড়কটির সবচেয়ে নাজুক অবস্থা মরকুন এলাকায় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সামনের অংশে, সিলমুন বাজার, নিমতলী ব্রিজের পার্শ্ববর্তী এলাকা এবং বসুগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন সড়কে।
খানাখন্দে ভরা এসব এলাকায় প্রতিনিয়ত দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে যে পথ পাড়ি দিতে প্রায় ৩০ মিনিট সময় লাগার কথা, সেখানে যানজটে আটকে থেকে অনেক সময় প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগছে বলে জানিয়েছেন যাত্রীরা। এই দুর্ভোগের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন চাকরিজীবী, পরিবহন শ্রমিক ও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা।
উত্তরা রাজউক কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী আজমাইন বলেন, ‘নিয়মিত এই সড়ক দিয়েই কলেজে যাতায়াত করি। কিন্তু রাস্তার বেহাল অবস্থার কারণে সময়মতো কলেজে পৌঁছাতে পারি না। ব্যাটারিচালিত অটো বা ইজিবাইকে চলাচল করলে উল্টে যাওয়ার ভয় থাকে। আমরা এর স্থায়ী সমাধান চাই।’
শুধু শিক্ষার্থী বা সাধারণ যাত্রী নয়, জীবিকার তাগিদে চলাচল করা নিম্নআয়ের পরিবহন চালকরাও পড়েছেন চরম বিপাকে।
স্থানীয় অটোচালক মনু মিয়া বলেন, ‘দিনে তিন-চারবার ট্রিপ দিলেই অটোর বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ভেঙে যায়। এমনিতেই আয়-রোজগার কম। তার ওপর গাড়ি মেরামতে বাড়তি টাকা খরচ হওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কয়েক দিন পরপর ভাঙা জায়গায় ইট-সুরকি ফেলা হয়, কিন্তু একটু বৃষ্টি হলেই সব ভেসে যায়। দুই-তিন বছর ধরে এভাবেই চলছে।’
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) টঙ্গী পূর্ব থানার সাংগঠনিক সম্পাদক ও প্রকৌশলী শেখ সাদী অভিযোগ করে বলেন, ‘কয়েক দফায় এই রাস্তা আরসিসি করার জন্য নানা বাজেটের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সেই বাজেটের বাস্তবায়ন হয়নি, কাজও শুরু হয়নি। মরকুন ও সিলমুন এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এই রাস্তার কারণে ভোগান্তির শিকার।’
একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তিনি বিভিন্ন সময় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি অবহিত করেছেন বলেও জানান।
প্রকৌশলী শেখ সাদী বলেন, ‘রাস্তার গুণগত মান ভালো না হওয়ায় বৃষ্টি হলেই বিটুমিনের নিচে পানি ঢুকে রাস্তা ভেঙে যায়। পরে ইট দিয়ে অস্থায়ী মেরামত করা হয়। আবার বৃষ্টি হলে সেই অংশ আরও বেশি ভেঙে বড় গর্তে পরিণত হয়। এতে যানবাহন চলাচল মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়ে এবং দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়।’
তিনি দ্রুত এই সড়কের স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়ে বলেন, ‘জেটিআই গেট থেকে নিমতলী রেলগেট পর্যন্ত টেকসই আরসিসি সড়ক নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি পানি নিষ্কাশনের জন্য রাস্তার দুই পাশে আরসিসি ড্রেন নির্মাণ করা প্রয়োজন। তাহলে এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কের যানজট অনেকাংশে কমবে এবং সিলেট, নরসিংদী ও কালীগঞ্জমুখী যানবাহনের চলাচল সহজ হবে।’
টঙ্গীর সিলমুন এলাকার বাসিন্দা ও মানবাধিকারকর্মী মাসুম রানা বলেন, ‘এই সড়ক ব্যবহার করে প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন এবং লাখো সাধারণ যাতায়াত করেন। বর্তমানে স্থানীয়রা চরম ভোগান্তিতে রয়েছে। যারা দূরপাল্লার যানবাহনে এই সড়ক ব্যবহার করেন, তাদের অবস্থা আরও নাজুক।’ তিনি দ্রুত সড়কটি প্রশস্ত করে চার লেনে উন্নীত করার দাবি জানান।
গাজীপুর মহানগরীর ৪২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদপ্রার্থী জাকির হোসেন সরকার বলেন, ‘সড়কটির অবস্থা এতটাই বেহাল যে উত্তরার দিক থেকে পূবাইলে যেতে দীর্ঘ যানজটের কারণে প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লেগে যায়। ফলে বর্তমানে অনেক সময় আমাকে রাজধানীর ৩০০ ফিট সড়ক দিয়ে ঘুরে পূবাইলে যেতে হয়।’
তিনি সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রতি দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি প্রশস্ত ও স্থায়ীভাবে মেরামতের দাবি জানান।
এ বিষয়ে গাজীপুর সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘অতিবৃষ্টির কারণে বিটুমিন নষ্ট হয়ে যায়। বৃষ্টি চলাকালীন স্থায়ী মেরামতের কাজ শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে আমরা টেন্ডার প্রক্রিয়ার যাবতীয় প্রস্তুতি শেষ করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘জনসাধারণের চলাচলের সুবিধার্থে আপাতত ইট-সুরকি দিয়ে সাময়িক রিপেয়ারিং করা হচ্ছে। বৃষ্টির মৌসুম শেষ হলেই সড়কটির স্থায়ী সমাধানের কাজ শুরু করা হবে।’







