পাঠ্যবইয়ে নৌকা-দাঁড়িপাল্লা খুঁজতে বিশেষ কমিটি!
- শিশুদের বইয়ে রাজনৈতিক প্রতীক নিয়ে বিতর্ক, সরানো হলো ১৪ কর্মকর্তা
- পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বইয়ে ১২৮টি নৌকার ছবি, ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ে দাঁড়িপাল্লা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর বাকি মাত্র দুই মাস। এরই মধ্যে ছাপা হওয়া পাঠ্যবইয়ে রাজনৈতিক দলের প্রতীক হিসেবে পরিচিত দাঁড়িপাল্লা ও নৌকার ছবি ব্যবহার নিয়ে বিতর্কে পড়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। দাঁড়িপাল্লার ঘটনায় একজন এবং নৌকার ঘটনায় ১৩ জনসহ সংস্থাটির ১৪ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়েও দেওয়া হয়েছে। বইগুলোয় এ ধরনের আরও কোনো অসংগতি রয়েছে কি না, তা খুঁজে বের করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বিশেষ কমিটি গঠনের। দ্রুত সময়ের মধ্যে বইগুলো পর্যালোচনা করে সংশোধনের জন্য সুপারিশ করবে কমিটি।
এনসিটিবির কয়েকজন কর্মকর্তা জানালেন, সম্প্রতি ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বইয়ে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িপাল্লার ছবি ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আসে। আর সেখান থেকেই শুরু বিতর্কের। যার রেশ কাটতে না কাটতেই প্রাথমিক স্তরের বিভিন্ন বাংলা ও ইংরেজি বইয়ে নৌকার ছবির অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারের বিষয়টি আলোচনায় আসে। রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে পরিচিত এসব ছবির ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পাশাপাশি বই সম্পাদনা, ছবি নির্বাচন এবং তদারকির প্রক্রিয়া নিয়েও সমালোচনা শুরু হয়।
এসব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা আগামীর সময়কে বললেন, ‘সব বইয়ে দাঁড়িপাল্লা, নৌকার মতো বিষয় রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এজন্য আমরা কাজ করছি। কোনো বইয়ে অসংগতি পাওয়া গেলে তা সংশোধন করে স্কুলে পাঠানো হবে।’
বিতর্কের সূত্রপাত যেভাবে
আগামী শিক্ষাবর্ষে বিতর্কমুক্ত পাঠ্যবই দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু হলেও ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বইয়ের একটি ছবি নিয়ে প্রথম বিতর্ক তৈরি হয়। গত সপ্তাহে দেখা যায়, বইটির জ্ঞানের পিরামিডে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে মস্তিষ্কের পরিবর্তে দাঁড়িপাল্লার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, যা জামায়াতে ইসলামীর প্রতীক। বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ছাড়িয়ে পৌঁছায় সরকারের উচ্চপর্যায়ে। শুরু হয় তোলপাড়। দাঁড়িপাল্লার ছবি সম্পাদনার দায়িত্বে থাকা গবেষণা কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল যোবায়েরকে বদলি করা হয় খাগড়াছড়িতে।
এর রেশ কাটতে না কাটতেই প্রাথমিক স্তরের বিভিন্ন শ্রেণির বাংলা ও ইংরেজি বইয়ে মাত্রাতিরিক্ত নৌকার ছবি ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে মোট ১২৮ বার নৌকা বা নৌকার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণিতে ৫২টি, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ২৫টি, তৃতীয় শ্রেণিতে ২৫টি, চতুর্থ শ্রেণিতে ১৩টি এবং পঞ্চম শ্রেণিতে ৭টি নৌকার ছবি রয়েছে। এর বাইরে দ্বিতীয় শ্রেণির ইংরেজি বইয়ে বর্ণ শেখানোর অংশ হিসেবে ‘বি ফর বোট’ লেখা ও নৌকার ছবি দেওয়া হয়েছে।
সরকারের অতিরিক্ত আর্থিক খরচ নেই
ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ের ৩৯ লাখ কপির মধ্যে প্রায় ১৭ লাখ ছাপা হয়ে গেছে। ভুল ধরা পড়ার পর বাকি ১৮ লাখ কপি ছাপার কাজ স্থগিত করা হয়। এনসিটিবি জানিয়েছে, যে কপিগুলো ছাপা হয়েছে, সেগুলোর জন্য সরকারের কোনো বাড়তি আর্থিক ব্যয় হবে না। সংশ্লিষ্ট প্রেসগুলো নিজ নিজ খরচে ভুল সংশোধিত পৃষ্ঠা বা ফর্মা নতুন করে ছাপিয়ে বইগুলো ফের বাঁধাই করে মাঠপর্যায়ে সরবরাহ করবে। ছাপার বাকি বইয়ের মুদ্রণকাজ সংশোধন সাপেক্ষে শেষ করা হবে।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান বললেন, ‘সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠাটি সংশোধন করে নতুন করে ছাপিয়ে বই পুনরায় বাঁধাই করে মাঠপর্যায়ে পাঠাবে ছাপাখানাগুলো। তারা নিজ খরচে এ কাজ করে দেবে।’
প্রাথমিকে পাঁচ শ্রেণির বইয়ে ১২৮টি নৌকার ছবি
দাঁড়িপাল্লা নিয়ে বিতর্কের পর প্রাথমিক স্তরের বিভিন্ন পাঠ্যবইয়ে নৌকার ছবি ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আসে। এনসিটিবির হিসাব অনুযায়ী, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির বইয়ে মোট ১২৮টি নৌকার ছবি রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণির বইয়ে ৫২টি নৌকার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। ‘আমার বাংলা বই’-এ ৩৪টি, গণিত বইয়ে ১৪টি এবং ‘ইংলিশ ফর টুডে’ বইয়ে চারটি ছবি রয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণির বইয়ে নৌকার ছবি রয়েছে ২৫টি। এর মধ্যে ‘আমার বাংলা বই’-এ ২০টি এবং ‘ইংলিশ ফর টুডে’ বইয়ে পাঁচটি। তৃতীয় শ্রেণির বইয়েও ২৫টি ছবি রয়েছে। এর মধ্যে বাংলা বইয়ে ২০টি, গণিতে একটি এবং ইংরেজি বইয়ে চারটি।
চতুর্থ শ্রেণির বইয়ে ১৩টি নৌকার ছবি রয়েছে। এর মধ্যে বাংলা বইয়ে সাতটি এবং ইংরেজি বইয়ে ছয়টি। পঞ্চম শ্রেণির বইয়ে রয়েছে সাতটি ছবি। এ ছাড়া দ্বিতীয় শ্রেণির ইংরেজি বইয়ে ‘বি ফর বোট’ শেখানোর জন্য কয়েকটি পৃষ্ঠায় নৌকার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এনসিটিবির দাবি, ছবিগুলো নতুন করে যুক্ত করা হয়নি, ২০২৫ ও ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের বইয়েও এগুলো ছিল। ইংরেজি বর্ণ শেখানো ও পাঠ্যবস্তুর প্রয়োজনেই ছবিগুলো ব্যবহার করা হয়েছে বলে তাদের বক্তব্য।
নৌকাকাণ্ডে বদলি ১১ কর্মকর্তা
পাঠ্যবইয়ে প্রাথমিক স্তরের অপ্রয়োজনে নৌকার ছবি রাখার ঘটনায় মোট ১১ জন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছেন প্রাথমিক উইংয়ের সদস্য অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল হায়দার। তাকে ওএসডি করা হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে প্রাথমিকের ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ ড. সাফায়েত হোসেন, অধ্যাপক আব্দুল মুমিন মোছাব্বিরের নামও।
এর আগে আলাদা আদেশে সংস্থাটিতে সাত বছর ধরে থাকা ড. মো. কামরুল হক ভূঁইয়াকে বদলি করা হয়েছে। বদলি তালিকায় রয়েছেন সাবেক এমপি প্রাণ গোপাল দত্তের ডিও লেটারে পদায়ন পাওয়া হুমায়ুন কবির, সাবেক চেয়ারম্যান রবিউল কবীর চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আহসানুল আরেফিন চৌধুরী, ড. আবু হানিফ, সাবেক এমপি নিক্সন চৌধুরীর রেফারেন্সের আসা রেজাউল করীম, সাবেক অর্থমন্ত্রী মোস্তফা কামালের ডিও লেটারে আসা মনির হোসেন মজুমদার, শিক্ষা ক্যাডারের আওয়ামীপন্থী শিক্ষক শাহেদুল কবিরের প্যানেলে সমাজকল্যাণ সম্পাদক পদে নির্বাচন করা মাহমুদ বিন আমিন, দীপু মনির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আফসানা আইয়ুব দীপু। তাদের বিরুদ্ধেই অপ্রয়োজনীয় নৌকা ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। তবে উপসচিব সিরাজুল ইসলাম, মাধ্যমিক শাখার গবেষণা কর্মকর্তা আসাদুজ্জামানের বদলির সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি।
এনসিটিবির সূত্রগুলো বলছে, চলতি বছর শেষে নতুন কারিকুলাম নিয়ে কাজ শুরু হবে। এর মধ্যে যারা পরিকল্পিতভাবে ভুল তৈরি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পারে— এমন কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে বদলি করা হতে পারে।



