কেন আমার দেশ পত্রিকা ছিঁড়লেন রাশেদ খাঁন, অন্যরা কে কী বলছেন

ছবিটি ফেসবুকে রাশেদ খাঁনের পোস্ট করা ভিডিও থেকে নেওয়া
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁনকে নিয়ে একটি সংবাদ প্রকাশ করেছিল ‘দৈনিক আমার দেশ’। এর প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে তিনি ছিঁড়ে ফেলেন পত্রিকাটি।
গতকাল শনিবার রাতে প্রকাশিত ভিডিওতে রাশেদকে পত্রিকাটি ছিঁড়তে দেখা যায়। এরপর থেকেই নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সাংবাদিক— এ বিষয়ে মুখ খুলেছেন অনেকেই। অনেকের বাহবা কুড়াচ্ছেন তিনি। আবার সমালোচনার তীরও ধেয়ে আসছে তার দিকে।
ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে
বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির মরদেহ গত বুধবার উদ্ধারের পর তাকে নিয়ে ২০২৫ সালের আগস্টে আমার দেশে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। সে আলোচনায় যুক্ত হন রাশেদ খাঁন।
বৃহস্পতিবার বিকালে ফেসবুকে এ বিষয়ে স্ট্যাটাস দেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক এ সহকারী। লিখেছিলেন, ‘কেনো বা কীভাবে তাহসিফ সাউরির মৃত্যু কিংবা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, তা এখনো স্পষ্ট না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও এখনো পর্যন্ত কোনো তথ্য উদঘাটন করতে পারেনি। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার না, কেনো আমার দেশ পত্রিকায় তাহসিফকে ‘র’ এর এজেন্ট হিসেবে তুলে ধরে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল? শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার ছবি বা ভিডিও ‘র’ এর এজেন্ট কেন পাবলিশ করবে? কোনো গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট কখনো প্রকাশ্যে আসে কিংবা এমন সেন্সসেটিভ বিষয় নিজ আইডিতে পোস্ট করবে?’
এই স্ট্যাটাসে তিনি আমার দেশ পত্রিকাকে জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত বলেও মন্তব্য করেন।
কী ছিল আমার দেশের প্রতিবেদনে
একদিন পর শনিবার রাশেদ খাঁনকে নিয়ে প্রথম পাতায় প্রতিবেদন প্রকাশ করে আমার দেশ। সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘এক হয়েছেন হাসিনাপুত্র জয় ও কিছু নব্য বিএনপি’।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে চাকরিচ্যুতি এবং তার প্রায় এক বছর পর ২০২৫ সালের আগস্টে আমার দেশে প্রকাশিত একটি রিপোর্ট নিয়ে প্রোপাগান্ডায় নেমেছেন ফ্যাসিস্ট হাসিনাপুত্র মার্কিন নাগরিক সজীব ওয়াজেদ জয় এবং নব্য বিএনপির একটি অংশ। নব্য বিএনপির উপরোক্ত অংশের মধ্যে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বহুল আলোচিত-সমালোচিত বিশেষ সহকারী রাশেদ খান। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে তিনি নিজ দল গণঅধিকার পরিষদের সেক্রেটারির পদ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেন। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে তিনি তৃতীয় হন।’
সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘অন্যজন সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে জাপান সফর করে আসা আমজনতা পার্টির তারেক রহমান। এছাড়াও কিছু লোক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনুরূপ মিথ্যাচারে লিপ্ত রয়েছে।’
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, গত বছরের ৪ আগস্ট প্রকাশিত ‘‘বিমান বাহিনীর অভ্যন্তরের ‘র’ নেটওয়ার্ক ফাঁস’’ শিরোনামের এই আলোচিত সংবাদটি নিজস্ব সোর্সের মাধ্যমে সংগ্রহ করেছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক এবং আমার দেশ-এর তৎকালীন নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদ। প্রতিবেদনে তার নামও লেখা আছে। তিনি বর্তমানে বিএনপি সরকারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সজীব ওয়াজেদ জয়, রাশেদ খান ও আমজনতার তারেক– তাদের মিথ্যাচারের নিশানা করেছেন সরাসরি আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে।
‘ফলে বিএনপিতে অনুপ্রবেশকারী গুপ্ত ফ্যাসিস্টরা সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী শক্তির মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টির ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন কি না সেই প্রশ্নই করছেন অনেকে’, উল্লেখ করা হয় সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে।
যা বললেন রাশেদ খাঁন
রাশেদ খাঁন শনিবার রাতের প্রথম প্রহর দেড়টার কিছু সময় পর তাকে নিয়ে করা প্রতিবেদনের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেন। এর ক্যাপশনে তিনি লিখেছেন, “ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তার সাথে জামায়াত নেতা মিয়া গোলাম পরওয়ারের বৈঠকের তথ্য প্রকাশের পর থেকে মাহমুদুর রহমান ভাইয়ের ‘আমার দেশ’ পত্রিকাকে দিয়ে জামায়াত আমাকে আওয়ামী লীগ বানানোর পায়তারা করছে! অথচ তারা ভুলে গেছে, আমি শেখ হাসিনাকে কটুক্তির মামলায় জেল খেটেছি! পত্রিকার পেছনে বেশি বিনিয়োগ না করলে তো প্রথম পাতায় সজীব ওয়াজেদ জয়ের সাথে আমার ছবি প্রথম পাতায় ছাপানোর কথা নয়!’
এরপর এদিন বিকালে এক ভিডিওতে তিনি আমার দেশ পত্রিকা ছেঁড়ার একটি ভিডিও পোস্ট করেন। ক্যাপশনে তিনি লেখেন, ‘১৫ দিনের মধ্যে ২টা বিভ্রান্তিকর লিড নিউজ এর নেপথ্যে জামায়াতের ফান্ডিং?’
প্রায় ছয় মিনিটের ভিডিওতে রাশেদ তার বিরুদ্ধে আমার দেশের প্রকাশিত দুটি প্রতিবেদনের সমালোচনা করেন। বলেছেন, ‘লিড নিউজ করে চরিত্রহনন করা হচ্ছে। যেখানে দেখেন শেখ হাসিনাকে কটূক্তি করে আমি ২০১৮ সালে জেল খেটেছিলাম। সেখানে দেখেন, হাসিনাপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে আমার ছবি যুক্ত করে আমাকে আওয়ামী লীগ ট্যাগ দেওয়ার চেষ্টা করছে। আমি এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। আমি আশা করি মাহমুদুর রহমানের শুভ বুদ্ধির উদয় হবে।’
‘এই যে, একটি পত্রিকা যে ধরনের শব্দ, বাক্য ব্যবহার করেছে এটাকে আসলে পত্রিকা বলা যায় না’ বলেই তিনি ৩১ অক্টোবরের আমার দেশের কপি ছিঁড়ে ফেলেন। বললেন, তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে তার বিরুদ্ধে হওয়া নিউজ তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এর আগে ১৫ অক্টোবর ‘প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সহকারীরা কী করছেন’ শিরোনামে লিড নিউজ প্রকাশিত হয় আমার দেশে। ওই প্রতিবেদনেও রাশেদ খানের বিষয় উল্লেখ ছিল।
পত্রিকা ছেঁড়ার পর আলোচনা-সমালোচনা ছড়িয়ে পড়লে এ বিষয়ে রাশেদ খাঁন একাধিক পোস্ট করেন। এক পোস্টে লিখেছেন, ‘এক হয়েছেন হাসিনাপুত্র জয় ও কিছু নব্য বিএনপি! এই হেডলাইনের ব্যাখ্যা কি? আমি হাসিনারপুত্রের সাথে এক হয়েছি? আবার হাসিনাপুত্রের পাশাপাশি আমার ছবি দিয়ে আমাকে আওয়ামীলীগ ট্যাগিং দেওয়ার স্পর্ধা আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান কিভাবে পায়?’
পত্রিকা ছেঁড়ার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী লিখেছেন, ‘আমাকে নিয়ে করা নিউজটি আমি প্রত্যাখ্যান করে ছিঁড়ে ফেলেছি। অন্যথায় চুপ করে থাকলে আমার দেশের ন্যারেটিভ ধরে আমাকে নিয়মিত ট্যাগিং করার অপচেষ্টা চালিয়ে যেত।’
‘জামায়াতপন্থী সাংবাদিকরা বয়ান দাঁড় করাচ্ছে, একটা নিবন্ধিত পত্রিকা ছিঁড়ে ফেলা যায়? আরে ভাইয়া, আমি কেন পত্রিকা ছিঁড়বো? আমি তো আমার বিরুদ্ধে হাসিনাপুত্রের সাথে এক হওয়ার মিথ্যা ন্যারেটিভ প্রত্যাখান করেছি। তো, আমার গায়ে কি ফ্যাসিবাদের সাথে আঁতাত করার মিথ্যা দাগ বয়ে নিয়ে বেড়াব?’, যোগ করেন রাশেদ খাঁন।
অপর এক স্ট্যাটাসে রাশেদ খাঁন লিখেছেন, ‘আমার দেশ পত্রিকা গত ১৫ দিনে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা ন্যারেটিভ দাঁড় করাতে ২টা লিড নিউজ ছেপেছে। বিশেষ করে আমাকে হাসিনাপুত্রের সাথে এক হওয়ার মিথ্যা ন্যারেটিভ আমি ছিঁড়ে ফেলেছি। কিন্তু সাথে সাথে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের বিবৃতি দেওয়া প্রমাণ করে যে, জামায়াতের ফ্যান্ডিংয়ে আমার বিরুদ্ধে হাসিনাপুত্রের সাথে এক হওয়ার এমন মিথ্যাচার করেছে৷’
পরবর্তী সময়ে দেওয়া আরেকটি স্ট্যাটাসে পত্রিকা ছেঁড়ার ব্যাখা দিয়েছেন রাশেদ খাঁন। তিনি লিখেছেন, ‘আমি একটি মিথ্যা ন্যারেটিভকে ছিঁড়েছি।’
অপর স্ট্যাটাসে রাশেদ খাঁন ক্ষুব্ধ হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। লিখেছেন, ‘আমি ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের একজন কর্মী হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে সংক্ষুব্ধ হওয়ায় আমার দেশ পত্রিকার মিথ্যা বয়ান ছিঁড়ে ফেলেছি।’
রাশেদ খাঁনের অভিযোগ জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ারকে রক্ষার চেষ্টা করে যাচ্ছে আমার দেশ। বললেন, ‘মূলত ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তার সাথে বৈঠকের ঘটনায় মিয়া গোলাম পরওয়ারকে সেভ করতে ও জামায়াতের পক্ষে পাল্টা ন্যারেটিভ দাঁড় করাতে পরিকল্পিতভাবে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সাথে আমার এক হওয়ার অপতথ্য প্রচার করেছে আমার দেশ পত্রিকা। আর যেহেতু আমার দেশ পত্রিকা বর্তমানে জামায়াতের রাজনৈতিক মুখপাত্র হিসেবে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করেছে, ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের কর্মী হিসেবে সেটির জবাব না দিলে মিথ্যা বলতে বলতে একসময়ে মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠা করে ফেলতো!’
এর আগে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ার ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে গেপান বৈঠক করেছেন বলে অভিযোগ তুলেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন। জবাবে জামায়াত বলেছে, যিনি বা যারা এমন অসত্য তথ্য ছড়াচ্ছেন, তাদের মানসিক ও রাজনৈতিক সুস্থতা নিয়ে তাদের সন্দেহ রয়েছে। পাশাপাশি এ অভিযোগ প্রমাণের জন্য চ্যালেঞ্জও ছুড়ে দিয়েছে দলটি।
পত্রিকা ছিঁড়ে ফেলা নিয়ে কে কী বলছেন
আমার দেশ ছেঁড়ার ঘটনার নিন্দায় সরব হয়েছে বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপি। জামায়াতে ইসলামীর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে গতকাল শনিবার এ বিষয়ে একটি বিবৃতি প্রচার করা হয়।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ারকে উদ্ধৃত করে বিবৃতিতে বলা হয়, “আজ ৩১ অক্টোবর মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একজন রাজনৈতিক সহকারী লাইভ অনুষ্ঠানে এসে বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিক ‘আমার দেশ’ ছিঁড়ে ফেলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ করেছেন। একটি জাতীয় দৈনিক ছিঁড়ে ফেলা শুধু একটি পত্রিকার প্রতি অবমাননা নয়, বরং এটি বাকস্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগজনক বার্তা বহন করে।”
জামায়াত নেতা গোলাম পরওয়ার বললেন, ‘একটি বহুল প্রচারিত দৈনিক পত্রিকা ছিঁড়ে ফেলার অর্থ শুধু একটি পত্রিকাই ছিঁড়ে ফেলা নয়, বরং আমরা মনে করি, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ এবং মিডিয়াকে বন্ধ বা তালাবদ্ধ করে দেওয়ার পূর্ব আলামত। তার এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ সংবাদপত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংবাদকর্মী ও কলাকুশলীদের মাঝে এই আশঙ্কা তৈরি করবে যে, বাংলাদেশে আবার সরকারের হস্তক্ষেপে সংবাদপত্র বন্ধের সংস্কৃতি চালু হবে কিনা?’
‘জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে তার বিভ্রান্তিকর বক্তব্য এবং সংবাদপত্রের প্রতি তার এই অগণতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক এবং ফ্যাসিবাদী আচরণের আমরা তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। যেহেতু তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী হিসেবে নিয়োজিত- এজন্য তার এই কাজের পেছনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কোনো ইঙ্গিত আছে কিনা, জনগণ তা জানতে চায়’, বলেন তিনি।
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী রাশেদ খাঁনের সমালোচনা করে ফেসবুকে লিখেছেন, ‘সংবাদপত্রের কোনো প্রতিবেদন পছন্দ না হলে তার প্রতিবাদ করার অধিকার সবার আছে। প্রতিবেদন ভুল হলে তথ্য-প্রমাণ দিয়ে খণ্ডন করুন, প্রতিবাদলিপি পাঠান, প্রয়োজনে আইনের আশ্রয় নিন।’
‘কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁনের ফেসবুক লাইভে এসে দৈনিক আমার দেশ-এর কপি ছিঁড়ে ফেলার দৃশ্যটি মোটেও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণের উদাহরণ নয়’, অভিযোগ করেন এনসিপির এ নেতা।
‘একটি সংবাদপত্রের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকতে পারে, সম্পাদকের সঙ্গে বিরোধ থাকতে পারে, কোনো প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তিও থাকতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকে আমরা আরও সংযম, পরিশীলিত আচরণ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা প্রত্যাশা করি।
মনে রাখতে হবে, সংবাদমাধ্যম সরকারের প্রতিপক্ষ নয়; আবার সরকারও সংবাদমাধ্যমের ঊর্ধ্বে নয়। সংবাদমাধ্যমের সমালোচনা করার অধিকার যেমন আছে, তেমনি সরকারের সমালোচনা সহ্য করার সক্ষমতাও থাকতে হবে।’
পাটওয়ারী লিখেছেন, ‘রাষ্ট্রের শক্তি সংবাদপত্র ছিঁড়ে ফেলার মধ্যে নয়, বরং সংবাদপত্রে প্রকাশিত সমালোচনার জবাব তথ্য, যুক্তি ও সত্য দিয়ে দেওয়ার সক্ষমতার মধ্যে। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চেয়েছি, যেখানে ক্ষমতাবানদের সমালোচনা করা অপরাধ হবে না, সাংবাদিকদের স্বাধীনতা সংকুচিত হবে না এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা তাদের আচরণে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন।
আমি মনে করি, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারীর এই আচরণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি দায়িত্বশীল অবস্থান পরিষ্কার করা প্রয়োজন। গণতন্ত্রে ক্ষমতার দম্ভ নয়, জবাবদিহিই হোক রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি।’
এই ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে জুলাই ঐক্যও। শনিবার রাতে জুলাই ঐক্যের অন্যতম সংগঠক ইসরাফিল ফরাজী বিবৃতিতে বলেছেন, ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা সরকারের আমলে পত্রিকাটি দীর্ঘ সময় প্রকাশনা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিল। বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলা এবং ক্ষমতাসীনদের অন্যায়ের সমালোচনা করাই যেন পত্রিকাটির জন্য অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দুঃখজনকভাবে বর্তমান সময়েও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কারো কারো আচরণে সেই পুরোনো অসহিষ্ণু মানসিকতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে প্রকাশ্যে একটি জাতীয় পত্রিকা ছিঁড়ে ফেলার ঘটনা কোনোভাবেই দায়িত্বশীল আচরণ হতে পারে না। রাশেদ খাঁন চরম ভয়াবহ ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। এটি শুধু একটি পত্রিকার প্রতি অসম্মান নয়, এটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও ভিন্নমত প্রকাশের অধিকারের প্রতি অবজ্ঞা।
রাশেদ খাঁনের পত্রিকা ছেঁড়ার বিষয়ে কথা বলেছেন সাংবাদিক আনিস আলমগীর। বললেন, “প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন ‘আমার দেশ’ পত্রিকা ছিঁড়ে ফেলায় সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ হইচই পড়ে গেছে। একশ্রেণির সুশীল ও রাজনৈতিক প্রবক্তা ঘটনাটিকে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর চরম আঘাত হিসেবে দেখাচ্ছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যাদের মুখে আজ সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে এত কথা, মাত্র কয়েক মাস আগে যখন পলাতক কিছু ইউটিউবার ও নির্দিষ্ট মহলের আহ্বানে প্রকাশ্য রাজপথে উৎসব করে ‘প্রথম আলো’ পোড়ানো হলো, পত্রিকা কার্যালয়ের সামনে গরু জবাই করা হলো, এমনকি অফিসে আগুন দেওয়া হলো, তখন তাদের কণ্ঠ কোথায় ছিল?’
“৫ আগস্ট এর পর রাষ্ট্রের অনাচার নিয়ে কেউ কথা বললেই একশ্রেণির টোকাই প্রশ্ন করে, ‘১৬ বছর কোথায় ছিলেন?’ তাদেরই ভাষায় আজ প্রশ্ন করতে চাই- তখন কোথায় ছিলেন?”
পত্রিকা ছেঁড়ার ঘটনায় রাশেদ খাঁনের পক্ষ নিয়ে এ সংবাদিক লেখেন, ‘আমার দেশ’ পত্রিকার ভূমিকা বা সাংবাদিকতা নিয়ে অনেকের আপত্তি ও ক্ষোভ থাকতেই পারে। কিন্তু নিজের টাকায় পত্রিকা কিনে ছিঁড়ে ফেলার প্রতিবাদ আর পত্রিকা কার্যালয়ে হামলা, উৎসব করে পত্রিকা পোড়ানো কিংবা আগুন দেওয়ার ঘটনা এক নয়। রাশেদ তো কাউকে পত্রিকা পোড়াতে, অফিসে হামলা করতে কিংবা আগুন দিতে আহ্বান জানাননি।
‘একটি প্রতীকী প্রতিবাদে যারা গণতন্ত্রের বিপর্যয় দেখছেন, অথচ আরও ভয়াবহ ঘটনায় নীরব ছিলেন, তাদের এই বাছাই করা প্রতিবাদ রাজনৈতিক সুবিধাবাদ ছাড়া আর কী?’, প্রশ্ন করেন এ সাংবাদিক।
কবি ও সাংবাদিক ব্রাত্য রাইসু এ ঘটনাকে গণতান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া হিসেবেই দেখছেন। ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, ‘পত্রিকা ছিঁড়াটাই কি বরং গণতান্ত্রিক এক্সপ্রেশন নয়? তাইলে গণতান্ত্রিক আচরণের প্রতি নিন্দাই কি বরং ফ্যাসিবাদী নয়? পত্রিকা ছিঁড়াটা কী কারণে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার উপর নগ্ন হস্তক্ষেপ? এখানে নগ্নতা কোথায়?’
আমার দেশের সমালোচনা করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর ফেসবুকে লিখেছেন, ‘জুলাই পরবর্তী চালু হওয়ার পর থেকে যা লক্ষ্য করলাম সেটি হচ্ছে, উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত প্রোপাগাণ্ডা আর জামায়াতের পক্ষে বয়ান উৎপাদনই আমার দেশ পত্রিকার মূল উপজীব্য বিষয়।’
‘কিছুদিন পূর্বে আমার দেশ পত্রিকায় আমাকে নিয়ে উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত দুটো রিপোর্টসহ দুই জামাতির দুটি সম্পাদকীয় ছেপেছে, অনলাইনে বাজে ভাষায় হেডলাইন দিয়ে কনটেন্ট প্রচার করেছে। আজ দেখলাম ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের আমার লড়াকু সহযোদ্ধা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁনকে নিয়ে ছেপেছে। কারণ,একটাই আমরা জামায়াতের অপরাজনীতি নিয়ে সোচ্চার!’



