উলিপুর
কাজ না করে ব্যয় দেখিয়ে কোটি টাকা গায়েব!

ছবি: আগামীর সময়
কাজের অগ্রগতি নেই, কোথাও রাস্তা নির্মাণ অসম্পূর্ণ, কোথাও প্রকল্পের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন। অথচ অর্থ বছরের শেষ দিন ৩০ জুনের আগেই ব্যয় দেখিয়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) বরাদ্দের পুরো এক কোটি টাকা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে কুড়িগ্রামের উলিপুর পৌরসভার বিরুদ্ধে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ছয়টি প্যাকেজের আওতায় নেওয়া ১৪টি উন্নয়ন প্রকল্পের অধিকাংশের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হয়নি। সম্প্রতি কয়েকটি কাজ সম্পন্ন হলেও বাকি প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। এতে একদিকে সরকারি অর্থের ব্যবহার ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে ভোগান্তিতে পড়েছেন পৌরবাসী।
পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এডিবি উলিপুর পৌরসভার উন্নয়নে এক কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। এ অর্থে ছয়টি প্যাকেজের আওতায় ১৪টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। গত ১৯ এপ্রিল ২০২৬ এসব কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়। দরপত্রের মাধ্যমে বিভিন্ন কাজের দায়িত্ব পান আব্দুল হাই সরকার, এম/এস এ এম ট্রেডার্স, শফিকুল আলম, এম/এস নুর ট্রেডার্স, হাসান ও বাদল কনজুমার প্রডাক্টস। প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে, পৌর ভবন মেরামত ও আসবাবপত্র সরবরাহ, বিভিন্ন এলাকায় সিসি রাস্তা নির্মাণ, ড্রেন নির্মাণ এবং পুকুরপাড়ে ইটের প্যালাসাইডিং দেয়াল নির্মাণ।
উল্লেখযোগ্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে- পৌর সুপার মার্কেটের সামনে থেকে সালামের দোকান পর্যন্ত সিসি রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণ, পূর্ব বাজার রেলক্রসিং থেকে আজমের মোড় পর্যন্ত সিসি ভি-ড্রেন নির্মাণ, লাভলুর বাড়ি থেকে সুরুজ্জামান মাস্টারের বাড়ি পর্যন্ত সিসি রাস্তা, নুর মোহাম্মদের বাড়ি থেকে শহীদ মিনার পর্যন্ত পিভিসি পাইপ ড্রেন নির্মাণ এবং মাতৃমঙ্গল থেকে নির্বাচন অফিস পর্যন্ত সিসি রাস্তা নির্মাণ।
এ ছাড়া চোকদার পাড়া শাহী মসজিদ থেকে আব্দুর রহিমের বাড়ি পর্যন্ত সড়ক, রামদাস ধনিরামসহ বিভিন্ন এলাকার রাস্তা নির্মাণ এবং একাধিক পুকুরপাড়ে ইটের প্যালাসাইডিংয়ের কাজও প্রকল্প তালিকায় রয়েছে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মাতৃমঙ্গল থেকে নির্বাচন অফিস পর্যন্ত সিসি রাস্তা, পৌর সুপার মার্কেটের সামনে থেকে সালামের দোকান পর্যন্ত রাস্তা এবং নুর মোহাম্মদের বাড়ির সামনে পিভিসি পাইপ ড্রেন নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। পৌর ভবন মেরামতের কাজও চলমান রয়েছে। তবে তালিকাভুক্ত বাকি প্রকল্পগুলোর অনেকগুলোর কাজ শুরু হয়নি বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। প্রকল্প তালিকায় থাকা দুটি ড্রেনের অস্তিত্বও সরেজমিন খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কোনো কোনো সড়কের মাঝখানে ড্রেন নির্মাণ করা হলেও দুই পাশে রাস্তা অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে আগে যেসব সড়কে রিকশা-ভ্যান, গাড়ি ও জরুরি সেবার যানবাহন চলাচল করত, সেগুলো এখন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শিশু, নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও মসজিদের মুসল্লিদের দুর্ভোগ বেড়েছে।
পৌরসভার চোকদার পাড়া এলাকার বাসিন্দা আফছারী আলী (৫৫) বলেন, রাস্তাটা কাঁচা ছিল, তবু চলাচল করা যেত। রাস্তার মাঝখানে ড্রেন নির্মাণ করে দুই পাশে দুই-তিন ফুট করে গর্ত রাখা হয়েছে। পুরো রাস্তাটি সিসি করার কথা থাকলেও ড্রেন নির্মাণের পর আর রাস্তার কাজ হচ্ছে না। আগে গাড়ি, রিকশা-ভ্যান, এমনকি অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের গাড়িও চলাচল করতে পারত। এখন পায়ে হাঁটা ছাড়া উপায় নেই। সুস্থ মানুষের চলাচলও বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে।
একই এলাকার ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, আগে রাস্তাটি পাকা ছিল। সিসি রাস্তা নির্মাণের জন্য জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ প্রায় ছয় মাস আগে রাস্তার মাঝ বরাবর সাড়ে তিন ফুট প্রশস্ত ড্রেন নির্মাণ করে। এরপর দুই পাশের গর্ত ভরাট করে রাস্তা নির্মাণের কথা পৌরসভার। কিন্তু এখনো কাজ শুরু হয়নি। রাস্তাটি দ্রুত নির্মাণ করা প্রয়োজন।
পৌরসভার একটি সূত্র জানায়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলেও ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে প্রকল্পগুলোর সম্পূর্ণ ব্যয় দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। এডিবির বরাদ্দের প্রকল্পগুলোতে প্রতি বছরই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না করে অর্থবছরের শেষ দিকে অর্থ উত্তোলন করা হয়। পরে অসম্পূর্ণ কাজকে সম্পন্ন দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি হয় বলে সূত্রটি অভিযোগ করেছে।
প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন না হওয়ার বিষয়ে ঠিকাদার মো. হাসান বলেন, ইটের দাম বেড়ে যাওয়ায় কাজ করতে পারিনি। এখন ইটও পাওয়া যাচ্ছে না। নতুন ইট তৈরি হলে কাজ করা হবে।
পৌরসভা বিল দেখিয়ে টাকা তুলে রেখেছে বলেও তিনি দাবি করেন। তবে তার বক্তব্যে কোন কোন প্রকল্পের কাজ তার দায়িত্বে ছিল এবং সেগুলোর বিপরীতে কত টাকা উত্তোলন করা হয়েছে, তা বলেননি।
সদ্য বদলি হওয়া পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহবুবুল আলম বলেন, বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে প্রকল্পগুলোর কাজ করা সম্ভব হয়নি। ৩০ জুন ২০২৬ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, অর্থ ট্রেজারি থেকে পৌরসভার হিসাবে রাখা হয়েছে।
কাজ না করে কীভাবে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ব্যয় দেখিয়ে টাকা তোলা হয়েছে। এখন কাজ করা হবে।
নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করেও ব্যয় দেখিয়ে অর্থ উত্তোলনের বিষয়টি আর্থিক অনিয়মের পর্যায়ে পড়ে কি না, জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দেননি।
উলিপুর পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ টি এম আরিফ জানান, কাজ না করায় ইতিমধ্যে ঠিকাদারদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ না করলে ১০ শতাংশ টাকা কেটে নিয়ে কাজ বাতিল করে নতুন দরপত্র আহ্বান করা হবে।
কাজ অসম্পূর্ণ থাকা অবস্থায় প্রকল্পের ব্যয় দেখিয়ে অর্থ উত্তোলনের বিষয়টি আর্থিক অনিয়ম কি না, জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেননি।




