৬০ লাখ ডলারের ‘কমেডিয়ান’-এর নেপথ্যে পুরোনো এক চমক
কলা পচে যাবে, শিল্প থেকে যাবে!

প্রদর্শনীতে কলা। ছবি: শাটার স্টক
কলা বেশি দিন টেকে না। কয়েকদিনের মধ্যেই পেকে যায়, তারপর পচে যায়। অথচ সেই কলাই যদি দেওয়ালে রুপালি আঠালো টেপ দিয়ে সেঁটে দেওয়া হয়, তার দাম পৌঁছে যেতে পারে ৬০ লাখ ডলারেরও ওপরে! অবিশ্বাস্য শোনালেও শিল্পী মরিজ়িও ক্যাত্তেলানের ‘কমেডিয়ান’- এর গল্প ঠিক এমনই। ২০১৯ সালে মিয়ামি বিচে শিল্পমেলায় প্রথম প্রদর্শিত এই শিল্পকর্মটি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিবিসি কালচারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, বিপুল দামের এই কাজটির আসল চমক হয়তো তার অভিনবত্বে নয় বরং তার পেছনে লুকিয়ে থাকা শিল্পের বহু পুরোনো কৌশলে।
২০১৯ সালের ৪ ডিসেম্বর ‘আর্ট বাসেল মিয়ামি বিচ’- এর প্রদর্শনীতে একটি সাধারণ কলা দেওয়ালে সেঁটে হাজির করেন ক্যাত্তেলান। সেখানে উপস্থিত ছিলেন লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও, মাইকেল বে, ট্রাভিস স্কটের মতো তারকারাও। প্রথমে অনেকেই ভেবেছিলেন, এ যেন নিছক মজা। কিন্তু দ্রুতই বিষয়টি শিল্প-জগতের অন্যতম আলোচিত ঘটনায় পরিণত হয়। দুটি সংস্করণ ১ লাখ ২০ হাজার ডলার করে এবং তৃতীয়টি ১ লাখ ৫০ হাজার ডলারে বিক্রি হয়। ক্রেতাদের দেওয়া হয়েছিল কাজটির সত্যতার শংসাপত্র এবং কীভাবে কলাটি প্রদর্শন করতে হবে, তার নির্দেশনাও। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট সময় অন্তর আসল কলা বদলে ফেলতে হবে।
তারপর যা হওয়ার তাই হল। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ল ‘কলার শিল্প’। কেউ হাসলেন, কেউ ক্ষুব্ধ হলেন, কেউ প্রশ্ন তুললেন - এটা আদৌ শিল্প কি না। অনেকে আবার দেওয়ালে কলা সেঁটে সেই কাজের অনুকরণও শুরু করলেন। ২০২৪ সালে এই শিল্পকর্মের একটি সংস্করণ নিলামে ৬২ লাখ ৪০ হাজার ডলারে বিক্রি হলে বিতর্ক আরও জোরালো হয়। কিন্তু ক্যাত্তেলানের এই কৌশল একেবারে নতুন নয়। শিল্পের ইতিহাসে দর্শককে চমকে দেওয়া, প্রতিষ্ঠিত রুচিকে ব্যঙ্গ করা এবং ‘শিল্প’ বলতে ঠিক কী বোঝায়- এই প্রশ্ন তোলার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। উনিশ শতকে টার্নার, কনস্টেবল, মানে, মোনে, গগ্যাঁ, হুইসলারের মতো বড় শিল্পীরাও সমকালীন রুচির বিরোধিতার মুখে পড়েছিলেন।
আর ক্যাত্তেলানের ‘কমেডিয়ান’-এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও পুরোনো একটি ধারণা- ‘রেডিমেড’। অর্থাৎ শিল্পী নিজে কিছু তৈরি না করে দৈনন্দিন জীবনের তৈরি কোনো বস্তুকেই শিল্প হিসেবে হাজির করেন। মার্সেল দ্যুশাঁ ১৯১০ - এর দশকেই বোতল রাখার স্ট্যান্ড, সাইকেলের চাকা, এমনকি প্রস্রাবের পাত্রকেও শিল্পের আলোচনায় এনেছিলেন। সেই প্রশ্নের শিকড় আরও পিছিয়ে যায় প্রাচীন গ্রিসের দর্শন পর্যন্ত।
কলা বেছে নেওয়ার মধ্যেও তাই নিছক খেয়াল নেই। ফল, ফুল কিংবা দৈনন্দিন বস্তুকে শিল্পে তুলে ধরার ‘স্টিল লাইফ’ বা স্থিরবস্তুর শিল্পের ইতিহাস অন্তত ষোড়শ শতক পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ক্যাত্তেলানের আগেও জর্জিও দে কিরিকো, অ্যান্ডি ওয়ারহল, গেরিলা গার্লসের মতো শিল্পীরা কলাকে নিজেদের শিল্প কাজে ব্যবহার করেছেন।
ক্যাত্তেলান এর আগেও এমন কাজ করেছেন। ১৯৯৯ সালে নিজের শিল্প- বিক্রেতা মাসিমো দে কার্লোকে দেওয়ালে টেপ দিয়ে আটকে দিয়েছিলেন তিনি। সেই একই রুপালি টেপের পুনরাবির্ভাব ঘটে ‘কমেডিয়ান’- এ। ১৯৯৯ সালের ‘লা নোনা ওরা’-য় পোপ জন পল দ্বিতীয়কে উল্কাপিণ্ডের আঘাতে পড়ে যেতে দেখা যায়। ২০০১ সালের ‘হিম’- এ প্রার্থনারত এক শিশুর শরীরে বসানো হয়েছিল অ্যাডলফ হিটলারের মুখ।
অর্থাৎ কলাটি যতটা হাস্যকর, তার পেছনের শিল্প ভাবনাটি ততটাই হিসাবি। ক্যাত্তেলান চেনা জিনিস, ব্যঙ্গ, বিতর্ক এবং শিল্পবাজার সবকিছুকে এক জায়গায় এনে এমন একটি শিল্পকর্ম তৈরি করেছেন। যা নিয়ে কথা না বলে থাকা খুব কঠিন। মজার বিষয়, ‘কমেডিয়ান’ ২০১৯ সালের মিয়ামি বিচের সবচেয়ে দামি শিল্পকর্মও ছিল না আবার নিলামে বিক্রি হওয়া সবচেয়ে দামি ‘রেডিমেড’ও নয়। শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটা কলার দাম নিয়ে যতটা, তার চেয়ে বেশি শিল্পের সংজ্ঞা নিয়ে। কলা পচে যাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ক্যাত্তেলানের তৈরি বিতর্কটি থেকে যাবে। আর সেই বিতর্কের সবচেয়ে বড় কৌতুক সম্ভবত এখানেই - যে শিল্পকর্মকে এত বিস্ময়কর ও অভিনব মনে হয়েছিল, তার প্রায় প্রতিটি কৌশলই শিল্পের ইতিহাসে বহু আগেই ব্যবহৃত হয়ে গেছে।
সূত্র: বিবিসি





