প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে আলোচনায় মাতারবাড়ী বিজনেস হাব

ছবি: আগামীর সময়
জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এটি নিছক কোনো সাধারণ রাষ্ট্রীয় সফর নয়। দেশের অর্থনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার এক ঐতিহাসিক যাত্রা। সফরের কেন্দ্রে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মেরিটাইম বেল্ট। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, মাতারবাড়ী ও মহেশখালী। জাপানের বিশাল বিনিয়োগ নিশ্চিত হলে এখানেই গড়ে উঠবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ শিল্প ও লজিস্টিকস হাব। দেশের প্রথম মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ঘিরে বদলে যাবে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার পর্যন্ত পুরো অঞ্চলের চিত্র। এমনটাই আশা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে জাপানের কাছে মোট ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ২.২ ট্রিলিয়ন ইয়েনের একটি কৌশলগত বিনিয়োগ ও সহযোগিতা প্যাকেজ প্রস্তাব করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। প্রতি ডলার ১২৫ টাকা ধরে হিসাব করলে বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩১ মেয়াদের জন্য ১২টি অগ্রাধিকার খাতে এই অর্থ চাওয়া হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বরাদ্দ চাওয়া হচ্ছে যোগাযোগ ও নগর অবকাঠামো খাতে, যার পরিমাণ ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৪৩ হাজার ১২৫ কোটি টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার বা ৩৯ হাজার ২৫০ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে সরাসরি মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন উদ্যোগ (মিডি) ও বন্দর হাবের জন্য।
এ ছাড়া জ্বালানি ও জলবায়ু খাতে ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, উৎপাদন, সেমিকন্ডাক্টর ও অটোমোবাইল খাতে ১ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার এবং কৃষি, ব্লু-ইকোনমি ও পর্যটন খাতে ১ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব থাকছে।
টোকিও সফরের মূল ফোকাস কেবল প্রথাগত ঋণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এবার সরকার সরকারি উন্নয়ন সহায়তার (ওডিএ) পাশাপাশি সরাসরি জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বকে (পিপিপি) সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সফরের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা হলো বঙ্গোপসাগরীয় শিল্পাঞ্চল প্রবৃদ্ধি বলয় বা ‘বিগ-বি’ ২.০ কাঠামোকে আরও গতিশীল করা। এর আওতায় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারকে একটি একক শিল্প ও লজিস্টিকস করিডরে বাঁধা।
প্রথমত, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে একটি পূর্ণাঙ্গ লজিস্টিকস হাবে রূপান্তর করা। দ্বিতীয়ত, মহেশখালীতে একটি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি বা এনার্জি হাব গড়ে তোলা। তৃতীয়ত, জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করা। সেখানে অটোমোবাইল, সেমিকন্ডাক্টর ও শিপবিল্ডিংয়ের মতো ভারী শিল্প গড়ে তোলা হবে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে ৬ লেনে উন্নীত করাও অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
চট্টগ্রাম চেম্বার প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আমিরুল হক বলছেন, ‘চট্টগ্রাম একটি লজিস্টিক রিজিওনাল হাব হয়ে ওঠার বড় অগ্রগতি হবে জাপানি বিনিয়োগ নিশ্চিতের মাধ্যমে। এটা সরকারের দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। আমাদের সকল প্রতিবেশীকে সেবা প্রদানের মাধ্যমেই এর সফলতা নিশ্চিত হতে পারে।’
সরকার কেন মাতারবাড়ী-মহেশখালীকেই ফোকাস করছে? কারণ এর ভৌগোলিক অবস্থান ও গভীরতা। বঙ্গোপসাগরের এই পয়েন্টটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুটের খুব কাছে। এখানকার ড্রাফট বা গভীরতা ১৮ মিটারের বেশি, যা বড় জাহাজ বা মাদার ভ্যাসেল ভেড়ানোর জন্য আদর্শ। চট্টগ্রাম বন্দরে ১০ মিটার বেশি গভীরের জাহাজ ভিড়তে পারে না।
