যেখানে গভীর সমুদ্র নিজেই উঠে আসে মানুষের কাছে

সংগৃহীত ছবি
রাত তখন গভীর। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার আর সমুদ্রের কালো জল যেন একাকার হয়ে গেছে। নিচে কত গভীর পানি, তা বোঝার উপায় নেই। মনে হচ্ছে, পৃথিবীর নয়, যেন মহাশূন্যের কোনো এক অজানা প্রান্তে ভেসে আছেন কেউ। এমন এক রাতেই সমুদ্রের বুকে ঝাঁপ দেন চীনের চংকিংয়ের তরুণী আলোকচিত্রী জিয়ালিং কাই। তিনি জানতেন, এমন এক জগতে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন, যেখানে মানুষের উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে। সেখানে নেই সমুদ্রের তলদেশের দৃশ্য, নেই কোনো প্রবালপ্রাচীর, নেই দিকনির্দেশনার কোনো চিহ্ন—শুধু চারপাশ জুড়ে কালো শূন্যতা।
প্রথমবার এমন অন্ধকার সমুদ্রে নামার সময় ভয় পেয়েছিলেন জিয়ালিং। কারণ সামান্য অসতর্ক হলেই তলিয়ে যেতে পারেন এক অজানা গভীরতায়। কিন্তু অন্ধকারের ভেতরে নামার পর যা দেখলেন, তা তার কল্পনাকেও হার মানাল। যে কালো শূন্যতাকে তিনি ফাঁকা ভেবেছিলেন, সেটি আসলে জীবনে পরিপূর্ণ।
হঠাৎ সামনে ভেসে উঠল স্বচ্ছ জেলিফিশ, একটু পর দেখা গেল ক্ষুদ্র অক্টোপাস। চারপাশে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য অদ্ভুত প্রাণী। যাদের অনেককে সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, বিজ্ঞানীরাও খুব কম দেখার সুযোগ পান। সেই মুহূর্তে জিয়ালিং বুঝলেন, তিনি গভীর সমুদ্রে যাননি, বরং গভীর সমুদ্রই উঠে এসেছে তার কাছে।
অনেকের ধারণা, গভীর সমুদ্রের প্রাণী দেখতে হলে হাজার হাজার মিটার নিচে নামতে হয়। যার জন্য প্রয়োজন সাবমেরিন ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। কিন্তু প্রকৃতির এক বিস্ময়কর নিয়ম এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে। প্রতিদিন রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের গভীর থেকে শুরু হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণী অভিবাসন।
বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘ডায়েল ভার্টিক্যাল মাইগ্রেশন’। ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ক্ষুদ্র প্রাণী—জুপ্ল্যাঙ্কটন, জেলিফিশ, স্কুইড, চিংড়ি ও অগণিত সামুদ্রিক জীব খাবারের সন্ধানে পানির ওপরের স্তরে উঠে আসে এবং ভোর হওয়ার আগে আবার ফিরে যায় অন্ধকার গভীরে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সামুদ্রিক জীববিজ্ঞান পড়ার সময় শিক্ষকের মুখে এই অভিবাসনের কথা প্রথম শুনেছিলেন জিয়ালিং। সেদিনই তার জীবনের নতুন দরজা খুলে যায়। গভীর সমুদ্রের রহস্য দেখার জন্য অতলে নামতে হবে না জানতে পেরে তিনি ডাইভিং শেখেন এবং হাতে ক্যামেরা তুলে নেন।
এরপর ২০১৮ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে ফিলিপাইনের বাতাঙ্গাস উপসাগরে প্রথম ‘ব্ল্যাকওয়াটার ডাইভে’ অংশ নেন তিনি। ক্যামেরা হাতে পানির ভেতর ভেসে থাকার সময় হঠাৎ এক শিশু অক্টোপাসের ছবি তুলতে গিয়ে তিনি এতটাই মগ্ন হয়ে পড়েন যে, কখন নৌকা থেকে অনেক দূরে সরে গেছেন টেরই পাননি।
ছবি তোলা শেষে চারদিকে তাকিয়ে জিয়ালিং দেখেন নৌকার আলো, মানুষ কিংবা কোনো শব্দ নেই—চারপাশে শুধু কালো সমুদ্র। কয়েক মিনিটের সেই অভিজ্ঞতা তাকে গভীর সমুদ্রের সৌন্দর্যের পাশাপাশি এক ভয়ংকর নিঃসঙ্গতার স্বাদ দিয়েছিল।
