কৃত্রিম বরফের পিরামিডে বাঁচছে হিমালয়ের পাহাড়ি গ্রাম

সংগৃহীত ছবি
হিমালয়ের কোলে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় চার হাজার মিটার উঁচুতে অবস্থিত ভারতের লাদাখ অঞ্চলের ছোট্ট গ্রাম সাকতি। চারপাশে ধূসর পাহাড়, পাথুরে উপত্যকা আর শুষ্ক বাতাস। বৃষ্টিপাত বলতে প্রায় কিছুই নেই। বছরের বেশির ভাগ সময়ই এখানে প্রকৃতির কঠোরতার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয় মানুষকে। তবু প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ অঞ্চলের কৃষকরা গম, মটরশুঁটি আর আলুর চাষ করে সংসার চালিয়ে এসেছেন।
৬৫ বছর বয়সী কৃষক গেলাক গুটমেও তাদের একজন। জীবনের প্রায় পুরো সময়টিই তিনি মাঠে কাটিয়েছেন। কিন্তু গত কয়েক বছরে তিনি এমন এক পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়েছেন, যা তার পূর্বপুরুষরা কখনো দেখেননি।
‘লাদাখে চাষাবাদের জন্য সময় খুব কম। বছরে মাত্র একবার ফসল ফলানো যায়। এর মধ্যেও যদি পানি না পাওয়া যায়, তাহলে সব শেষ’— বলেছেন গেলাক গুটম।
একসময় পাহাড়ের ঢালে থাকা ছোট ছোট হিমবাহ ছিল এই অঞ্চলের জীবনরেখা। শীত জুড়ে বরফ জমে থাকত, আর বসন্ত এলে ধীরে ধীরে গলে সেই পানি নেমে আসত মাঠে। কৃষকরা ঠিক সময়ে চাষ শুরু করতে পারতেন। কিন্তু বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবে পরিস্থিতি বদলে গেছে। নিচু উচ্চতার বেশির ভাগ হিমবাহই গেছে হারিয়ে।
গুটমে স্মরণ করেন গত বছরের কথা। পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ায় তার পুরো ক্ষেত শুকিয়ে গিয়েছিল। মাসের পর মাসের পরিশ্রম এক মুহূর্তে হারিয়ে যায়।
লাদাখের স্থানীয় পানি ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য লবজাং ফারদোদ বলেছেন, ‘প্রজন্মের পর প্রজন্ম ছোট হিমবাহগুলো প্রাকৃতিক জলাধারের মতো কাজ করেছে। কিন্তু এখন সেগুলো আর নেই। পাহাড়ের চূড়ায় শুধু শুকনো পাথর পড়ে আছে।’
এই সংকট থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে এক দশকেরও বেশি সময় আগে কিছু গ্রামবাসী একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেয়। শীতকালে পাহাড়ের উঁচু অঞ্চল থেকে পাইপের মাধ্যমে পানি এনে খোলা আকাশে ছিটিয়ে দেওয়া হতো। তীব্র ঠান্ডায় সেই পানি জমে তৈরি হতো বিশাল বরফের স্তূপ বা ‘আইস স্টুপা’। দেখতে অনেকটা পিরামিডের মতো। বসন্তে এই বরফ গলে কৃষকদের জন্য পানির উৎস তৈরি করত।
প্রথম দিকে এই পদ্ধতি আশার আলো দেখালেও বাস্তবে তা পরিচালনা করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। শীতের রাতে তাপমাত্রা কখনো কখনো মাইনাস ২০ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যেত। তখন পাইপের ভেতরের পানি জমে গিয়ে পাইপ ফেটে যেত। পুরো ব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়ত।
এ সমস্যা মোকাবিলায় কয়েকজন কৃষককে পাহাড়ের উপরে রাত কাটাতে হতো। কোথাও বরফ জমে পাইপ বন্ধ হয়ে গেলে তারা ফুটন্ত পানি নিয়ে ছুটে যেতেন। তীব্র ঠান্ডা আর অন্ধকারে এই কাজ ছিল রীতিমতো কষ্টসাধ্য। তবে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বদলাতে শুরু করে পরিস্থিতি।
লাদাখ এখন স্থানীয় উদ্ভাবনের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এখানেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘একার্স অব আইস’-এর সহযোগিতায় তৈরি হয়েছে নতুন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা। অটোমেটেড আইস রিজার্ভয়ার বা সংক্ষেপে ‘এআইআর’।
পদ্ধতিটি আগের মতোই পাহাড়ের ওপর থেকে পানি নিয়ে আসে। তবে এবার পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে কম্পিউটার। পানি একটি উল্লম্ব নল দিয়ে ফোয়ারার মতো বেরিয়ে আসে। সৌরশক্তিচালিত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আবহাওয়া, বাতাসের তাপমাত্রা এবং পাইপের ভেতরের পানির তাপমাত্রা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে।
যদি তাপমাত্রা দ্রুত কমে যায় এবং পাইপ জমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়, তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে পাইপের ভেতরে থাকা পানি বের করে দেওয়া হয়। ফলে পাইপ ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন এই প্রযুক্তি পানির অপচয়ও কমায়। আগের মতো একটানা পানি ছিটানো হয় না। বরং নির্দিষ্ট সময় পরপর কুয়াশার মতো সূক্ষ্ম জলকণা ছিটিয়ে বরফের ওপর নতুন স্তর তৈরি করা হয়। ফলে প্রায় পুরো পানিই বরফে রূপান্তরিত হয়।
এই ব্যবস্থার সুফল এখন চোখে পড়ছে লাদাখের গ্রামগুলোয়। স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হচ্ছে। শুকিয়ে যাওয়া অনেক ঝরনাও আবার প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, কৃষকরা চাষের মৌসুমের শুরুতেই প্রয়োজনীয় পানি পাচ্ছেন।
২০২৫ সালের শীতে লাদাখ জুড়ে ১০টি এআইআর প্রকল্প চালু করা হয়। প্রযুক্তিবিদদের লক্ষ্য এখন আরও বেশিসংখ্যক কৃত্রিম বরফ জলাধার তৈরি করা।
সাকতি গ্রামের কৃষক গেলাক গুটমেও ভবিষ্যৎ নিয়ে আবার আশাবাদী হয়ে উঠেছেন। তার বিশ্বাস, একটি নয়, আরও কয়েকটি কৃত্রিম হিমবাহ তৈরি হলে গ্রামের কৃষি পুরোপুরি নিরাপদ হবে।
‘আমি একজন কৃষক। জমিই আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে, তা আমি জানি না। তবে আজ আমি জানি, আমার ফসলের জন্য পানি আছে।’—যোগ করেন তিনি।
কিছুদিন আগেও পানি সংকটের কারণে গ্রামের অনেক তরুণ শহরে চলে যাওয়ার কথা ভাবছিলেন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। হিমালয়ের এই কঠিন ভূখণ্ডে কৃত্রিম বরফের পিরামিড শুধু পানি নয়, ফিরিয়ে দিচ্ছে মানুষের আশা, আস্থা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নও।
ভাষান্তর: মনির হোসেন রনি










