আজই না আরও কিছুদিন
- বঙ্গভবনের এক কর্মকর্তা জানালেন, রাষ্ট্রপতি অাজ সিদ্ধান্ত নাও জানাতে পারেন। হয়তো আরও কিছুদিন পর তিনি পদত্যাগ করবেন
- নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে আলোচনায় বিএনপির মির্জা ফখরুল, খন্দকার মোশাররফ ও মঈন খান

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আজ শুক্রবার যেকোনো সময় পদত্যাগ করতে পারেন, এমন তথ্যই গতকাল বৃহস্পতিবার দিনভর ছিল আলোচনায়। কিন্তু সন্ধ্যার পর বঙ্গভবন সূত্রে মেলে ভিন্ন বার্তা। এক কর্মকর্তা জানালেন, রাষ্ট্রপতি অাজ সিদ্ধান্ত নাও জানাতে পারেন। হয়তো আরও কিছুদিন পর তিনি পদত্যাগ করবেন। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে সরকারের তরফ থেকে অবশ্য আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘এখানে সরকারের কোনো পদক্ষেপ নেই। রাষ্ট্রপতি যদি স্বাস্থ্যগত কিংবা অন্য কোনো কারণে দায়িত্ব ছাড়তে চান, তাহলে সাংবিধানিকভাবে সে সুযোগ রয়েছে।’
বঙ্গভবনের একজন কর্মকর্তা গতকাল দিনের বেলায় জানালেন, বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির বিদায়ের প্রস্তুতি চলছে। তিনি নিজের প্রয়োজনীয় কিছু সামগ্রী গুলশানের বাসায় পাঠিয়েছেন। বঙ্গভবনের কর্মকতা-কর্মচারীদের সঙ্গে আজ ও কাল তিনি বিদায়ী শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন। পদত্যাগের কিছুদিন পর তিনি দেশের বাইরে চিকিৎসার জন্য যাবেন। এ বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে যায় যখন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ব্যাংকক সফর সংক্ষিপ্ত করে অাজ দুপুরের মধ্যে দেশে ফিরছেন, এমন সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়। সংবিধান অনুযায়ী, স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন রাষ্ট্রপতি।
সংসদ সচিবালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, অাজ থাই এয়ারওয়েজে দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছবেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। ১৯ জুলাই চিকিৎসার জন্য ব্যাংকক সফরে যান তিনি। সফরসূচি অনুযায়ী, ২৬ জুলাইয়ের জন্য ফিরতি টিকিট কাটা ছিল। কিন্তু সফরসূচি সংক্ষিপ্ত করে আজ দেশে ফিরতে স্পিকারকে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে অনুরোধ করা হয়েছে।
সংসদ সচিবালয়ের এক কর্মকর্তা জানালেন, সফরসূচি অনুযায়ী ২৬ জুলাই স্পিকারের দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে তাকে দ্রুত দেশে ফিরতে অনুরোধ করা হয়েছে। সে কারণে তিনি শুক্রবারই দেশে ফিরবেন। কী কারণে দ্রুত দেশে ফিরছেন স্পিকার— এমন প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা বললেন, ‘রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে বিভিন্ন গুঞ্জন শুনছি। সে কারণে হয়তো স্যার সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরছেন। আশা করি সবকিছু শিগগিরই পরিষ্কার হয়ে যাবে।’
সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্র পাঠিয়ে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে পারেন। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। আর ৪৮(১) অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান রয়েছে। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের সময় স্পিকারকে দেশে বা সশরীরে উপস্থিত থাকতে হবে, সংবিধানে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকলেও রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্পিকারকে দায়িত্ব নিতে হয় বলে পদত্যাগ ও দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টি সমন্বয় করা হয়।
দিনের বেলায় এমন সব আলোচনার পর সন্ধ্যায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বঙ্গভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির কোনো কর্মসূচি নেই। তিনি আজ পদত্যাগ করবেন কি না, তাও নিশ্চিত নয়। একটি সূত্র জানায়, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে নানা ধরনের ‘নেতিবাচক আলোচনা’ শুরু হওয়ায় আরও কিছুদিন সময় নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে পারেন মো. সাহাবুদ্দিন।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন ৭৫ বছর বয়সী সাহাবুদ্দিন। সে অনুযায়ী তার পাঁচ বছরের মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিলে শেষ হওয়ার কথা। একসময় তিনি ছিলেন দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার, তখন দেশের মানুষ তাকে সাহাবুদ্দিন চুপ্পু নামে চিনত। