ভয় না পেয়ে পরিবর্তন গ্রহণ করেন যারা ভবিষ্যৎ তাদেরই

মনজুলা মোরশেদ, ছবি: ব্র্যাক ব্যাংকের সৌজন্যে
প্রযুক্তির পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব এবং কর্মক্ষেত্রে নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা— সবকিছুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে যাচ্ছে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা। এ নিয়ে কথা বলেছেন ব্র্যাক ব্যাংকের ডিএমডি ও চিফ হিউম্যান রিসোর্সেস অফিসার মনজুলা মোরশেদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন স্বর্ণা রায়
ক্যারিয়ার ক্লাব: টেলিকম, ম্যানুফ্যাকচারিং, ব্যাংকিং ও এফএমসিজি— বিভিন্ন খাতে আপনি ২৫ বছরের বেশি সময় মানবসম্পদ নিয়ে কাজ করেছেন। এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় কোন পরিবর্তন আপনাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে?
মনজুলা মোরশেদ: আমার কর্মজীবনের শুরু একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে। সেখানে মানবসম্পদের বিভিন্ন ভূমিকায় কাজের সুযোগ এ পেশায় আমার শক্ত ভিত্তি গড়ে দিয়েছে। পরে বিভিন্ন খাতে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, একেক খাতে মানবসম্পদের অবস্থান একেক রকম। কোথাও একে দেখা হয় মূলত প্রশাসনিক ও সহায়ক কাজ, আবার কোথাও ব্যবসার কৌশলগত অংশীদার হিসেবে। সময়ের সঙ্গে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তন দেখেছি, তা হলো ব্যবসা কোথায় যাবে, সেখানে পৌঁছাতে কেমন মানুষ, দক্ষতা ও সংস্কৃতি প্রয়োজন— এসব প্রশ্নের উত্তর এখন মানবসম্পদ বিভাগকেই দিতে হয়। এই রূপান্তর আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে।
তবে কর্মী ও প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কে এর চেয়েও গভীর একটি পরিবর্তন দেখেছি। একসময় সম্পর্কটি ছিল নিরাপত্তার বিনিময়ে আনুগত্য। একটি প্রতিষ্ঠানে ঢুকে সারাজীবন কাটিয়ে দেওয়াই ছিল স্বাভাবিক। এখন সম্পর্কটি পারস্পরিক মূল্যের। প্রতিষ্ঠান যেমন কর্মী বাছাই করে, মেধাবী কর্মীরাও তেমনি প্রতিষ্ঠান বেছে নেন। টেলিকম খাতে প্রায় এক দশক কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, প্রযুক্তি কত দ্রুত একটি পুরো শিল্পের চেহারা বদলে দিতে পারে, আর সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে কর্মীদের নতুন করে শেখাতে হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এ যুগে সেই শিক্ষা আরও প্রাসঙ্গিক। আমার উপলব্ধি হলো, প্রযুক্তি যত এগোবে, মানুষের গুরুত্ব কমবে না; বরং মানুষ হিসেবে আমাদের অনন্য গুণগুলোর মূল্য আরও বাড়বে।
প্রযুক্তি যত এগোবে, মানুষের গুরুত্ব কমবে না; বরং মানুষ হিসেবে আমাদের অনন্য গুণগুলোর মূল্য আরও বাড়বে
নেতৃত্বের পর্যায়ে উঠে আসার পথে কোন দক্ষতাগুলো আপনার জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল?
প্রথমত, ব্যবসা বোঝা। মানবসম্পদ পেশাজীবী হিসেবে শুরু থেকেই চেষ্টা করেছি আর্থিক হিসাব, বাজার ও গ্রাহককে বুঝতে, যাতে আলোচনার টেবিলে আমার কথা শুধু ‘এইচআরের মতামত’ না হয়ে ব্যবসার সমাধান হিসেবে গণ্য হয়। দ্বিতীয়ত, সাহস করে কথা বলা। ক্যারিয়ারের অনেক বৈঠকে আমিই ছিলাম একমাত্র নারী। সেখানে নিজের মত স্পষ্টভাবে, যুক্তি দিয়ে এবং বিনয়ের সঙ্গে তুলে ধরতে শিখেছি। তৃতীয়ত, মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। টেক্সটাইল, সিমেন্ট, এফএমসিজি, ব্যাংকিং, টেলিকম; বাংলাদেশ থেকে থাইল্যান্ড— প্রতিটি নতুন পরিবেশ আমাকে নতুন করে শিখতে বাধ্য করেছে। চতুর্থত, কেউ একা বড় হতে পারে না। তাই সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং মেন্টর ও পৃষ্ঠপোষক খুঁজে নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। আর সবশেষে, নিরন্তর শেখার প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হবে। এত বছর পরেও আমি ডেটা সায়েন্স ও এআই নিয়ে পড়াশোনা করেছি। কারণ শেখা থেমে গেলে নেতৃত্বও থেমে যায়। তরুণ পেশাজীবীদের প্রতি আমার পরামর্শ হলো, শতভাগ প্রস্তুত হওয়ার অপেক্ষায় থাকবেন না। সুযোগ এলে হাত তুলুন, দায়িত্ব নিন। শেখাটা কাজের মধ্য দিয়েই হবে।
আগামী দিনের কর্মীদের কোন কোন দক্ষতায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত?