সৌভাগ্যবশত পরে নৌকার কর্মীরা তাকে খুঁজে পান। তবে সেই ঘটনার পরও তিনি থামেননি, বরং আরও বেশি করে ডুব দিতে শুরু করেন অন্ধকার সমুদ্রে। বছরের পর বছর ধরে তার ক্যামেরায় ধরা পড়তে থাকে বিস্ময়কর সব দৃশ্য।
এক রাতে তিনি দেখতে পান তথাকথিত ‘অমর জেলিফিশ’, যা সমুদ্রের অন্ধকারে জ্বলতে থাকা একটি বাতির মতো দেখায়।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই জেলিফিশ বিপদের মুখে নিজের জীবনচক্র আবার শুরু করতে পারে। অর্থাৎ এর একধরনের জৈবিক পুনর্জন্মের ক্ষমতা রয়েছে। আবার একবার তিনি দেখেন একটি ছোট মাছ মুখে করে জেলিফিশ বহন করছে। পরে বুঝতে পারেন, মাছটি জেলিফিশের বিষাক্ত শুঁড়কে নিজের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহার করছে, যা দেখতে যেন যুদ্ধক্ষেত্রে রাসায়নিক ঢাল নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর মতো।
আরেকবার তিনি দেখেন, একটি জেলিফিশের শরীরের ওপর বসে আছে ছোট্ট এক মাছ, যা জেলিফিশটিকে আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করছে; অথচ একই জেলিফিশের পেটের ভেতরে তখন হজম হচ্ছে একটি শিশু অক্টোপাস। সমুদ্রের জগতে একই প্রাণী কারও আশ্রয়, কারও মৃত্যু—জীবনের এই নির্মম বাস্তবতাও সমানভাবে ধরা পড়ে তার ছবিতে।
তবে জিয়ালিংকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছিল একটি সাধারণ দৃশ্য, যেখানে এক টুকরো ভাসমান ক্যান্ডির মোড়কের নিচে আশ্রয় নিয়েছিল দুটি ক্ষুদ্র মাছ। প্রথম দেখায় দৃশ্যটি সুন্দর মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক কঠিন সত্য যে, মানুষের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক এখন সমুদ্রের জীবনের অংশ হয়ে গেছে। গভীর সমুদ্র থেকে উঠে আসা প্রাণীরাও এখন সেই বর্জ্যের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
জিয়ালিংয়ের ছবিগুলো শুধু শিল্প নয়, এগুলো বিজ্ঞানেরও মূল্যবান দলিল। গভীর সমুদ্রের অনেক প্রাণীকে জীবিত অবস্থায় তাদের স্বাভাবিক পরিবেশে দেখার সুযোগ খুবই বিরল। অতীতে এসব প্রাণীকে সাধারণত জালে ধরে গবেষণাগারে আনা হতো। যার ফলে তাদের রং, আকার এবং আচরণের অনেক কিছুই হারিয়ে যেত।
জিয়ালিংয়ের ক্যামেরা সেই হারিয়ে যাওয়া গল্পগুলো ফিরিয়ে এনেছে। তার ছবিতে দেখা যায়, উপকূলের পরিচিত কাঁকড়াও একসময় ছিল ভাসমান লার্ভা, যা সমুদ্রস্রোতে ভেসে শত শত কিলোমিটার পাড়ি দেওয়ার পর ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ কাঁকড়ায় রূপ নেয়। সমুদ্রতীরে বালুর ওপর দৌড়াতে দেখা কাঁকড়ার জীবনের শুরু যে অতল অন্ধকারের ভেতর হয়েছিল, তা জিয়ালিংয়ের কাজ ছাড়া জানা কঠিন হতো।
সমুদ্রের গভীরে এমন অসংখ্য গল্প ছড়িয়ে আছে, যার দরজা খুলে দেয় রাত। রাত নামলেই সামুদ্রিক প্রাণীরা অন্ধকারের আড়ালে খোঁজে খাবার, লড়াই করে বেঁচে থাকার জন্য, আর জন্ম দেয় নতুন প্রাণের। সেই সময় সমুদ্রের বুকে ভেসে থাকেন জিয়ালিং কাই। অতলে নামার জন্য নয়, বরং অপেক্ষা করার জন্য। কারণ তিনি জানেন, পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় জগৎটিকে দেখতে সব সময় গভীরে যেতে হয় না। কখনো কখনো শুধু অপেক্ষা করলেই গভীর সমুদ্র নিজেই উঠে আসে মানুষের কাছে।
ভাষান্তর : মনির হোসেন রনি










