রোগীর সেবাই সালমানের নেশা

রোগী নিয়ে হাসপাতালে সালমান কবির
রোগীর ফোন পেলেই তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়েন কোথায় নিয়ে যাবেন, কোন ডাক্তার দেখাবেন, রোগীর কাছে কত টাকা আছে, বাকি টাকার জন্য কার কার কাছে ফোন করে অর্থ সহায়তা চাইবেন, রক্তের জন্য কাকে কাকে ফোন করবেন ইত্যাদি কাজে। তিনি মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার কালীনগর গ্রামের বাসিন্দা সালমান কবির (৪২)।
সালমান পেশায় ডেকোরেশন কারিগর ও কৃষক। আর্থিকভাবে অসচ্ছল অসুস্থ মানুষদের সিলেট কিংবা ঢাকার হাসপাতালে বা ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো, অপারেশন করানো, ওষুধ, চিকিৎসাসহ যাবতীয় ব্যবস্থা করতে রোগীর পাশে থাকেন। ক্ষেত্রবিশেষে যাতায়াত খরচ, ওষুধ এমনকি খাবারও কিনে দেন তিনি। এ কাজে নিজের উপার্জিত ও স্বজনদের কাছ থেকে নেওয়া সহায়তার টাকা ব্যয় করেন।
সালমান রোগীদের সেবাশুশ্রূষা করেন, অসুস্থ বা মৃত্যু পথযাত্রীদের পাশে রাত কাটান। রোগীদের রক্ত সংগ্রহ করে দেন ও মরদেহের গোসল করান। শুধু তাই নয়, নিজের স্ত্রীকেও অনেক মহিলা রোগীর পাশে থাকার জন্য পাঠিয়ে দেন তাদের বাড়িতে কিংবা হাসপাতালে।
২০১৩ সালে তার স্ত্রীর গলায় মাছের কাঁটা আটকে যায়। কোমরের হাড়েও সমস্যা দেখা দেয়। একাধারে চার বছর স্ত্রীকে নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডাক্তারের চেম্বারে যাওয়া-আসার সময়ে অন্যান্য রোগীর দুঃখ-দুর্দশা ও আর্থিক সমস্যার বিষয়টি তিনি কাছ থেকে দেখেছেন। সেই থেকে তিনি অসহায় দরিদ্র রোগীর চিকিৎসায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। একপর্যায়ে রোগীর সেবা তার নেশায় পরিণত হয়। নিজের কাজ ফেলে রেখে সংকটাপন্ন রোগীদের নিয়ে যান হাসপাতালে।
এ পর্যন্ত তিনি এভাবে সহযোগিতা করেছেন ১০১৫ রোগীকে। সিলেটের প্রায় সব হাসপাতালের অধিকাংশ ডাক্তার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে চেনেন। অনেক ডাক্তার সালমানের রোগীর কাছ থেকে ভিজিটও কম নেন; অনেকে ভিজিট নেন না। হাসপাতালে ভর্তি করানো এবং রোগীর বিল কমানোর জন্য বিভিন্ন টেবিলে দৌড়ঝাঁপ করেন সালমান। এ পর্যন্ত শতাধিক রোগীর জন্য রক্ত জোগাড় করে দিয়েছেন। ৭৯টি মরদেহের গোসল করিয়েছেন তিনি। শুধু তাই নয়, গ্রামে গরু চুরি ঠেকাতে রাত জেগে পাহারাও দেন।
কালীনগর গ্রামের হতদরিদ্র হাওয়া বেগম (৪৫) বললেন, ‘আমার ঘাড়ে ফোঁড়া হয়েছিল। তিন-চারটি হাসপাতাল ঘুরে ২০-২৫ হাজার টাকা খরচ করে কোনো ফল পাইনি। অবশেষে সালমান ভাইয়ের মাধ্যমে সিলেটের একটি হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা করিয়ে আমি সুস্থ হয়েছি। তিনি নিজের পকেটের টাকা ও বিভিন্ন মানুষ থেকে সহযোগিতা নিয়ে হাসপাতালের ২৪ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করেছেন।’
কুলাউড়া উপজেলার গোগালীছড়া গ্রামের শাহীন আহমদ বললেন, ‘আমার ছেলে সাদিক আহমদ (৮) দুই-তিন মাস ধরে প্রতিদিন বমি করত। অনেক ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা করিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধে অনেক টাকা খরচ করেছি, কিন্তু রোগ নিরাময় হয়নি। অবশেষে সালমান ভাইয়ের মাধ্যমে সিলেটে একজন ডাক্তার দেখাই। কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই মাত্র ২৮৮ টাকার ওষুধে আমার ছেলে এখন পুরোপুরি সুস্থ।’
সালমান কবিরের ভাষ্য, ‘মানুষের জন্য কাজ করাটা সৌভাগ্যের। অনেক হতদরিদ্র পরিবারে মৃত্যু পথযাত্রী রোগী কিংবা লাশের পাশে রাত কাটানোর কোনো মানুষ মেলে না, সেখানে আমি রাত কাটাই। এ কাজ করতে গিয়ে আর্থিক ও শারীরিকভাবে ক্ষতির শিকার হই, তবে মানসিক তৃপ্তি পাই।’
জায়ফরনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাছুম রেজা বললেন, ‘সালমান কবির অসহায় মানুষের সেবা করেন। তার কাজগুলো অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য। এসব মানবিক কাজে যুব সমাজের এগিয়ে আসতে হবে।’



