মোহন রায়হানের ‘জুলাই এখন’ কবিতায় কী আছে, আপত্তি কেন?

মোহন রায়হানের কবিতা পাঠকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয় উত্তেজনা। ছবি: সংগৃহীত
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর উপলক্ষে বাংলা একাডেমি আয়োজিত স্বরচিত কবিতাপাঠ অনুষ্ঠানে কবি মোহন রায়হানের কবিতা পাঠকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির। অনুষ্ঠানের মঞ্চে তার কবিতা পাঠে বাধা দেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার বিকেলে বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে দেশের প্রায় ৯০ জন কবি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে রচিত কবিতা পাঠ করেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম।
কী ঘটেছিল?
অনুষ্ঠানে জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি মোহন রায়হান ‘জুলাই এখন’ শীর্ষক কবিতা পাঠ শুরু করলে তাকে ‘জুলাইবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে বাধা দেন কয়েকজন। এ সময় ‘ইনকিলাব ইনকিলাব, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ’, ‘আবু সাঈদ মুগ্ধ, শেষ হয়নি যুদ্ধ’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হয়।
কবিতা পাঠের একপর্যায়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শ্রম সংগঠন শ্রমিক শক্তির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক আহমেদ ইসহাক মঞ্চে উঠে মোহন রায়হানের হাত থেকে মাইক্রোফোন কেড়ে নেন। আহমেদ ইসহাকও কবি হিসেবে এ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ছিলেন।
এ সময় তিনি বলেন, ‘আজকে থেকে এখানে এই মোহন রায়হান আওয়ামী লীগের দালালকে বাংলা একাডেমিতে আমরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করলাম।’ এরপর ‘ইনকিলাব ইনকিলাব, জিন্দাবাদ’, ‘আবু সাঈদ মুগ্ধ, শেষ হয়নি যুদ্ধ’ এবং ‘আওয়ামী লীগের দালালেরা, হুঁশিয়ার সাবধান’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন তিনি।
প্রতিবাদ জানিয়ে মোহন রায়হান মঞ্চেই বলেন, ‘কবিতার শেষ শুনতে হবে, এটা আওয়ামী লীগের কবিতা নয়। কবিতার শেষ শুনতে হবে।’ পরে বাধা উপেক্ষা করেই কবিতাপাঠ শেষ করেন তিনি।
মোহন রায়হান যা বললেন
ঘটনার বিষয়ে আগামীর সময়কে মোহন রায়হান বলেন, ‘আমি কবিতায় বলেছি যে, জুলাইয়ের যে আমাদের স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা, শহীদদের স্বপ্ন— সেটা এখন ঝুলে আছে। জুলাইয়ের মধ্য দিয়ে ধর্ম ব্যবসায়ী, ৭১-এর পরাজিত শক্তির পুনরুত্থান হয়েছে। কবিতায় ‘জুলাই কখনো বৃথা যেতে পারে না’—এটাও বলেছি। কিন্তু জামায়াতের লোকেরা উঠে বলছে, ‘আপনি কবিতা পড়তে পারবেন না।’ আমি বলছি, ‘আমি কবিতা পড়ব।’ তারা হইচই করছে, কিন্তু আমি দাঁড়িয়ে তাদের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিয়ে কবিতা পড়ে নেমেছি। তারা অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমার স্পষ্ট অভিযোগ— স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি এবং যারা জুলাই ব্যবসায়ী, তারাই বাধা দিচ্ছে। আমি ওদের ভয় পাই না, রাজাকার ও স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে কোনো আপস নাই।’
মোহন রায়হানের দাবি, যারা তার কবিতা পাঠে বাধা দিয়েছেন, তারা ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ এবং ‘জুলাই ব্যবসায়ী’। তার ভাষ্য, কবিতায় স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির পুনরুত্থানের অংশ পাঠ করার সময়ই তাকে বাধা দেওয়া হয়।
জুলাই যোদ্ধা হিসেবে প্রতিবাদ করেছি : আহমেদ ইসহাক
ঘটনার বিষয়ে আগামীর সময়কে আহমেদ ইসহাক বলেন, ‘আজকে বাংলা একাডেমিতে প্রোগ্রামটা ছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বিষয়ক স্বরচিত কবিতা পাঠ। আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে একজন ছিলেন মোহন রায়হান। তিনি যখন কবিতা পড়তে উঠলেন, তখন একদমই আওয়ামী বয়ানের একটি জুলাইবিরোধী কবিতা পাঠ শুরু করলেন।’