ভবিষ্যতের দক্ষতাগুলোকে আমি তিন ভাগে দেখি। প্রথমত, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। তার মানে এই নয় যে, সবাইকে প্রোগ্রামার হতে হবে; কিন্তু এআই টুল ব্যবহার করে কাজ দ্রুত ও ভালোভাবে করতে জানা, সঠিক প্রশ্ন করতে পারা এবং এআইয়ের দেওয়া উত্তর যাচাই করার সক্ষমতা থাকা জরুরি। সঙ্গে প্রয়োজন ডেটা বোঝার দক্ষতা ও সংখ্যা থেকে অর্থ বের করতে পারা। আমি প্রায়ই বলি, এআই হয়তো সরাসরি আপনার চাকরি নেবে না; কিন্তু যিনি এর ব্যবহার ভালোভাবে করতে জানেন, তিনি আপনার জায়গা নিয়ে নিতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, মানবিক দক্ষতা বাড়ানো, যেগুলো যন্ত্র সহজে নকল করতে পারে না। বিশ্লেষণী ও সমালোচনামূলক চিন্তা, বিচারবুদ্ধি, সৃজনশীলতা, স্পষ্ট যোগাযোগ, সহমর্মিতা এবং দলগতভাবে কাজ করার ক্ষমতার মতো বিষয়গুলো অন্যদের চেয়ে আপনাকে এগিয়ে রাখবে। কারণ, এআই তথ্য দিতে পারে; কিন্তু সিদ্ধান্তের দায়, মানুষের আস্থা অর্জন ও নৈতিক বিবেচনা মানুষকেই নিতে হবে।
তৃতীয়ত, দ্রুত শিখতে পারাটাও বড় দক্ষতা। কারণ, আজ যে দক্ষতা মূল্যবান, পাঁচ বছর পর তা পুরনো হয়ে যেতে পারে। তাই যারা দ্রুত শিখতে পারেন এবং পরিবর্তনকে ভয় না পেয়ে গ্রহণ করেন, ভবিষ্যৎ তাদেরই।
শেখা থেমে গেলে নেতৃত্বও থেমে যায়
নিয়োগের সময় প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার পাশাপাশি কোন বৈশিষ্ট্যগুলো আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়?
আমি কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ করি। প্রথমত, শেখার আগ্রহ ও কৌতূহল। সাক্ষাৎকারের শেষে যিনি কাজ বা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ভাবনাপূর্ণ প্রশ্ন করেন, তিনি আমার মনোযোগ কাড়েন। দ্বিতীয়ত, সততা ও দায়িত্ববোধ। আমি প্রায়ই জানতে চাই, কোন ব্যর্থতা থেকে তিনি কী শিখেছেন। যিনি নিজের ভুল স্বীকার করে তা থেকে শেখার গল্প বলতে পারেন, তার ওপর আস্থা রাখা সহজ। তৃতীয়ত, আত্মবিশ্বাস ও বিনয়ের ভারসাম্য। নিজের সামর্থ্য নিয়ে আত্মবিশ্বাসী থাকার পাশাপাশি অন্যের কাছ থেকে শিখতে প্রস্তুত থাকা। চতুর্থত, যোগাযোগ ও দলগত মনোভাব থাকাকেও গুরুত্ব দিই। যারা নিজের চিন্তা গুছিয়ে বলতে পারেন এবং অন্যের কথা মন দিয়ে শোনেন, তারা এগিয়ে থাকেন। পঞ্চমত, চাপের মধ্যে ধৈর্য ধরে রাখা ও প্রতিকূলতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা জরুরি। আর অবশ্যই প্রতিষ্ঠানের মূল্যবোধের সঙ্গে ব্যক্তির মূল্যবোধ মেলে কি না। প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষতা শেখানো যায়; কিন্তু মানসিকতা ও মূল্যবোধ বদলানো কঠিন। তাই সঠিক মানসিকতার কর্মী নিয়োগ দিয়ে তার দক্ষতা গড়ে তোলাই আমার কাছে বেশি কার্যকর মনে হয়।



