হত্যা করা হয়েছে তাহসিফকে, সন্দেহ বাবার

বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। ছবি: আগামীর সময়
অকালে চাকরি হারানো বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলে সন্দেহ করছেন তার বাবা; যদিও কারা খুন করতে পারে, সে বিষয়ে কোনো ধারণা দিতে পারেননি তিনি।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে তাহসিফের মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়েছে। তার প্রতিবেদন এখনো পাওয়া যায়নি। তবে পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে এই যুবকের দেহে আঘাতের কোনো চিহ্ন না পাওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।
২৮ বছর বয়সী তাহসিফ বিমানবাহিনীর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ছিলেন। ২০২৪ সালে ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময়ের একটি ভিডিও প্রকাশের পর আলোচনায় এসেছিল তাহসিফের নাম।
সেই ঘটনার পরপরই তাহসিফকে চাকরি ছাড়তে হয়েছিল। তাহসিফ পরে বলেছিলেন, তাকে বিমানবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিতে বলা হয়েছিল। আর তা ওই ভিডিও প্রকাশের ঘটনার জন্যই বলে তার ধারণা।
বিমানবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর তাহসিফ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এবং নেত্র নিউজের সঙ্গে কাজ করেছিলেন বলে জানান তার বাবা কে এম এনায়েতুল করিম।
তিনি বলেন, সবশেষ ভার্গ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসন ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন তাহসিফ।
কয়েক দিন আগে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর বিশ্রামে ছিলেন তাহসিফ। তিনি পরিবারের সঙ্গে ঢাকার উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন।
গত মঙ্গলবার সেখান থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হন তাহসিফ। একদিন পর গতকাল বুধবার বিকালে তুরাগ নদীতে তার মরদেহ পাওয়া যায়।
পুলিশ মরদেহ উদ্ধারের পর নিয়ে যায় সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে, সেখানে ময়নাতদন্তের পর দুপুর আড়াইটার দিকে ছেলের মরদেহ বুঝিয়ে দেওয়া হয়ে এনায়েতুল করিমকে।
তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের পর নানা ধরনের গুঞ্জন চলছে। তিনি আত্মহত্যা করেছেন কি না, নাকি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, তা নিয়ে চলছে আলোচনা।
তাহসিফের কলেজ ও বিমানবাহিনীর কোর্সমেট কে এস এম ইনতিসার ইনজিমাম ফেসবুকে লিখেছেন, এটাকে তিনি হত্যাকাণ্ড হিসেবেই দেখছেন। ৫ আগস্টের ভিডিও ফাঁসের পর তাহসিফ নানাভাবে মানহানির শিকার হচ্ছিলেন।
এনিয়ে সাংবাদিকদের এনায়েতুল করিম বলেন, ‘আত্মহত্যার প্রশ্নই আসে না। তাহসিফ অত্যন্ত প্রাণবন্ত ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিল।’
তার সন্দেহ, তাহসিফকে হয়ত হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।
প্রায় ১০ বছর আগে বিমানবাহিনীতে কমিশন পেতে অনেক পরিশ্রম করেছিলেন জানিয়ে তার বাবা বলেন, বিভিন্ন কোর্স সম্পন্ন করার পাশাপাশি উড্ডয়নেও ভালো ছিলেন তাহসিফ।
বাবা হলেও তাহসিফের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল এনায়েতুল করিমের। তাই ছেলের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখতেন বলে জানান তিনি। সেই কারণেই তার বিশ্বাস, তাহসিফ আত্মহত্যা করেননি।
হত্যার সন্দেহ করলেও কারা এর পেছনে রয়েছে, এমন প্রশ্নে নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি তাহসিফের বাবা।
দিনভর মায়ের সঙ্গে, সন্ধ্যায় বেরিয়ে যান বন্ধুর সঙ্গে
এনায়েতুল করিম জানান, নিখোঁজ হওয়ার আগে মঙ্গলবার সারাদিন তাহসিফ ছিলেন তার মায়ের সঙ্গে। কেনাকাটা করেন তারা।
তিনি বলেন, ‘সেদিন সারাদিনই মায়ের সঙ্গে ছিল তাহসিফ। মাকে নিয়ে কেনাকাটা করেছে। কেনাকাটা করেছিল আমার জন্যও।’
বাসায় ফেরার পর সন্ধ্যায় এক ব্যক্তির ডাকে ঘর থেকে বের হন তাহসিফ।
এনায়েতুল করিম বলেন, ‘সন্ধ্যার দিকে দ্বীপ নামে এক ব্যক্তি তাকে ডাকে। তখন মাকে বলে যায়, দ্বীপের সঙ্গে কথা বলে আসবে। এরপর আর বাসায় ফেরেনি।’
‘বন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে নিচে যাওয়ার কথা বলে বের হয়। স্বাভাবিকভাবে বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার পর এমন ঘটনা ঘটবে, তা পরিবারের কেউ ভাবতে পারেননি,’ বলেন তিনি।
তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবার যোগাযোগ করেছিল দ্বীপের সঙ্গে। তবে দ্বীপ তাদের জানান, ওই রাতেই তাহসিফকে তার বাসার কাছে নামিয়ে গিয়েছিলেন তিনি।
