নিজের এক টাকাও নেই আইএফআইসি ব্যাংকের
- মোট দায় ৫৯,৮৯৯ কোটি
- মোট সম্পদ ৫৮,৮০০ কোটি
- সম্পদের তুলনায় দায় বেশি ১,০৯৯ কোটি

একদিকে সম্পদের চেয়ে দায় বেশি, অন্যদিকে খেলাপি ঋণের বোঝায় কমছে প্রকৃত আয়। এমনকি ব্যাংকের নিয়মিত কার্যক্রম থেকেও তৈরি হচ্ছে না পর্যাপ্ত নগদ অর্থ। সব মিলিয়ে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসির আর্থিক সংকট এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ব্যাংকটির ঋণাত্মক মূলধন ছাড়িয়েছে হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকটির শেয়ারহোল্ডারদের নিজের বলতে এক টাকাও নেই।
ব্যাংকটির বর্তমান এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ খেলাপি ঋণের বোঝা। ঋণ বিতরণের পর তা আদায় করতে না পারায় ব্যাংকের বিপুল অর্থ আটকে গেছে। ফলে এসব ঋণ থেকে নিয়মিত সুদ আয় হচ্ছে না, বরং অনাদায়ী সুদ স্থগিত রাখতে হচ্ছে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি সংরক্ষণের চাপ বাড়ছে, যা ব্যাংকের আয় ও মূলধনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এতে একদিকে সুদ আয় কমে লোকসান বাড়ছে, অন্যদিকে সম্পদের মানের অবনতি ঘটছে। খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যর্থতা দীর্ঘায়িত হওয়ায় ব্যাংকটির আর্থিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ব্যাংকটি লোকসান করেছে ১ হাজার ৬৬৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। আগের বছরের একই সময়ে লোকসান ছিল ১ হাজার ১২৮ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে লোকসান বেড়েছে ৫৪১ কোটি টাকার বেশি। ফলে শেয়ারপ্রতি লোকসানও ৫ টাকা ৮৭ পয়সা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ টাকা ৬৯ পয়সায়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো ব্যাংকটির মোট দায় এখন মোট সম্পদের চেয়েও বেশি। ৩০ জুন ২০২৬ শেষে ব্যাংকের মোট দায় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৯ হাজার ৮৯৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা। বিপরীতে মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫৮ হাজার ৮০০ কোটি ৬২ লাখ টাকা। অর্থাৎ সম্পদের চেয়ে দায় বেশি প্রায় ১ হাজার ৯৯ কোটি টাকা। এর ফলে ব্যাংকটির শেয়ারহোল্ডারদের মূলধন ঋণাত্মক হয়ে গেছে।
ব্যাংকের মূল ব্যবসা ঋণ দিয়ে সুদ আয় করা। অথচ সেই মূল ব্যবসাতেই বড় ধস নেমেছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটির নিট সুদ আয় হয়েছে ঋণাত্মক ১ হাজার ৫৩৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আগের বছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল প্রায় ৯৬৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সুদ আয় ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ৫৬৫ কোটি টাকা।
ঋণের মান নিয়েও তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন। ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্পদের মানের অবনতির কারণে ব্যাংকটি লোকসানে পড়েছে। অর্থাৎ লোকসানের পেছনে শুধু ব্যবসায়িক আয় কমে যাওয়া নয়, বরং সম্পদের মানের অবনতিও বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
এদিকে ব্যাংকের আদায় না হওয়া ঋণের সুদও ফুলে উঠছে। ৩০ জুন ২০২৬ শেষে স্থগিত সুদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৩৪০ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর এর পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৭৩৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা। মাত্র ছয় মাসে স্থগিত সুদ বেড়েছে প্রায় ৬০৭ কোটি টাকা।
শুধু কাগজে লোকসান নয়, নগদ অর্থের প্রবাহেও দেখা দিয়েছে বড় সংকট। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে পরিচালন কার্যক্রম থেকে ব্যাংকের নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক হয়েছে ৮২২ কোটি ২৪ লাখ টাকা। অথচ আগের বছরের একই সময়ে পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহ ছিল ইতিবাচক প্রায় ৯৬৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নগদ প্রবাহের অবস্থায় বড় ধরনের অবনতি হয়েছে। পরিচালন নগদ প্রবাহের এই ধাক্কা শেয়ারপ্রতি নগদ প্রবাহেও স্পষ্ট। আগের বছরের একই সময়ে শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদ প্রবাহ ছিল ৫ টাকা ১ পয়সা। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সেটি ঋণাত্মক ৪ টাকা ২৮ পয়সায় নেমে গেছে। অর্থাৎ ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে নগদ অর্থ তৈরি করার সক্ষমতায় বড় চাপ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে ঋণের বিপরীতে বড় অঙ্কের সঞ্চিতি রাখতে হয়েছে ব্যাংকটিকে। ৩০ জুন ২০২৬ শেষে ঋণ ও অগ্রিমের বিপরীতে মোট সঞ্চিতির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ২৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে শ্রেণীকৃত ঋণের বিপরীতে নির্দিষ্ট সঞ্চিতি রয়েছে প্রায় ৭৯২ কোটি ৯০ লাখ টাকা।
এসব বিষয়ে জানতে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হুসাইন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মনসুর মুস্তফার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও কোনো প্রত্যুত্তর পাওয়া যায়নি।