অন্যদিকে, জাপান কেন এত আগ্রহী? এর উত্তর লুকিয়ে আছে জাপানের 'ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক' নীতিতে। জাপান চায় বঙ্গোপসাগরে তাদের ভূ-রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে। তাদের 'বিগ-বি' মহাপরিকল্পনার মূল ভিত্তিই হলো এই মাতারবাড়ী। চীনের প্রভাব মোকাবিলা করে এশিয়ায় নিজেদের সাপ্লাই চেইন সুরক্ষিত রাখতে জাপানের কাছে মাতারবাড়ীর চেয়ে ভালো বিকল্প নেই।
জাপান এরই মধ্যে এই অঞ্চলে বিপুল অর্থ ঢেলেছে। জাইকার অর্থায়নে মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণকাজ চলছে। সেখানে ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণেও জাপানের হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। বন্দর চ্যানেল ড্রেজিং এবং সংযোগ সড়ক নির্মাণেও তারা কাজ করছে। সব মিলিয়ে শুধু মাতারবাড়ী ও মহেশখালীকেন্দ্রিক প্রকল্পগুলোতেই জাপানের বর্তমান বিনিয়োগ প্রায় ৫ থেকে ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি। নতুন ১৪ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ নিশ্চিত হলে এটি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে।
এই বিশাল বিনিয়োগ নিশ্চিত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ম্যাজিক ঘটবে মনে করেন শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা। প্রথমত, আমদানি-রপ্তানিতে খরচ ও সময় প্রায় অর্ধেকে নামবে। সিঙ্গাপুর বা কলম্বো বন্দরের ওপর আমাদের দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কমবে। মাদার ভেসেল বা বিশাল আকৃতির জাহাজ সরাসরি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরে ভিড়তে পারবে। এতে বছরে বাঁচবে হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি। লাখো মানুষের নতুন কর্মসংস্থান হবে। দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে এই হাব একাই অন্তত ৩ শতাংশ বাড়তি অবদান রাখবে।
মাতারবাড়ী শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো অঞ্চলের গেম-চেঞ্জার হবে। ভারতের স্থলবেষ্টিত উত্তর-পূর্বাঞ্চল বা 'সেভেন সিস্টার্স' এই বন্দর ব্যবহার করে সহজেই সমুদ্রে প্রবেশাধিকার পাবে। এতে তাদের পণ্য পরিবহন খরচ অনেক কমে যাবে। মিয়ানমারের ইয়াংগুন বন্দরের সঙ্গে মাতারবাড়ীর সরাসরি জাহাজের ফিডার নেটওয়ার্ক গড়ে উঠবে। এমনকি চীনের কুনমিং প্রদেশও মিয়ানমার হয়ে এই লজিস্টিকস হাবের সুফল নিতে পারবে। মাতারবাড়ী হয়ে উঠবে পুরো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান ট্রান্সশিপমেন্ট হাব। আঞ্চলিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু হবে বাংলাদেশ।
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলকে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্লোবাল হাবে রূপান্তর করতে সরকার বহুমুখী সংযোগের ছক কষেছে। এর অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করার নকশা ডিজাইন করতে ৩.৮৩১ বিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ৩২০ কোটি টাকা জাপানের কাছে চাইবে।
এ ছাড়া মহেশখালী দ্বীপকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করতে কক্সবাজার-মহেশখালী চ্যানেলের ওপর একটি আধুনিক সেতু নির্মাণের প্রস্তাবও রয়েছে। মূলকথা কক্সবাজার সদর থেকে মহেশখালী, চকরিয়া, পেকুয়া, আনোয়ারা, বাঁশখালী হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিশাল অঞ্চলকে এই হাবের আওতায় সুবিধা নিশ্চিত করতে চায় সরকার।
অর্থাৎ চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত পুরো উপকূলীয় অঞ্চলটি একটি বিশাল শিল্প করিডরে পরিণত হবে। মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে মাতারবাড়ী পর্যন্ত তৈরি হবে মেরিন ড্রাইভ ও ডেডিকেটেড ফ্রেইট করিডর। এই পুরো রূপান্তর ঘটতে খুব বেশি সময় লাগবে না। বন্দর পুরোদমে চালু হওয়ার পর এই অঞ্চল বিজনেস লজিস্টিকস হাবে পরিণত হবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অর্থনীতিবিদ জানালেন, বঙ্গোপসাগর নিয়ে সরকার একপেশে বা একদিকে হেলে পড়লে হবে না। তাতে কিন্তু বড় বিপদ আছে। হাব হওয়ার সফল হবে সেটি নির্ভর করছে সরকারের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলী বিচক্ষণ সিদ্ধান্তের ওপর।






