আমাদের এক কৃষ্ণকুমারী ছিল
- বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সমাজের একজন কিংবদন্তি শিল্পীর নাম কৃষ্ণকুমারী সিনহা

রাসলীলায় সূত্রধারী হিসেবে সঙ্গীত পরিবেশনকালে কৃষ্ণকুমারী সিনহা
আমার মনে পড়ে, ছোটবেলায় যখন বাড়িতে ঘুমিয়ে থাকতাম, হঠাৎ কোন কোন এক গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে কানে ভেসে আসতো দূর কোন এক মণ্ডপের থেকে রাসলীলার গান ভেসে আসছে, কোন এক শিল্পী যেন মিহি সুরে রাধা-কৃষ্ণের বিরহের গান গাইছে, সেই সুরে মন যেন বিষাদে ভরে ওঠতো। মাকে জিজ্ঞেস করতাম কে অমন করে দরদ দিয়ে গাইছে? মা উত্তর দিতেন, ‘কৃষ্ণকুমারী’, তখন থেকেই যেন নামটা মনের মধ্যে গেঁথে গিয়েছিলো, কৃষ্ণকুমারী! নামের মধ্যেই যেন এক গভীর ভাব লুকিয়ে আছে, যেন পরমাত্মা কৃষ্ণের সাথে এই নারীর অপূর্ব এক বন্ধন এই নামের মাধ্যমেই, নামের কারণেই তাঁর প্রতি অন্যরকম এক টান অনুভব করতাম, বড় হয়ে যখন পরিচয় হলো, তার সান্নিধ্য পেলাম তখনই যেন আমার শিল্পীজীবনের এক অন্যরকম পূর্ণতা এলো।
মণিপুরি থিয়েটারের সাথে তার সখ্য ছিলো একেবারে গভীর। থিয়েটারের যে কোন একটি মহড়া কিংবা অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেই তিনি হাজির হতেন, তরুণদের সাথে তিনি খুব মিশে যেতে পারতেন, বয়সের কোন বাঁধা থাকতো না। মণিপুরি থিয়েটারের অন্যতম উপদেষ্টা হিসেবে দীর্ঘদিন তিনি পাশে থেকে সহযোগিতা করেছেন। একবার ২০১২ সালের দিকে, চ্যানেল নাইন থেকে মণিপুরি থিয়েটারের কাছে ‘রাসলীলা’ নিয়ে একটি অনুষ্ঠান করার সুযোগ এলো, সময় বরাদ্দ মাত্র ত্রিশ মিনিট। এত অল্প সময়ের মধ্যে রাসের চুম্বক অংশ কীভাবে পরিচালনা করা যায় তার দায়িত্ব পড়লো রাসধারী এই কৃষ্ণকুমারী সিনহার ওপর। নিখুঁতভাবে তিনি রস বজায় রেখে রাসের চুম্বক অংশ তুলে ধরলেন দর্শকের কাছে। তিনি গানের শব্দগুলোকে অনুভবের মাধ্যমে গাইতেন। অনেকসময় রাসের গানের লিরিক ব্রজবুলি ভাষা এবং মৌখিক হওয়ার কারণে অনেক শব্দের বিকৃতি ঘটতো, তিনি সেগুলোকে সঠিকভাবে সঠিক শব্দে গাইতে চেষ্টা করতেন, কোন গানের লিরিক কি হবে তা অনেক সময় যুক্তি দিয়ে বোঝাতেন। আমরা তা শুনে শুনে ঋদ্ধ হতাম। আমাদের মণিপুরি থিয়েটারের বিষু উৎসবে প্রতিবছরই কোন না কোন পালা পরিবেশন করা হতো যার নির্দেশনা দিতেন কৃষ্ণকুমারী সিনহা। আমাদেরকে দিয়ে করিয়েছিলেন উদুখল রাস, দিবারাস, নিত্যরাস। কণ্ঠে ছিল তার অপরূপ মাধুর্য, আমরা বিমোহিত হয়ে শুনতাম তার সুরেলা কণ্ঠের গান। হাতে ধরে ধরে আমাদের নাচ শিখিয়ে দিতেন।
