সাক্ষাৎকার
শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ ১০ শতাংশে নিতে হবে

সাইফুল ইসলাম
আঞ্চলিক পর্যায়ে একটি কার্যকর, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে গ্রহণযোগ্য শেয়ারবাজার হিসেবে বাংলাদেশের পরিচিতি তৈরি করতে চান ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম। এজন্য বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। আগামীর সময়ের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে বাজার সংস্কার নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিজনেস এডিটর মিজান চৌধুরী
প্রশ্ন: বর্তমান মন্দার মূল কারণ কী?
সাইফুল ইসলাম: বর্তমান মন্দার শিকড় অনেক পুরনো। ২০১০ সালের বাজারধসের পর ধারাবাহিকভাবে কিছু ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ফ্লোর প্রাইস ছিল বড় ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত। গত ১৫ বছরে প্রায় ১৩০টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হলেও ৬০ থেকে ৭০টি এখন মোটামুটি অস্তিত্বহীন। ভালোমানের শেয়ারও কমেছে। ফলে বাজারের মূল ‘প্রোডাক্ট’ দুর্বল হয়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংকট এবং দীর্ঘদিন নতুন ও ভালো কোম্পানি না আসায় বাজারের গভীরতাও কমেছে।
প্রশ্ন: বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে কী করণীয়?
সাইফুল ইসলাম: কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়। বিএসইসি, স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্রোকার, মার্চেন্ট ব্যাংকারসহ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীর অর্থ নিরাপদ— এমন আস্থা তৈরি করতে হবে। আর্থিক প্রতিবেদন ও বাজার মধ্যস্থতাকারীদের কার্যক্রমের মানও উন্নত করা জরুরি।
প্রশ্ন: বাজার মূলধন কমার পেছনে প্রাতিষ্ঠানিক বা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিষ্ক্রিয়তা আছে কি?
সাইফুল ইসলাম: বাজার সবসময় একমুখীভাবে বাড়বে না। বছরের শুরু থেকে আগস্ট পর্যন্ত সূচকসহ বাজারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। সে তুলনায় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বাজার মূলধন কমা অস্বাভাবিক নয়। মিউচুয়াল ফান্ড ও অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিকে শক্তিশালী করতে হবে।
প্রশ্ন: বিএসইসির সংস্কার কতটা বাস্তবসম্মত?
সাইফুল ইসলাম: মিউচুয়াল ফান্ড ও মার্জিন ঋণ ব্যবস্থার সংস্কার ইতিবাচক। তবে সবচেয়ে বড় সংস্কার প্রয়োজন প্রাইমারি মার্কেটে। নতুন আইপিও না আসায় বিনিয়োগের সুযোগ কমেছে। তাই আইপিওর পাশাপাশি ডাইরেক্ট লিস্টিং ও নতুন বিনিয়োগ পণ্য চালু করা জরুরি। সংস্কার বাস্তবায়িত হলে ছয় মাসে বড় পরিবর্তন এবং এক থেকে দেড় বছরে কাঠামোগত উন্নতি দৃশ্যমান হতে পারে।
প্রশ্ন: ফ্লোর প্রাইস কি বাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে?
সাইফুল ইসলাম: ফ্লোর প্রাইস বাজারের জন্য ক্ষতিকর এবং বর্তমান অবস্থার অন্যতম কারণ। ‘ফ্লোর প্রাইস ইজ এ কার্স।’ ক্রেতা-বিক্রেতার সম্মত মূল্যই বাজারমূল্য হওয়া উচিত। ফ্লোর তুলে দেওয়ার পর বেক্সিমকো ফার্মা ও ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারে স্বাভাবিক লেনদেন হচ্ছে।
প্রশ্ন: নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের তদারকি নিয়ে আপনার মত কী?
সাইফুল ইসলাম: এটি শেয়ারবাজারের বড় সংকট। ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি), আইসিএবি, বিএসইসিসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিরীক্ষার মান উন্নয়নে কাজ করছে। এফআরসিকে আরও শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক করতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক মানের আর্থিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষা নিশ্চিত হয়।
প্রশ্ন: এফআরসির মূল ঘাটতি কোথায়?
সাইফুল ইসলাম: এফআরসির মূল সমস্যা পর্যাপ্ত জনবল ও সক্ষমতার ঘাটতি। দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর প্রতিষ্ঠানটি এখন সক্রিয় হচ্ছে। তাই সক্ষমতা বাড়াতে সরকারের আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রশ্ন: শেয়ারবাজার নিয়ে সরকারের কাছে ডিবিএর প্রস্তাব কী?
সাইফুল ইসলাম: ডিবিএ সরকারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছে। বিএসইসি, স্টক এক্সচেঞ্জ, মার্চেন্ট ব্যাংকারসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। প্রযুক্তি, মানবসম্পদ ও নতুন বিনিয়োগ পণ্যে বাংলাদেশ ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের তুলনায় পিছিয়ে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষমতায়িত না করলে টেকসই বাজার সম্ভব নয়।
প্রশ্ন: আগামী পাঁচ বছরে বাজারকে কোথায় দেখতে চান?
সাইফুল ইসলাম: বাংলাদেশকে আঞ্চলিক পর্যায়ে কার্যকর, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে গ্রহণযোগ্য বাজার হিসেবে দেখতে চাই। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ভিয়েতনামের তুলনায় এগিয়ে থাকলেও এখন পিছিয়ে গেছে। আগামী পাঁচ বছরে এ অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগ ১ শতাংশের কম থেকে অন্তত ১০ শতাংশ এবং দৈনিক লেনদেন ৬ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকায় নেওয়া উচিত।
প্রশ্ন: বিনিয়োগকারীদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
সাইফুল ইসলাম: তাড়াহুড়া করে বিনিয়োগ না করে কোথায় ও কোন শেয়ারে বিনিয়োগ করা হচ্ছে, তা বুঝতে হবে। গুজব বা অন্যের কথায় নয়, কোম্পানির ব্যবসা, আর্থিক অবস্থা ও সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।





