অ্যাপোলো বনাম আর্টেমিস
৫৮ বছরে পৃথিবীর বদলে যাওয়ার গল্প

বাঁয়ে ১৯৬৮ সালের, ডানে ২০২৬ সালের পৃথিবীর ছবি, দুটি ছবিই নাসার তোলা। ছবি: সংগৃহীত
সময়টা ১৯৬৮ সালের ডিসেম্বর। চাঁদের অজানা পেছনের অংশ প্রদক্ষিণ করছিল অ্যাপোলো-৮। জানালার বাইরে তাকিয়ে মহাকাশচারী ফ্রাঙ্ক বোরম্যান দেখছিলেন এক নির্জন, ধূসর জগৎ। গহ্বর আর আগ্নেয়গিরির চিহ্নে ভরা, জীবনের কোনো ছাপ নেই সেখানে।
হঠাৎই বদলে যায় দৃশ্য। চাঁদের দিগন্ত পেরিয়ে ধীরে ধীরে ভেসে ওঠে রঙিন পৃথিবী। নির্জীব সেই প্রান্তরের বিপরীতে জীবন্ত এক গ্রহ। সহযাত্রী উইলিয়াম অ্যান্ডার্স দ্রুত সেই মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি করেন। জন্ম নেয় ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী ছবি ‘পৃথিবী উদয়’।
বিশাল মহাশূন্যের অন্ধকারে ভেসে থাকা ক্ষুদ্র, রঙিন এই গ্রহের ছবি বিশ্বজুড়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। পৃথিবীকে নতুন করে দেখার চোখ তৈরি করে। পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নটি উঠে আসে নতুন গুরুত্ব নিয়ে। এর প্রভাবেই ১৯৭০ সালে শুরু হয় আর্থ-ডে। যা পরবর্তীতে বৈশ্বিক পরিবেশ আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে।
আবার চাঁদের পথে, নতুন এক দৃশ্য
প্রায় ৫৮ বছর পর, ২০২৬ সালে আবার চাঁদের পথে মানুষ। আর্টেমিস–২ মিশনের মহাকাশচারীরা এবার ধারণ করেন পৃথিবীর আরেকটি ব্যতিক্রমী ছবি। সেই ছবিতে দেখা যায়, চাঁদের ধূসর দিগন্তের পেছনে ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে পৃথিবী। নিস্তব্ধ, রঙহীন প্রান্তরের বিপরীতে যেন আলো-ছায়ায় ভরা এক জীবন্ত গোলক। ছবিটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘পৃথিবী অস্ত’।
৬ এপ্রিল ওরিয়ন মহাকাশযান থেকে, চাঁদের পাশ দিয়ে প্রায় সাত ঘণ্টার উড্ডয়নকালে ধারণ করা হয় এই দৃশ্য। পৃথিবীর আলোকিত অংশে সাদা মেঘের স্তর আর নীল সমুদ্র স্পষ্ট, আর অন্য প্রান্তে নেমে এসেছে গভীর রাতের অন্ধকার।
১৯৬৮ সালের মতো এবার আর মুহূর্তটি আকস্মিক ছিল না বরং পরিকল্পিত প্রস্তুতির মধ্য দিয়েই ধরা হয়েছে এই দৃশ্য।
প্রযুক্তির যুগেও মানুষের চোখ
আজ পৃথিবীকে নজরদারিতে রেখেছে অসংখ্য কৃত্রিম উপগ্রহ। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থেকেও সরাসরি পৃথিবীর দৃশ্য দেখা যায়। তবুও ‘পৃথিবী অস্ত’ ছবিটি আলাদা গুরুত্ব পায়। কারণ এটি মানুষের চোখে দেখা ও অনুভূতি থেকে ধারণ করা। এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই ছবিটিকে বিশেষ অর্থ দেয়।
যন্ত্রের ক্যামেরা পৃথিবীর তথ্য ধরে, কিন্তু মানুষের চোখ ধরে অনুভূতি। একজন মহাকাশচারী যখন এমন একটি মুহূর্তে ক্যামেরার বোতাম চাপেন, তখন সেখানে শুধু দৃশ্য নয়—থাকে বিস্ময়, উপলব্ধি আর এক ধরনের নীরব সংযোগ। সেই কারণেই এই ছবি শুধু একটি বৈজ্ঞানিক নথি নয়, বরং আমাদের নিজস্ব গ্রহকে নতুন করে দেখার এক আবেগঘন স্মারক হয়ে ওঠে।
বদলে যাওয়া পৃথিবী
ভূ-তাত্ত্বিক হিসেবে ৫৮ বছর খুবই স্বল্প সময়। কিন্তু এই অল্প সময়ের মধ্যেই পৃথিবীতে দৃশ্যমান পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মহাকাশ থেকে তাকালে সেই পরিবর্তনের ছাপ ধীরে ধীরে চোখে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেড়েছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জলবায়ুতে। গড় তাপমাত্রা অন্তত ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে, যা পৃথিবীর প্রাকৃতিক ভারসাম্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনছে। একই সঙ্গে বনভূমি কমে গিয়ে কৃষিজমি ও নগরায়ন দ্রুত বেড়েছে। মানুষের বসতি, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো বিস্তারের ফলে পৃথিবীর ভূ-দৃশ্যও বদলে গেছে।