বাংলাদেশের উত্তরপূর্ব কোণে অবস্থিত মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায় যেখানে মণিপুরিদের বসবাস, সেখানে মাধবপুর পরগণায় কৃষ্ণকুমারী সিনহার জন্ম হয়েছিল পহেলা জানুয়ারি উনিশশো পঁয়তাল্লিশ সালে, আর সাতাশ অক্টোবর দুইহাজার ছাব্বিশ সালে বিরাশি বছর বয়সে তার জীবনাবসান হলো।
আমার নৃত্যগুরু কৃষ্ণকুমারী ছিলেন জ্ঞানে ও প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ একজন মানুষ। মণিপুরী রাসলীলাকে দর্শক কিংবা ভক্তবৃন্দের কাছে এক অনন্য মাত্রায় নিয়ে গেছেন। আমাকে ও ছোটবোন স্বর্নালীকে চরম স্নেহ করতেন, স্নেহের সাথে সাথে ছিল অন্যরকম সখ্য, আদর করে ডাকতেন পাগলি। প্রায় আমাদের সাথে আড্ডা দিতেন, আড্ডাস্থল ছিল মণিপুরি থিয়েটারের কর্ণধার শুভাশিস সিনহার বাড়ি, সেখানে তার পরম প্রিয় শিষ্যা ছিলেন সঙ্গীতশিল্পী শর্মিলা সিনহা। দিদি নিয়মিত সঙ্গীতের তালিম নিতেন তাঁর কাছে। সেই বাড়িতে যখন আসতেন তার গল্পের ঝাঁপি যেন খুলে বসতেন আর আমরাও গোগ্রাসে, হাসিতে, আনন্দে গিলতাম সেই গল্প।
একদিন রিসার্চের কাজে তার কেসস্টাডি নেয়ার জন্য জীবনের কাহিনি শুনতে চেয়েছিলাম, তিনিও তার জীবনের কাহিনির স্মৃতি পাতাগুলো মেলে দিয়েছিলেন; আজ তার অনুপস্থিতিতে সেসব কথা মনে ভেসে আসছে, খুব ছোটবলায় পড়াশুনার প্রতি গভীর অনুরাগী হওয়ায় এক দূরসম্পর্কের বড়ভাইয়ের বাড়িতে থেকে স্কুলে যাওয়া শুরু করেছিলেন কৃষ্ণকুমারী সিনহা, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করেছেন। সেই বাড়ির পাশেই বাস করতেন একজন নামকরা পালাকার গুরু সেনা সিংহ, নিজের ও মায়ের আগ্রহে মাত্র বারো বছর বয়সে গুরু সেনা সিংহের কাছে গানে হাতেখড়ি শুরু হয়।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘ভোর পাঁচটার দিকে ঘুম থেকে উঠে বইখাতা নিয়ে পড়তে বসতাম। বড়ভাই যতক্ষণ পর্যন্ত না বেরিয়ে যেতেন ততক্ষণ আমি বই নিয়ে বসে থাকতাম। তিনি বেরিয়ে গেলেই আমি ছুটতাম গুরুর বাড়ি। নতুন কী শেখা যায় তারই চেষ্টা থাকত বরাবর। বড় ভাইয়ের কড়া শাসন, গানের শিল্পী হওয়ার ইচ্ছা আর পড়াশুনো এই তিন ধারা নিয়ে চলছিল আমার জীবন। যখন আমি বিভিন্ন এলাকায় গান গেয়ে প্রশংসা কুড়োলাম আবার পড়াশোনাও ভালোভাবে চালিয়ে যেতে লাগলাম তখন ভাই আমাকে গান শিখতে আর বাধা দেননি।’ প্রথমে তিনি পালাগানের তালিম নেন, মণিপুরী নারীরা সেই সময় নুপীপালা কিংবা খুবাকুশি খুব সুন্দর গাইতেন, তিনি এই নুপীপালা শেখার মাধ্যমে তার শিল্পীজীবনের সূচনা ঘটান।
