মানুষের সন্তুষ্টি নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টিই হোক লক্ষ্য

প্রতীকী ছবি
মানুষ সামাজিক জীব। তাই মানুষের ভালোবাসা, প্রশংসা ও গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা একজন ব্যক্তির স্বাভাবিক প্রবৃত্তির অংশ। কিন্তু এই আকাঙ্ক্ষা যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির চেয়ে বড় হয়ে যায়, তখনই শুরু হয় নৈতিক বিপর্যয়। মানুষকে খুশি করতে গিয়ে অনেক সময় মানুষ আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে ফেলে। অথচ একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য মানুষের প্রশংসা পাওয়া নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ বিষয়ে শিক্ষা দিয়ে বলেছেন-
مَنِ الْتَمَسَ رِضَاءَ اللَّهِ بِسَخَطِ النَّاسِ كَفَاهُ اللَّهُ مُؤْنَةَ النَّاسِ وَمَنِ الْتَمَسَ رِضَاءَ النَّاسِ بِسَخَطِ اللَّهِ وَكَلَهُ اللَّهُ إِلَى النَّاسِ
‘যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি আকাঙ্খা করে তা মানুষকে অসন্তুষ্ট করে হলেও, মানুষের দুঃখ-কষ্ট হতে বাচানোর জন্য আল্লাহ্ তাআলাই তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। আর যে ব্যক্তি মানুষের সন্তুষ্টি আশা করে আল্লাহ্ তাআলাকে অসন্তুষ্ট করে হলেও, আল্লাহ তা’আলা তাকে মানুষের দায়িত্বে ছেড়ে দেন।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪১৪; সহিহুল জামে, হাদিস : ৬০১০)
হাদিসটির শিক্ষা অত্যন্ত সহজ, কিন্তু জীবনে প্রয়োগ করা কঠিন। কারণ মানুষের প্রশংসা দৃশ্যমান, আর আল্লাহর সন্তুষ্টি অদৃশ্য। মানুষ প্রশংসা করলে আমরা তাৎক্ষণিক আনন্দ পাই; কিন্তু আল্লাহ সন্তুষ্ট হলেন কি না, তার সংবাদ দুনিয়ায় কোনো বাহ্যিক করতালির মাধ্যমে আসে না। তাই ঈমানের পরীক্ষা এখানেই যে, মানুষ কী বলবে তা নয়, আল্লাহ কী পছন্দ করেন সেটিই একজন মুমিনের সিদ্ধান্তের মাপকাঠি হবে।
পবিত্র কোরআনেও মুমিনদের এই মানসিকতা গড়ে তুলতে বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘বলুন, নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।’ (সুরা আনআম, আয়াত : ১৬২) অর্থাৎ একজন মুমিনের জীবন মানুষের মন জয়ের জন্য নয়; তার জীবন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত।
বাস্তব জীবনে এর বহু উদাহরণ রয়েছে। অন্যায় দেখেও চুপ থাকা, সত্য জেনেও ক্ষমতাবান ব্যক্তিকে খুশি করার জন্য মিথ্যা বলা, হারামকে হালাল বলে চালিয়ে দেওয়া, মানুষের সমালোচনার ভয়ে ইসলামের কোনো বিধান থেকে পিছিয়ে যাওয়া কিংবা লোকদেখানোর জন্য ভালো কাজ করা, সবই মানুষের সন্তুষ্টিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার প্রকাশ। অথচ সত্যের পথে চলতে গেলে কখনো কখনো মানুষের বিরোধিতা আসবেই।
মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা কি মানুষকে ভয় করছ, অথচ আল্লাহই অধিক হকদার যে, তোমরা তাঁকে ভয় করবে?’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ১৩) এই আয়াত মুমিনের অন্তরে একটি মৌলিক ভারসাম্য তৈরি করে। মানুষের অধিকার রক্ষা করতে হবে, মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করতে হবে, কারও প্রতি অন্যায় করা যাবে না। কিন্তু মানুষের সন্তুষ্টির জন্য আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন করা যাবে না।
এর অর্থ এই নয় যে মানুষের মন কষ্ট দেওয়াকে ইসলাম উৎসাহিত করে। বরং ইসলাম মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ, নম্রতা ও সৌজন্যের শিক্ষা দেয়। কিন্তু যেখানে আল্লাহর আনুগত্য এবং মানুষের সন্তুষ্টি পরস্পর বিরোধী হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে অগ্রাধিকার হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির। কারণ মানুষ আজ সন্তুষ্ট, কাল অসন্তুষ্ট; আজ প্রশংসা করবে, কাল নিন্দা করবে। কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টিই চূড়ান্ত সফলতার পথ।
তাই জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আগে নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার: আমি কি মানুষের বাহবা পাওয়ার জন্য এটি করছি, নাকি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য? মানুষ অসন্তুষ্ট হলেও যদি সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকা যায়, তবে সেই সাময়িক অসন্তুষ্টি ক্ষতির নয়। কারণ যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট। আর যে আল্লাহকে ছেড়ে মানুষের সন্তুষ্টির পেছনে ছুটে, শেষ পর্যন্ত সে মানুষের কাছেও পরিপূর্ণ নিরাপত্তা বা সন্তুষ্টি পায় না।
মুমিনের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্বাধীনতা হলো মানুষের প্রশংসা ও নিন্দার ঊর্ধ্বে উঠে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের চূড়ান্ত মানদণ্ড বানানো। মানুষ কী বলবে, তার চেয়ে আল্লাহ কী বলবেন, এই প্রশ্নটিই হোক আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক





