উত্তরের চিতাবাঘেরা ফিরতে চায়

২০১৮ সালে পঞ্চগড়ে ফিরোজ আল সাবাহের ক্যামেরায় বন্দি চিতাবাঘ
প্রথম খবরটা জানলাম একজনের ফেসবুকের পোস্টে। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় বাঘ দেখা গেছে! বুঝতে বাকি রইল না এটা চিতাবাঘ। তারপর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এর আক্রমণে কয়েকজন আহত হওয়ার খবরও চোখে পড়ল। আবার ফেসবুকের ছবিতে চিতাবাঘ লুকিয়ে থাকার সম্ভাব্য জায়গা ঘিরে শত শত মানুষকে লাঠিসোটা নিয়ে ঘিরে থাকতেও দেখলাম। কোনো কোনো সূত্র বলছে, এটি শেষমেশ সীমান্ত পেরিয়ে যেখান থেকে এসেছে, সেখানেই ফিরে বেঁচেছে। তবে ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা কিছু এলাকায় গত কয়েক দিন এখনো চিতাবাঘ দেখার দাবি উঠছে।
আমার মনে পড়ে, ছোটবেলায় নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকেও উত্তরের বিভিন্ন জেলায় পত্রিকায় মানুষের আক্রমণে চিতাবাঘ মারা পড়ার খবর পেতাম। বিশেষ করে একটি ঘটনা মনে বেশ দাগ কেটেছিল। মানুষের তাড়া খেয়ে খুব সম্ভব দিনাজপুরের কোনো গ্রামে গাছের ওপর উঠে আশ্রয় নেওয়া একটি চিতাবাঘের ছবি ছাপা হয়েছিল, যেটিকে পরে পিটিয়ে মারে লোকেরা। ছোট ভাই সাংবাদিক মোকাররম রানার বাড়িও উত্তরাঞ্চলের এক ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা গ্রামে। সে বলেছিল, তার বাবার কাছে শুনেছে, একসময় তাদের বাড়ির আশপাশে চিতাবাঘ হানা দেওয়া ছিল খুব সাধারণ ব্যাপার।
মনসিনিয়র মাইকেল ডি’কস্তা ছিলেন একজন খ্যাতনামা শিকারি। তার বইয়েও বছর ষাটেক আগে দিনাজপুরে চিতাবাঘ শিকারের ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন।
এবার তিন বছর পেছনে ফিরে তাকাই। ২০২৩ সালের ২০ ডিসেম্বর নীলফামারীতে একটি চিতাবাঘকে পিটিয়ে মেরে ফেলে গ্রামবাসী। এর আগের বছর একই জেলায় বিদ্যুতায়িত হয়ে মারা পড়ে আরেকটি চিতাবাঘ। যখনই এমন খবর পড়ি, মনে এক গভীর দাগ কাটে। এ সুযোগে একটি তথ্য জানিয়ে রাখি, ‘ডিটেকটিং দ্য স্পটস: আ রিভিও অন ল্যাপার্ড অকারেন্সেস ইন বাংলাদেশ’ নামে এক গবেষণাপত্র থেকে জানা যায়, ২০০৯ সাল থেকে শুধু উত্তরের রংপুর বিভাগের জেলাগুলোতে মানুষের পিটুনিতে মারা পড়েছে ছয়টি চিতাবাঘ। এর সঙ্গে ২০২২ ও ২০২৩ সালের মর্মান্তিক ঘটনা দুটি যোগ করলে চিতাবাঘের অস্বাভাবিক মৃত্যুর এই সংখ্যা গিয়ে ঠেকেছে ৮-এ।
উত্তরের বিভিন্ন এলাকায় একসময় চিতাবাঘের অবাধ বিচরণ ছিল
একসময় পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের মতো এলাকায় চিতাবাঘের অবাধ বিচরণ ও বিস্তর উপস্থিতি ছিল। কিন্তু কালের পরিক্রমায় আমরা মানুষই তো ওই বনজঙ্গল ধ্বংস করে দিয়েছি। তাই এ অঞ্চলে চিতাবাঘ আজ এক অপরিচিত অতিথি। এদিকে চিতাবাঘগুলো যখন পুরনো টানে এদিকটায় আসে, তখন বসবাসের মতো পর্যাপ্ত জায়গা বা খাওয়ার মতো পর্যাপ্ত বন্যপ্রাণী না থাকায় বাধ্য হয়ে তারা লোকালয়ে চলে আসে। আর বরণ করে নিতে হয় করুণ মৃত্যু। মানুষ যদি তাদের অকারণে বিরক্ত না করত, তবে অনেক সংঘাত সহজে এড়ানো যেত।