সম্মান-বাস্তবতার নোম্যান্স ল্যান্ডে ট্রাম্প
মরুঝড়ে পথহারা মার্কিন ঈগল
- শুধু বোমা ফেলে কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া গেলেও পরবর্তী শাসনব্যবস্থা কে চালাবে, সে প্রশ্নের সহজ উত্তর ওয়াশিংটনের হাতে নেই

‘দি আমেরিকান সেঞ্চুরি’। জাতিসত্তার তীব্র চেতনাবোধে ডুবে ভূরাজনৈতিক এই পরিভাষাটি প্রথম এসেছিল বিখ্যাত মার্কিন ম্যাগাজিন লাইফের সম্পাদক হেনরি লাউসের কলমে। ১৯৪১ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যোগ দেওয়ার প্রাক্কালে তিনি মার্কিন জনগণকে বোঝাতে চেয়েছিলেন, ‘বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার ঐতিহাসিক দায়িত্ব এখন আমেরিকার।’ বিশ্ব শাসনের নীল আকাশে মার্কিন ‘দম্ভের ধোঁয়া’ও সেদিনই প্রথম! এরপর আর পেছনে ফিরতে হয়নি যুক্তরাষ্ট্রকে। পরাজয়ের মুখ দেখতে হয়নি বিশ্বরাজনীতির রণে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয়; তারপর সোভিয়েত ইউনিয়নের পাশে বুক ফুলিয়ে ‘দ্বি-নায়ক’। পরে সেই সোভিয়েত ভেঙেই (১৯৯১) অপ্রতিদ্বন্দ্বী ‘এক নায়ক’ মার্কিন সাম্রাজ্য। তখন থেকেই বিশ্ব মসনদের একক অধিপতি, একমাত্র ‘সুপার পাওয়ার’ বা একক নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্র। গত ৩৫ বছরে এক দিনের জন্যও ব্যত্যয় ঘটেনি এই শাসন-দর্পে। যখন যে দেশে ইচ্ছা হামলা চালিয়েছে নিজের খেয়ালখুশিমতো। হাজার মাইল দূর থেকে উড়ে এসে রাষ্ট্রনায়কদের চিলের মতো ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যাওয়া ধৃষ্টতা-ঔদ্ধত্যের দম্ভও স্বর্ণাক্ষরে ঠাঁই পেয়েছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী ইতিহাসের পাতায়। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো তার সর্বশেষ শিকার। বিশ্ব গণতন্ত্রের খোলা চোখের সামনেই চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি এই আগ্রাসন চালায়; ভয়ে টু শব্দটি পর্যন্ত করেনি কোনো দেশ।
মহাপরাক্রমশালী যুক্তরাষ্ট্রের সেই ‘টাক ঈগল’ (প্রেসিডেন্টের পতাকা ও সামরিক প্রতীক) এবার খেই হারিয়ে ফেলেছে পৃথিবীর প্রথম পরাশক্তি ইরানের দুর্বার মরুঝড়ে। পারস্যের বারুদঝড়ের প্রতিটি ঝাপটায় খসে পড়ছে শতাব্দীপ্রাচীন অহংকারের বাদামি পালকগুলো! ধুলোয় মিশে যাচ্ছে ‘তীক্ষ্ণ-দূরদর্শী দৃষ্টি’র গরিমা। মাথার ওপরের নীল আকাশকে এত দিন ‘পৈতৃক ভিটে’ বলে জানত যে ঈগল; গাইত আধিপত্যের জয়গান, আজ সেখানে শুধুই অন্তহীন দিকভ্রান্তির হাহাকার। যার একটিমাত্র ডানার ঝাপটানি কাঁপিয়ে দিত পুরো পৃথিবীর ভূরাজনীতি; সেই চেনা দিগন্তেই এক অচেনা-অদম্য বালুঝড়ের ঘূর্ণিপাকে পথ হারিয়ে ফেলেছে মার্কিন সাম্রাজ্যের আগ্রাসী রথ। টেনে তুলতে এগিয়ে আসছে না কোনো মিত্রই! ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ন্যাটো, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন— সবার মুখেই না।
এক ঠোকরে ‘ইরানের সরকার পতন’ অভিলাষে ছুটে এসে নিজের শক্তি নিয়েই এখন ধন্দে পড়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই!’ আমেরিকা ফার্স্ট নীতিতে উগ্র জাতীয়তাবাদের ঢেউ তুলে নিজের নেতৃত্বের যে ‘আধ্যাত্মিক কারিশমা’ ছড়িয়েছিলেন নিজ দেশে; ইরানের ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র-ঝড়ে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে এই ইরান যুদ্ধের পরাঘাতে! তার ইরান হামলার সিদ্ধান্তকে রীতিমতো ছিঃ ছিঃ করছেন তার নিজের দেশের নাগরিকরাই। পাত্তা পাচ্ছেন না নিজের প্রশাসনেও। যুদ্ধ বন্ধের আইন পাস করে ধিক্কার জানাচ্ছে কংগ্রেসও। মাত্র চার মাসেই (২৮ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে হামলা শুরু) লেজেগোবরে অবস্থা ট্রাম্পের। অস্ত্রসংকটে বড় হামলা চালাতে রাজি হচ্ছে না সেনাবাহিনী; দীর্ঘ যুদ্ধে জড়ানোর ভয়ে স্থল অভিযানেও নারাজ পেন্টাগন। ভেঙে পড়েছে অর্থনীতিও। পরিস্থিতি এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে যুদ্ধ বন্ধ করে পিছু হটা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের আর কোনো সহজ পথ খোলা নেই। কিন্তু ‘মহাশক্তিধর বিশ্বমোড়ল’র অহংকার ও দম্ভ অটুট রাখতে গিয়ে সে লজ্জায়ও বাঁধছে মার্কিন প্রশাসনের। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া ইরানকে ‘থোড়াই কেয়ার’ করে বুকভরা সাহসে ঝাঁপিয়ে পড়া এই যুদ্ধ এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে ট্রাম্পের! ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে শ্রেষ্ঠ সমর শক্তির দর্প! কুয়াশার দেয়াল ভেঙে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে পারস্যের সেই অমোঘ সত্য— অপরাজেয় সাম্রাজ্য! রণাঙ্গনের কঠিন বাস্তবতা! মুদ্রার উল্টো পিঠেই রয়েছে শতবর্ষের ‘সম্মান’! হারলেই সব শেষ! দুইয়ের মাঝখানে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছেন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী থেকে হঠাৎ প্রেসিডেন্ট বনে যাওয়া ‘অপরিণামদর্শী ট্রাম্প’। জাতিগত সম্মান আর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা— দুই সীমানার গোলকধাঁধায় নিরুপায় ট্রাম্পের ঠাঁই এখন ‘হতভম্ব চেতনা’র নোম্যান্স ল্যান্ডে!



