মেট্রো রেখে মনোরেলে মনোযোগ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
হওয়ার কথা ছয়টি। হয়েছে শুধু একটি। তাও পূর্ণ পথ পাড়ি দিতে পারছে না। সব ঠিক থাকলে আসছে বছর মতিঝিলের মেট্রো পৌঁছাবে কমলাপুর। মেট্রোরেলের অন্যান্য পথের নির্মাণকাজ অনেকটা স্থবির। টুকটাক কাজ হলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি কম। সরকারের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে মনোরেল।
নগর পরিবহনের বাইবেল বলা হয় কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনাকে (এসটিপি)। দফায় দফায় সংশোধন করে ২০১৫ সালে এই পরিকল্পনা (আরএসটিপি) চূড়ান্ত হয়, যা কার্যকর থাকার কথা ২০৩৫ সাল পর্যন্ত। সেটি আবারও সংশোধন করছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। মনোরেলকে অন্তর্ভুক্ত করতেই এ উদ্যোগ। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘আপডেটিং দ্য রিভাইসড স্ট্র্যাজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান ফর ঢাকা’। এতেই ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ সহজ করতে পাঁচটি রুটে মনোরেল নির্মাণের পরিকল্পনা প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন এ পরিবহন পরিকল্পনা দ্রুতই মন্ত্রিসভা বৈঠকে অনুমোদনের জন্য উঠবে বলে আগামীর সময়কে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
মনোরেলের জন্য শুরু হয়েছে প্রাথমিক কাজ। ঢাকার আশপাশের অঞ্চলগুলোকেও আনা হবে মনোরেলের আওতায়। প্রাধান্য পাচ্ছে সাভার ও ভুলতার মতো জায়গাও। প্রথমে দুটি রুট দিয়ে শুরু হবে নির্মাণকাজ। প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাই করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে (বুয়েট)। কোন কোন জায়গায় যাত্রী ওঠানামার জন্য স্টেশন নির্মাণ করা হবে— সেটি ঠিক হবে প্রাথমিক সমীক্ষা শেষে। এর আগে নির্মাণ ব্যয় সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যাবে না।
উল্টো দিকে চলমান থাকা দুটি পাতাল মেট্রোরেলের কাজ যেন থেমে আছে। এরই মধ্যে মেট্রোরেল লাইন-১-এর নির্মাণকারী ঠিকাদারদের একটি প্রতিষ্ঠান কাজিমা করপোরেশন কাজ করবে না জানিয়ে ফিরে গেছে জাপান। অন্যান্য নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও নির্ধারিত সময়ের চুক্তি হয়নি। আরেকটি মেট্রোরেল লাইন-৫ (উত্তর), যা হেমায়েতপুর-গাবতলী-মিরপুর-১০ হয়ে ভাটারা পৌঁছানোর কথা। এ লাইনের কাজেরও একই অবস্থা। অন্যটি মেট্রোরেল-৫ (দক্ষিণ), যা গাবতলী-রাসেল স্কয়ার-অাফতাবনগর হয়ে দাশেরকান্দি যাবে। মেট্রোরেল-৫ (দক্ষিণ) পথের নির্মাণকাজ মোটামুটি বাতিলের পথে। এসব নিয়ে বিনিয়োগকারী ও নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অসন্তোষ। এ স্থবিরতার শুরু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। তাদের কথায় নির্মাণ ব্যয় ছিল বেশি— তাই খরচ না কমিয়ে বাস্তবায়নের পথে যাওয়ার সুযোগ নেই। সেই যুক্তিতেই আটকে আছে নতুন সরকার।
পরিবহন ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় বড় প্রকল্পগুলো মাঝপথে গতি হারালে আদতে জনগণের অর্থের ক্ষতি। বড় পরিকল্পনার ক্ষেত্রে সব সরকারের নীতি এক থাকলে দিন শেষে প্রকৃত সুফল পায় জনগণ। মেট্রোকে থামিয়ে মনোরেলে গেলে মৌলিক সুফল মিলবে না বলে তারা মনে করছেন।
যদিও মেট্রোরেল ও মনোরেল সাংঘর্ষিক নয় বলে সাফ জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ। আগামীর সময়ের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলছিলেন, ‘সরকার মনোরেলের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে এটা ঠিক। কিন্তু মেট্রোর কাজও চলবে। এখানে মেট্রো-মনো সাংঘর্ষিক নয়, বরং একে অন্যের পরিপূরক। আমরা চাই মেট্রো থেকে নেমে একজন যাত্রী যেন মনোরেলে উঠতে পারে, সে ব্যবস্থা করতে। মেট্রোরেল ও মনোরেলের মিশ্রণে একটি শক্তিশালী গণপরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে।’
ঢাকার বিদ্যমান নগর পরিবহন ব্যবস্থায় মনোরেলকে উচ্চাভিলাষী হিসেবে দেখছেন স্থপতি ও নগরবিদ ইকবাল হাবিব। তিনি মনে করছেন, ‘আরএসটিপিতে গণপরিবহনকে গুরুত্ব দিয়ে যে নকশা করা আছে— সেটি বাস্তবায়ন না করা এবং বাস রুট রেশনালাইজেশনের মতো প্রকল্প চালু করতে না পারা বড় ব্যর্থতা। মনোরেলের বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে অতিবিনিয়োগে অল্প মানুষের সেবা দেওয়া একটি প্রহসন, সেটি প্রমাণ করার কিছু নেই। গণপরিবহনের দুরবস্থা নিয়ে এ শহর যেখানে ভারাক্রান্ত, সেখানে বাসকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে হঠাৎ নতুন বাহন যুক্ত করার ভাবনা শুধু উন্নয়ন দেখানোর প্রবণতা।’



