যে সাগর কখনো জমে না, সেখানেই বাড়ছে বরফ!

পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘না জমা’ জলভূমিই এখন বেশি বরফে ঢেকে যাওয়ার হুমকিতে রয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
উত্তর মেরুকে ঘিরে থাকা বিশাল বরফাচ্ছাদিত অঞ্চল আর্কটিক। সেখানেই এমন এক সমুদ্রাঞ্চল রয়েছে, যা বছরের পর বছর পুরোপুরি জমে না। অথচ পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ‘না জমা’ জলভূমিই এখন বেশি বরফে ঢেকে যাওয়ার হুমকিতে রয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের একটি প্রতিবেদনে কানাডার নুনাভুট থেকে সাংবাদিক জিমি থমসনের লেখা ও ছবিতে উঠে এসেছে আর্কটিকের এই অদ্ভুত পরিবর্তনের কাহিনি। প্রতিবেদনটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল কানাডার ন্যাশনাল অবজারভারে।
কানাডার উত্তর প্রান্তে নুনাভুটের গ্রিজ ফিয়র্ড। মাত্র ১৪৪ মানুষের এই ছোট্ট জনপদটিই কানাডার সবচেয়ে উত্তরের সরকারি জনবসতি। সেখান থেকেই বরফের উপর স্নো-মোবাইল ছুটিয়ে সমুদ্রের তথ্য সংগ্রহ করছেন ইনুইট গবেষক টেরি নোয়াহ। ইনুইটরা আর্কটিক অঞ্চলের স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠী।
সিলের শ্বাস নেওয়ার ফুটোর উপর দিয়ে সাবধানে স্লেজ টেনে নিয়ে নোয়াহ বরফের নীচে একটি বিশেষ যন্ত্র নামান। যন্ত্রে ধরা পড়া তথ্য তিনি তার ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষাগারে নিয়ে যান। আর সেখান থেকে সেই তথ্য পৌঁছে যায় আলবার্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অ্যান্ড্রু হ্যামিলটনের কাছে।
নোয়াহর গবেষণার লক্ষ্য জোন্স সাউন্ড ও তার সঙ্গে যুক্ত বিশাল জলভূমি। ব্যাফিন উপসাগরের উত্তর প্রান্তে প্রায় ৮৫ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই অঞ্চলটি অস্ট্রিয়ার থেকে আরও বড়। উনিশ শতকের তিমি শিকারিরা এই অঞ্চলটিকে বলত নর্থ ওয়াটার। আর গ্রিনল্যান্ডের ইনুইটদের কাছে এর নাম পিকিয়ালাসর্সুয়াক অর্থাৎ ‘মহান উত্থান’।
গ্রীষ্মে এখানে যে শৈবাল জন্মায়, তা থেকেই তৈরি হয় বিশাল খাদ্যশৃঙ্খল। গভীর শীতেও খোলা পানি থাকায় তিমিরা শ্বাস নিতে পারে। তিমি, সিল ও ওয়ালরাসের টানে আসে মেরুভালুক। লাখ লাখ সামুদ্রিক পাখিও হাজার হাজার বছর ধরে এই এলাকায় আসে।
২০১৪ সালের একটি গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, এক শীতে এখানে ২ হাজার ৫০০ এর বেশি ওয়ালরাসের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক দাড়িওয়ালা সিল ও নারহোয়াল ছিল।
কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন বদলে দিচ্ছে এই ভারসাম্য। পলিনিয়ার উত্তর প্রান্তে ন্যারেস প্রণালীর উপর ঋতুভেদে তৈরি হয় শক্তিশালী অর্ধচন্দ্রাকৃতি একটি বরফের খিলান। সেটি প্রণালীর মুখ আটকে রাখে। ফলে আর্কটিক মহাসাগর থেকে সামুদ্রিক বরফ দক্ষিণে ভেসে এসে পলিনিয়াকে ঢেকে ফেলতে পারে না।
অথচ প্রায় ২০ বছর আগে প্রথম বার সেই বরফের খিলান তৈরিই হয়নি। এখন প্রায়ই তা তৈরি হয় না। ফলে বসন্তে খোলা পানি থাকার বদলে উত্তর দিক থেকে বরফ ভেসে এসে পলিনিয়াকে ঢেকে দিচ্ছে। পৃথিবী উষ্ণ হওয়ার এমন এক অদ্ভুত পরিণতি এখানে কম বরফ নয় বরং বেশি বরফই হয়ে উঠতে পারে বিপদের কারণ।
কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিজ্ঞানী ডেভিড হার্নিংয়ের আশঙ্কা, একসময় বরফের সেতুটি পুরোপুরি হারিয়ে গেলে পলিনিয়ার উৎপাদনশীলতা ভয়াবহভাবে কমে গিয়ে পুরো বাস্তুতন্ত্র ভেঙ্গে পড়তে পারে।
এই পরিবর্তন বোঝার তাগিদে ২০২৫ সালের শরতে গ্রিনল্যান্ডের নুক শহরে বৈঠকে বসেছিলেন গবেষকেরা। পলিনিয়াকে চার দিক থেকে নজরদারির জন্য একটি ‘পর্যবেক্ষণকেন্দ্র’ তৈরির প্রাথমিক পরিকল্পনাও হয়েছে। তবে কানাডা ও গ্রিনল্যান্ডের ইনুইটদের একসঙ্গে কাজ করাতে বাধা রয়েছে। কারণ অনেকেরই পাসপোর্ট নেই।
২০১৭ সালের পিকিয়ালাসর্সুয়াক কমিশন কানাডা ও গ্রিনল্যান্ডকে যৌথভাবে ইনুইট পরিচালিত আন্তর্জাতিক সংরক্ষিত এলাকা তৈরির সুপারিশ করেছিল। কানাডা এ বছরের মার্চে নিজের অংশে সারভারজুয়াক সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করেছে। প্রায় এক হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত এই অঞ্চল আর্কটিক মহাসাগরের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে উত্তর ব্যাফিন দ্বীপ পর্যন্ত ছড়িয়ে রয়েছে।
তবে গ্রিনল্যান্ড এখনো একইভাবে এগোয়নি। ইনুইট সার্কামপোলার কাউন্সিলের সাবেক চেয়ার সারা ওলসভিগের সতর্কতা, প্রকৃতি রক্ষার নামে যেন ইনুইটদের সাংস্কৃতিক অধিকার ক্ষুণ্ণ না হয়। আর নোয়াহর কাছে গবেষণা আর জীবন আলাদা নয়।