দেহে ছিল না আঘাতের চিহ্ন
তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করা হয় গতকাল বুধবার বিকালে রাজধানীর উত্তরখান থানা এলাকার রাজাবাড়ি নৌঘাট এলাকা থেকে।
স্থানীয়দের কাছে খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে বলে গাজীপুরের টঙ্গী নদীবন্দর এলাকার নৌপুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. ফিরোজ উদ্দিন জানান।
তখনো পরিচয় পাওয়া যায়নি। তাহসিফের পকেটে একটি আইফোন থেকে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
মরদেহ যখন উদ্ধার করা হয় তখন তাহসিফের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না বলে উল্লেখ করা হয়েছে পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে।
অপমৃত্যুর কোনো ঘটনায় বিষয়বস্তুর বাহ্যিক বিবরণ দিয়ে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেন টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির এসআই মোস্তাফিজুর রহমান।
তার প্রতিবেদনে বলা হয়, মৃত ব্যক্তির উচ্চতা আনুমানিক ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি। মাথার চুল কালো, মুখে ছোট ছোট কালো দাড়ি ও গোঁফ ছিল। চোখ ও মুখ বন্ধ ছিল।
তাহসিফের নাক দিয়ে রক্তপাতের আলামত পাওয়ার কথা লেখা হয়েছে সুরতহাল প্রতিবেদনে। বিবরণ অনুযায়ী, তার দুই হাত মাথার সামনে বাঁকানো ও মুষ্টিবদ্ধ অবস্থায় ছিল। পেট ছিল ফোলা। শরীরে পাওয়া যায়নি কোনো আঘাতের চিহ্ন।
তাহসিফের পরনে কালো রঙের ফুলহাতা কাবলি শার্ট ও সাদা রঙের ট্রাউজার ছিল বলে উল্লেখ করা হয় সুরতহাল প্রতিবেদনে।
ভিডিও নিয়ে যা বলে গিয়েছিলেন তাহসিফ
শেখ হাসিনার দেশ ছেড়ে বিমানে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি ছিলে বিশ্বজুড়ে আলোচিত। তবে ওই ঘটনার কেবল একটি ভিডিও পাওয়া যায়, যেখানে তাকে একটি হেলিকপ্টারে চড়তে দেখা যাচ্ছিল। ওই হেলিকপ্টারে করে কুর্মিটোলায় যাওয়ার পর সামরিক বাহিনীর একটি বিমানে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাকে।
তখন কেউ কেউ দাবি করেছিলেন, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফই সেই ভিডিওটি করেছিলেন। আবার তিনি করেননি, তবে তিনি প্রকাশ করেন, এমন দাবিও করেন কেউ কেউ। তাকে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার চর হিসেবেও দেখানো হয়েছিল একটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে।
তবে এ বছরের ২১ জুলাই এক পডকাস্টে অংশ নিয়ে তাহসিফ এসবকে অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, ‘আমি জানি না,
তাদের উদ্দেশ্য কী? প্রতিবেদনে ক্লিয়ারলি লিখেছে যে, আমি ভিডিওটা ছড়িয়েছি। আমি যে
শুট করেছি, এটাও কিন্তু তারা বলেনি। বলেছে, যে … ভিডিওটি করেছে এবং আমি ভিডিওটি নাকি ছড়িয়ে দিয়েছি।
‘আমি যদি ভিডিওটা করেও থাকি বা ছড়িয়েও থাকি, হোয়াট
ইজ দা প্রুফ দে হ্যাভিং—আমি এটা জিজ্ঞেস করতে চাই। আর এটাও হতে পারে যে, এজন্যই আমি
আজকে হয়তো এয়ারফোর্সে নেই।’
শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বিমানবাহিনী থেকে অব্যাহতি নিতে হয়েছে কি না- এমন প্রশ্নে তিনি বলেছিলেন, ‘হতে পারে। কারণ যেই ঘটনাগুলো ওই সময় ঘটেছিল, আমি সবকিছু বলবো না বা আমার কিছু অপারগতা আছে। আমার মনে হয় যে এই এলিগেশনের (অভিযোগের) কারণে তারা এই জিনিসটা করেছে।’
তাহসিফ দাবি করেছিলেন, পরবর্তীকালে হেনস্তা করা হবে না এই শর্তে অব্যাহতিপত্র দিয়েছিলেন তিনি। তবে চাকরি ছাড়ার পর সামাজিক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে তাকে।
বুধবার তার লাশ উদ্ধারের পর তাহসিফের পরিবারের সদস্যরাও দাবি করেছেন, চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পর থেকে নানামুখী চাপের মধ্যে ছিলেন এই যুবক। তাকে অনুসরণ করা হতো।
তদন্ত দাবি, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে জামায়াতে ইসলামী। এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
তাহসিফের মৃত্যু নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ রাজশাহীতে সাংবাদিকদের বলেন, তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সব দিক জানার পর এ বিষয়ে কথা বলা হবে।
তাহসিফের মৃত্যু নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমি এই বিষয়ে এখনো কোনো কথা বলতে চাচ্ছি না। কারণ, একটা প্রাথমিক তদন্ত হতে হবে। আর লাশের ময়নাতদন্ত হচ্ছে। তারপর আমরা সব বিষয় জেনে কথা বলব।’