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। এর বাইরে পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক। দেশের কার্যনির্বাহী ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে। দায়িত্ব নেওয়ার ১৬ মাসের মাথায় অভাবনীয় এক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন তিনি। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে, প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে শেখ হাসিনা চলে যান ভারতে। হাসিনা আমলের কোনো কিছু অবশিষ্ট না থাকলেও অনিবার্য পরিণতির মতো বঙ্গভবনে থেকে যান মো. সাহাবুদ্দিন। তাকেই সংসদ বিলুপ্ত করার আদেশ দিতে হয়েছে, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে শপথ পড়াতে হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোকে অধ্যাদেশে পরিণত করতে তাকেই সই দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা সারতে হয়েছে।
অভ্যুত্থানের পক্ষের কয়েকটি সংগঠন ২০২৪ সালের অক্টোবরে সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের দাবিতে তুমুল আন্দোলনও শুরু করেছিল। তখন বিএনপি সাংবিধানিক সংকট তৈরির আশঙ্কা তুলে রাষ্ট্রপতিকে সরানোর বিরোধিতা করেছিল। শেষ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার আর সে পথে যায়নি। তবে সব মিলিয়ে দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটছিল রাষ্ট্রপ্রধানের চেয়ারে থাকা সাহাবুদ্দিনের। নির্বাচনের আগে ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর সরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন, ‘আমি বিদায় নিতে আগ্রহী। আমি এখান থেকে চলে যেতে চাই।’ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তাকে কোণঠাসা করে রাখা, বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলো থেকে তার ছবি সরিয়ে ফেলা এবং বঙ্গভবনের প্রেস উইং সংকুচিত করায় ‘অপমানবোধ’ করার কথাও পরে বলেছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করলেও রাষ্ট্রপতি তখন পদত্যাগ করেননি। ১৭ ফেব্রুয়ারি তার কাছেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং নতুন সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা শপথ নেন। এরপর ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিএনপির সমর্থনের কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বললেন, ‘আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল।’ স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য গত মে মাসে লন্ডনে ঘুরে আসেন রাষ্ট্রপতি। পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক, স্টাফ নার্স ও বঙ্গভবনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও তার সঙ্গে ছিলেন। ৯ দিন পর দেশে ফেরেন রাষ্ট্রপতি। তখন বঙ্গভবনের প্রেস বিভাগ ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের বরাতে তার শারীরিক অবস্থা ‘স্থিতিশীল ও সন্তোষজনক’ বলে জানিয়েছিল।
যুক্তরাজ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায়ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সারসংক্ষেপ ও নথিতে ডিজিটালি অনুমোদন দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন। সুদানের প্রধানমন্ত্রী কামিল ইদ্রিসের সঙ্গে তার অনানুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাৎও হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ থেকে ২৬ জুন মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর। দেশে ফিরে ২৭ জুন তিনি জাতীয় সংসদে সফরের অর্জন নিয়ে কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফর থেকে ফেরার পর রাষ্ট্রপতিকে তার সফরের বিষয়ে অবহিত করার রেওয়াজ রয়েছে। তবে তারেক রহমান গতকাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বা অন্য কোনোভাবে সফরের ফল তাকে অবহিত করেছেন, এমন কোনো তথ্য বঙ্গভবন কিংবা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় প্রকাশ করেনি। এ কারণে অনেকেই বলছেন, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এরপর গত বুধবার হঠাৎ করেই রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের গুঞ্জন শুরু হয়।




