বঞ্চনা থেকে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে শামসুর নাহার
একজন মায়ের জীবনে সন্তান সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। আর সেই সন্তান যদি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন হয়, তবে প্রতিটি দিনই হয়ে ওঠে সংগ্রামের। গাজীপুরের কালিয়াকৈরের শামসুর নাহার নিজের প্রতিবন্ধী কন্যা মাহমুদাকে একটি সাধারণ বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে গিয়ে অবহেলা, বঞ্চনা আর অপমানের শিকার হয়েছেন। সেই কষ্টই একসময় তাকে অনুপ্রাণিত করে এমন একটি বিদ্যালয় গড়ে তুলতে, যেখানে কোনো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু আর শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না।
২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কালিয়াকৈরের হরিণহাটি এলাকায় নিজের বাড়িতে চালু করেন ‘মাহমুদা আদর্শ প্রতিবন্ধী স্কুল’। মাত্র পাঁচজন প্রতিবন্ধী শিশুকে নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল বিদ্যালয়টির। নিজের মেয়ে মাহমুদার নামেই প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করেন তিনি।
শামসুর নাহার জানালেন, মেয়েকে ভর্তি করাতে তিনি একের পর এক বিদ্যালয়ে ঘুরেছেন। কোথাও তাকে ভর্তি নেওয়া হয়নি। পরে চন্দ্রার একটি বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও সেখানে অন্য অভিভাবকদের কটু কথা, অবজ্ঞা ও অপমান তাকে বারবার কাঁদিয়েছে। একদিন এক অভিভাবকের কটু কথা শুনে আর সহ্য করতে পারেননি। এরপর থেকে মেয়েকে আর ওই স্কুলে নিয়ে যাননি। সেদিনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন— প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য স্কুল করার।
শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে কালিয়াকৈরের বড়ইবাড়ী এলাকায় ভাড়ায় একটি ঘর নিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা শুরু করেন। ২০১৭ সাল পর্যন্ত সেখানে কার্যক্রম চালানোর পর ২০১৮ সালে কালিয়াকৈর পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কালামপুর এলাকায় জমি কিনে ঘর নির্মাণ করেন। সেখানে বিদ্যালয় স্থানান্তর করেন।
বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রায় ৮০টি প্রতিবন্ধী শিশু বিনা বেতনে পড়াশোনা করছে। এখানে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয়। শামসুর নাহার ছাড়াও আরও পাঁচজন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন, যাদের বেতনও তিনি নিজে বহন করেন।
শামসুর নাহার বললেন, বিদ্যালয়ের জমি কেনা, ভবন নির্মাণ এবং শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তুলতে তিনি নিজের সঞ্চয়, সম্পদ বিক্রির টাকাসহ ঋণ করে এ পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ টাকা ব্যয় করেছেন। বর্তমানে তার প্রায় ৩৭ লাখ টাকার ঋণ রয়েছে।
শামসুর নাহারের জন্ম গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার ঢোলভাঙ্গা এলাকায়। তিনি পরিবার নিয়ে কালিয়াকৈরের পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় নিজ বাড়িতে বসবাস করছেন।
বিদ্যালয় পরিচালনার পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহের জন্য শামসুর নাহার (৫৪) নকশিকাঁথা তৈরি করেন। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে ব্লক-বাটিক, নকশিকাঁথাসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তিনি। বর্তমানে তার অধীনে প্রায় ৭০ নারী নকশিকাঁথা তৈরি করেন। এ থেকে যে আয় হয় তার অর্ধেক সংসারে ব্যয় করেন, আর বাকি অর্ধেক ব্যয় করেন বিদ্যালয়ের জন্য।
কালিয়াকৈর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমানের ভাষ্য, ‘শামসুর নাহার আপা অনেক কষ্ট করে মাহমুদা আদর্শ প্রতিবন্ধী স্কুল গড়ে তুলেছেন। সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে আমরা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করে যাচ্ছি। বিদ্যালয়ের ৪০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী আমাদের ভাতা পাচ্ছে। বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত করার বিষয়েও আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করছি।’