ইসহাকের দাবি, অনুষ্ঠানে মোহন রায়হানের কবিতা নিয়ে আপত্তি জানান দু-একজন ছাড়া প্রায় সবাই।
আহমেদ ইসহাক বলেন, ‘যেহেতু উপস্থিত সবাই জুলাইয়ের কর্মী, প্রতিবাদ জানান তারা। তিনি (মোহন রায়হান) যেটা বলার চেষ্টা করলেন যে, ইনকিলাব রাজাকারের স্লোগান, গণ-অভ্যুত্থানের ওপর ৭১-এর পরাজিত শক্তিরা ভর করে জুলাইকে ঘটিয়েছে— এই ধরনের কথাবার্তা। আমি যেহেতু লেখালেখি করি এবং জুলাই অভ্যুত্থানে আমার সক্রিয় ভূমিকা আছে, একজন জুলাই যোদ্ধা হিসেবে আমি মঞ্চে উঠে তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করি।’
নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে তিনি আরও বলেন, ‘আমি প্রথমত একজন কবি, একজন ছড়াকার। আর রাজনীতি তো হচ্ছে আমার একটা আদর্শিক জায়গা। আগামী দিন আমার যদি আদর্শিকভাবে এনসিপির সঙ্গে না মিলে, আমি দলটা ছেড়ে দেব। কিন্তু আমি তো কবিতা ছাড়তে পারব না, আমি তো বিপ্লব ছাড়তে পারব না। আমি তো প্রতিবাদ ছেড়ে দিতে পারি না। ওখানে তো এনসিপির নেতা হিসেবে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি, আমাকে কবি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আমি কবি হিসেবেই প্রতিবাদ করেছি।’
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, ‘যে কোনো বড় ধরনের গণ-অভ্যুত্থানকে ঘিরে নানা ধরনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের সুযোগ থাকে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানও এর ব্যতিক্রম নয়। গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে এ ধরনের আয়োজন নিঃসন্দেহে জুলাই আন্দোলন বিষয়ে নানামাত্রিক মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি করবে।’
মোহন রায়হান ‘জুলাই এখন’ শীর্ষক যে কবিতাটি বাংলা একাডেমির মঞ্চে পাঠ করেন, সেটি তিনি আগামীর সময়কে পাঠিয়েছেন। কবিতাটি পাঠকদের জন্য হুবহু প্রকাশ করা হলো।
জুলাই এখন
মোহন রায়হান
জুলাই এখন
ঝুলে আছে গণি রোডের ঝুলবারান্দায়—
লাল ফিতার ফাঁসিতে শ্বাসরুদ্ধ
শহীদের স্বপ্ন।
জুলাই এখন
হাসপাতালের আইসিইউতে,
জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে
এক রুগ্ণ শয্যার নিঃশব্দ আর্তনাদ।
জুলাই এখন
নিস্পন্দ মাটির নিচে,
অচেনা গণকবরের অন্ধকারে
নামহীন অগণিত কবরফুল।
জুলাই এখন
গুলিবিদ্ধ পাখির মতো
ডানা ঝাপটায়
অপরাজেয় বাংলা আর রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে।
জুলাই এখন
ধর্মব্যবসায়ী, ধর্ষক, খুনি আর লুণ্ঠনকারীদের
উল্লাস-উন্মত্ত নৃত্যমঞ্চ।
জুলাই এখন
স্বাধীনতার স্বঘোষিত সোল এজেন্টদের অট্টহাসি,
শিশুর আতঙ্কিত চিৎকার,
মায়ের অশ্রু,
বাবার দীর্ঘ হাহাকার।
জুলাই এখন
মুক্তচিন্তা আর মানবিক হৃদয়বৃত্তির বিরুদ্ধে
জারি হওয়া ফতোয়া;
কবিতা, কথা, সুর আর সংগীতের
গলায় ঝোলানো মৃত্যুঘণ্টা।
জুলাই এখন
অন্ধকারের বর্বরতার
অশনি-সংকেত।
জুলাই এখন
যুদ্ধবাজ হায়নাদের
রক্তাক্ত চারণভূমি।
জুলাই এখন
একাত্তরের পরাজিত শক্তির
নতুন মুখোশে ফিরে আসা
ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র।
জুলাই এখন
রাজাকার, আলবদর আর স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির
নির্লজ্জ পুনরুত্থানের প্রতিধ্বনি।
ভেবেছিলাম—
জুলাইয়ের যুদ্ধে বিজয়ী হলে
শৃঙ্খলমুক্ত স্বদেশে
মুক্ত আলো, মুক্ত বাতাসে
বুকভরে নেব নিঃশ্বাস।
কেউ আর চোখ রাঙাবে না,
কেউ আর ভয় দেখাবে না,
কেউ দাদাগিরির বিষদাঁত উঁচিয়ে
মানুষের স্বপ্ন গ্রাস করবে না।
আমিই হবো আমার নিজের রাজা,
তুমি থাকবে আমার হাত ধরে—
আমরা হাঁটব
স্বাধীন পৃথিবীর বিস্তীর্ণ প্রান্তরে,
মুক্ত মানুষের মতো।
কিন্তু আজ
স্বপ্নগুলো কেন এত দূরের নক্ষত্র?
কেন শহীদের রক্তের ওপর
আবারও অন্ধকারের ছায়া?
কেন স্বাধীনতার নামে
স্বাধীনতাই বন্দি?
তবে কি
জুলাইয়ের রক্তঋণ
এখনও শোধ হয়নি?
তবে কি
জুলাইয়ের আত্মত্যাগ
অপূর্ণই থেকে যাবে?
না—
ইতিহাসের শেষ বাক্য
এখনও লেখা হয়নি।
যতদিন মানুষের হৃদয়ে
স্বাধীনতার আগুন জ্বলবে
ভালবাসার ফুল ফুটবে
ততদিন জুলাই বেঁচে থাকবে—
প্রতিবাদে, প্রতিরোধে,
ন্যায়ের পতাকায়,
মুক্ত মানুষের অদম্য উচ্চারণে।
জুলাই কখনো বৃথা যেতে পারে না।