আঠারো বছরের দিকে তার বিয়ে হয় কিন্তু সেই বিয়ে টেকেনি, কয়েক বছর সংসার করার পর বনিবনা না হওয়ায় তিনি বিচ্ছেদ ঘটিয়ে বাবার বাড়ি ফিরে আসেন, হাতে তখন তার অখণ্ড অবসর, ভাবলেন, বসে না থেকে কিছু একটা করবেন, আবারও গানের তালিম নিতে শুরু করলেন। সময়টা ষাটের দশক, সেই সময়কার মাধবপুর পরগনার নামকরা পণ্ডিত কামিনী সিংহের কাছে গুরুদীক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন তিনি নটপালা ও রাসলীলার তত্ত্ব ও এর ভাব নিয়ে জ্ঞান আহরণ করেন। নুপীপালা শিল্পী হিসেবে গান গাওয়া শুরু করেন। দীর্ঘদিন একলা থাকার পর বাবা-মার ইচ্ছায় পাশের গ্রাম ঝাঁপের গাঁওয়ের বসন্ত সিংহের সাথে দ্বিতীয়বার সংসার জীবনে প্রবেশ করেন। দুটি মেয়ে আর দুটি ছেলে নিয়ে স্বামীর সাথে জীবন কাটাতে শুরু করেন, সাথে ছিল জীবিকা আর শিল্পের তাড়না। সেইসময় ১৯৭৭ সালে মাধবপুরে মণিপুরিদের সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ও বিকাশে মণিপুরী ললিতকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়। তৎকালীন সময়ের মহামান্য রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার সাহেবের মহিলা বিষয়ক উপদেষ্টা মিসেস ফিরোজা বারীর প্রতিষ্ঠানের উদ্বোধন করার সময় তিনি একজন নারীশিল্পী হিসেবে বক্তব্য রাখেন। এরপর তিনি মণিপুরী ললিতকলা একাডেমীতে চার বছর মেয়াদি মণিপুরি সঙ্গীত প্রশিক্ষণ কোর্সে ভর্তি হয়ে যান, সেই সময় ঐতিহ্যবাহী রাসলীলাসহ মণিপুরি সঙ্গীতের তালিম দিতে আসতেন এলাকার নামকরা গুরুরা। তাদের অনেকের কাছে তিনি বিভিন্ন পালার গান সংগ্রহ করেছিলেন ও শিখেছিলেন বিভিন্ন মণিপুরি পরিবেশনা, যেমন : রাসলীলা, বাসকশয্যাপালা, উদুখলরাস, নৌকাবিলাস, মাথুর পালা, রাখালরাস ইত্যাদি। বাংলাদেশ ও ভারতের আসাম-ত্রিপুরা মিলিয়ে প্রায় ৩০০ এর অধিক মণিপুরি রাসলীলায় সুত্রধারী (প্রধান গায়িকা) হিসেবে গান গেয়েছেন, পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। চল্লিশ বছর বয়সের দিকে তিনি মণিপুরি রাসধারী বা নৃত্যগুরু হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন। প্রায় ৬০টির মতো মণিপুরি রাসলীলা পরিচালনা করেছেন। ভারতের শিলচরে, কমলপুর, হালহালীতে তিনি রাসলীলা পরিচালনা করেছেন।’
সিলেট বেতারে মণিপুরি বিষয়ক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন, গুরু-শিষ্য পরম্পরায় তার অধীনে অনেক ছাত্রী আছেন যারা এখনকার সময়ে রাসলীলায় সূত্রধারী হিসেবে নিয়মিত গান গেয়ে যাচ্ছেন।’ তার কাছে গান সম্পর্কে তথ্য জানতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছে এমন মানুষ খুব কম। জ্ঞান দিতে তিনি কখনো কার্পণ্য করেননি এটা আমার চোখে দেখা। তিনি বলতেন, এই জ্ঞান কি আমি মরণের পরে নিয়ে যাবো! আমি যা জানি তোমরাও তা নিয়ে যাও। ২০১২ সালে মণিপুরি নৃত্যশিল্পী সুইটি দাশচৌধুরী নৃত্যগবেষক লুবনা মারিয়মের সাথে কমলগঞ্জে মণিপুরী নৃত্য নিয়ে কাজ করতে আসেন। ‘ধ্রুমেল’ নামে একটি যৌথ প্রকল্প শুরু হয়, সেখানে তিনি ‘মণিপুরি সঙ্গীত ও নৃত্য বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। বহু সাংস্কৃতিক সংগঠন থেকে তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মাননা পেয়েছেন। উল্লেখযোগ্য ২০০৯ সালে মণিপুরি থিয়েটারের আজীবন সম্মাননা, ২০১২ সালে মণিপুরি সাহিত্য পত্রিকা “পৌরি” সম্মাননা, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ মণিপুরি রাসপূর্ণিমা উদ্যাপন কমিটি সম্মাননা, ২০১৪ সালে মৌলভীবাজার জেলা শিল্পকলা একাডেমি সম্মাননা, একই বছর সিলেট মণিপুরি জন্মাষ্টমী উদ্যাপন পরিষদ সম্মাননা, ২০১৬ সালে বটতলা সম্মাননা, ২০২৬ সালে দীক্ষা সম্মাননা পেয়েছেন তিনি।
নৃত্যের পাশাপাশি চমৎকার অভিনয় করতেন তিনি, আমাদের বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার দুটি শর্টফিল্মে ‘ইঙাল আধাঁর পালা’ এবং ‘তেই’ অভিনয় করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি। মণিপুরি থিয়েটারের নাটকের মহড়ায় ছিল তার উজ্জ্বল উপস্থিতি। কখনো ভুল ধরিয়ে দিতেন, কখনো গানে সহযোগিতা করতেন, কখনো বা প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতেন।
জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে দু’বার স্ট্রোক করার পর চলৎশক্তিহীন ছিলেন কিন্তু মনের জোর ছিলো তার অটুট। স্মৃতিশক্তিও প্রখর, গত কয়েক মাস আগেও শেষ বিষু অনুষ্ঠানে আবার মণিপুরিদের লুপ্তপ্রায় পালা ‘উদুখলরাস’ পুনর্নির্মাণের জন্য তাকে আনা হয়েছিল, সেই ক্ষীণকায় শরীরে এসেও তিনি মহা উৎসাহে শেখাতে চেয়েছিলেন আমাদের কিন্তু তার শরীরের খারাপ অবস্থা দেখে আমরাই বাতিল করেছিলাম, সুস্থ হলে তাকে নিয়ে পরের বছর করবো এই আশায় কিন্তু তা আর হলো না, দু’মাস আগে বিছানা থেকে পড়ে পা ভেঙে গিয়ে শয্যাশায়ী হয়েছিলেন তিনি, বার্ধক্যের অসুখের ভারে শেষ পর্যন্ত সবার প্রিয় কৃষ্ণকুমারী সিনহা যাত্রা করলেন অনন্তলোকে।
বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিদের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ঘটলো, তার এই প্রয়াণে মণিপুরি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যে শূন্যস্থান তৈরি হলো তা পূরণ হবার নয়। মৃত্যুর কাছে আমাদের সবাইকেই হার মানতে হয়। তাই রবীন্দ্রনাথের সুরে বলতে হয়,
‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে
তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।।’









