শিপইয়ার্ডে গ্যাস লিকেজ : হাসপাতাল গিয়ে মিলছে স্বজনদের মৃত্যুর খবর

গ্যাস লিকেজে সীতাকুণ্ডের শিপইয়ার্ড শ্রমিকদের মৃত্যুর খবর পেয়ে হাসপাতালে আসা এক স্বজন। ছবি: প্রণব বল
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের লাশঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন মো. মহিউদ্দিন। বারবার কল আসছিল তার মোবাইল ফোনে। একপর্যায়ে ফোন ধরে বললেন, ‘মনসুর ভাই আর নাই।’
সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল নামে শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে লিক হওয়া গ্যাসে মারা গেছেন শ্রমিক মনসুর। তার ভাই নাছিরেরও মৃত্যু হয়েছে আজ সকালের এই দুর্ঘটনায়। দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে, মারা যাওয়া শ্রমিকের সংখ্যা আট। অসুস্থ হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অন্তত ১০ জন।
মনসুর ও নাছিরের বাড়ি ভাটিয়ারী এলাকায়। মনসুর দুটি মেয়ে ও নাছিরের একটি মেয়েসন্তান আছে। একই এলাকায় বাড়ি মহিউদ্দিনেরও। বোনের জামাইয়ের খোঁজ নিতে তিনি আসেন চট্টগ্রাম মেডিকেলে।
মহিউদ্দিন বললেন, ‘সকাল ৭টায় দুই ভাই ইয়ার্ডে চলে যায়। এর ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে দুর্ঘটনার খবর আসে। ফোনে তাদের কাউকে পাওয়া যাচ্ছিল না। তারা অসুস্থ হয়েছে বলে খবর পাচ্ছিলাম। পরে মেডিকেল এসে দেখি দুই ভাই মারা গেছেন। এখন তাদের পরিবার কে চালাবে?’
ভাইয়ের কাছে বারবার ফোন করে মনসুরের খোঁজ নিচ্ছিলেন ফেরদৌসী। একপর্যায়ে বোনকে মৃত্যুর খবরটি জানান মহিউদ্দিন। জরুরি বিভাগে সামনে দাঁড়িয়ে এ সময় আহাজারি করছিলেন তিনি।
তাকে সান্ত্বনা দিতে এগিয়ে আসেন মো. আবসার। তিনি নাছিরের স্ত্রী মনোয়ারার ভাই।
আবসার বললেন, ‘নাছির আমার বোনের জামাই। বোন মনোয়ারা সকালে ফোন করে আমার স্ত্রীকে দুর্ঘটনার খবর জানায়। সে জানে তার স্বামী অসুস্থ হয়েছে। পরে আমি হাসপাতালে এসে দুই ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পেলাম।’
মৃত শ্রমিকের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় নিশ্চিত করেনি পুলিশ। তবে বেশিরভাগই চট্টগ্রামের বাইরের। বিভিন্ন জেলা থেকে তারা কাজে এসেছিলেন বলে জানা গেছে।
আমিনুল নামে আরেক যুবক ছুটে এসে ঢোকেন মর্গে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বের হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। ‘মারা যাওয়া শ্রমিকদের মধ্যে আমার ফুফাতো ভাই রানাও আছে। তার বাড়ি গাইবান্ধায়। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে আমি এলাম। এসেই দেখি মারা গেছে।’
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম জানান, একটি জাহাজ কাটার সময় গ্যাস লিকেজ হয়ে দুর্ঘটনাটি ঘটে।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য, সকাল সাড়ে ১০টার দুর্ঘটনার খবর আসে। স্থানীয় সূত্র জানাচ্ছে, দুর্ঘটনা ঘটেছে সকাল ৯টার পরপর। জাহাজটিতে সে সময় অন্তত ২৫ জন শ্রমিক কাজ করছিলেন। পাম্প কক্ষ থেকে গ্যাস লিকেজ শুরু হয়।
ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা আল মামুন দুপুর দেড়টায় জানান, ঘটনাস্থলে তিনজনের মরদেহ আছে। আর চমেক হাসপাতালে আনার পর পাঁচজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
ঘটনাস্থলে এখন উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে স্থানীয় পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা।
সীতাকুণ্ডের শিপইয়ার্ডগুলোয় পরিত্যক্ত জাহাজ ভেঙে-কেটে মূলত রড তৈরির লোহা সংগ্রহ করা হয়। সেখানে কাজটি অনিরাপদ পরিবেশে করা হয় বলে অভিযোগ বহুদিনের।
বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সীতাকুণ্ডের শিপইয়ার্ডগুলোয় ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় অন্তত তিন শ্রমিক নিহত এবং ৩৮ জন আহত হন।