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, নীলফামারী বা লালমনিরহাটের মতো জনবহুল জেলাগুলোতে চিতাবাঘ এলো কীভাবে? আমাদের এই উত্তরের জেলাগুলোর ঠিক পাশেই ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার ও ডুয়ার্স এলাকা। ওগুলো চিতাবাঘের স্থায়ী আড্ডাখানা। সেখানকার চিতাবাঘগুলো কোচবিহার ও ডুয়ার্সের সবুজ চা বাগানে ঘুরে বেড়ায় মনের আনন্দে। আর ওগুলোর মধ্যে যেসব বাঘ একটু দুর্ভাগা বা পথভ্রান্ত, তারাই কোনো না কোনোভাবে আমাদের পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, লালমনিরহাট বা কুড়িগ্রাম এলাকায় চলে আসে।
উত্তরের পঞ্চগড়েই জীবিত চিতাবাঘের দুর্লভ একটি ছবি তুলেছিলেন বন্যপ্রাণীপ্রেমী ও আলোকচিত্রী ফিরোজ আল সাবাহ। সেটি ছিল ২০১৮ সালের ঘটনা। একটি ঝোপে আশ্রয় নিয়েছিল একটি চিতাবাঘ। চারপাশ থেকে সেটিকে ঘিরে ফেলেছিল উৎসুক ও উন্মত্ত জনতা। মরিয়া চিতাবাঘটি তখন ভীষণভাবে হুংকার দিচ্ছিল, লেজ নাচাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, যেকোনো মুহূর্তে ঝোপ থেকে মানুষের ওপর লাফিয়ে পড়বে। এর মধ্যেই সাহসিকতার সঙ্গে কাছে গিয়ে কয়েকটা ছবি তোলেন সাবাহ। অবশ্য শেষ পর্যন্ত উত্তেজিত জনতার চরম রোষানল থেকে আশ্চর্য সুন্দর সেই বাঘটিকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
এখন ভাবার সময় এসেছে— আমাদের তাহলে ঠিক কী করা উচিত? কীভাবে আমরা এই বন্যপ্রাণীগুলো রক্ষা করব? ভারতের রাজস্থানের বেরা, মহারাষ্ট্রের মুম্বাই কিংবা পশ্চিমবঙ্গের ডুয়ার্স অঞ্চলে মানুষ ও চিতাবাঘ একে অপরের কাছাকাছি দূরত্বেই বসবাস করছে। তাহলে আমাদের দেশেই কেন চিতাবাঘ দেখলে পিটিয়ে মেরে ফেলতে হবে?
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মনিরুল খান বলেন, বিশেষ করে তরুণ বা সাব-এডাল্ড চিতাবাঘেরা আশপাশের এলাকায় ঘুরে বেড়ায় নিজের ঘাঁটি গাড়ার জন্য। এর ধারাবাহিকতায় সীমানা পেরিয়ে বাংলাদেশের উত্তরের জেলাগুলোতে পা দেয় তারা। এ সময় এদের বাঁচানোর মূল উপায় জনসচেতনতা। এখানে এই প্রাণীটির বড় সময় থাকার মতো জঙ্গল আর অবশিষ্ট নেই। তবে চা বাগান গড়ে ওঠায় হয়তো কিছু সময় সেখানে লুকিয়ে থাকতে পারে। উত্তরে এদের থাকার পুরনো পরিবেশ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা যেতে পারে। তবে এটি সময়সাপেক্ষ এবং চ্যালেঞ্জিং।
বিশিষ্ট প্রকৃতিবিদ রেজা খানের মতে, জনসচেতনতা তৈরি করা ছাড়া বন্যপ্রাণী রক্ষার আর কোনো বিকল্প পথ নেই। চিতাবাঘ খুব ছোট জায়গায় সহনশীলভাবে থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের সীমান্ত এলাকাগুলোতে গা ঢাকার মতো যথেষ্ট পরিবেশ ও লুকানোর জায়গা নেই। তবে বনবিড়ালসহ স্থানীয় যেসব ছোট প্রাণী প্রকৃতিতে আছে, সেগুলো রক্ষা করতে পারলে অন্তত স্থানীয় ইকোসিস্টেম বা প্রতিবেশ টিকে থাকবে।
শুধু চিতাবাঘ নয় নয়; নীলগাই ও ময়ূরের মতো প্রাণীও সীমান্ত পেরিয়ে উত্তরের জেলাগুলোতে আসছে। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো মানুষের সঙ্গে এদের এই অযাচিত সংঘাত এড়ানো। আর যখনই এরা বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বিচরণ করবে, তখন মানুষের সঙ্গে এদের একটি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা আমাদেরই দায়িত্ব।




