ইসলামী ব্যাংকে ১ মাসে আমানত কমল ১৯ হাজার কোটি
- পূর্ণাঙ্গ বোর্ডের অভাবে ইসলামী ব্যাংকে অস্থিরতা
- পাঁচ ডিএমডির বয়স থাকলেও এ মাসেই বাধ্যতামূলক অবসর

অনেকটা অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। চার মাসের বেশি সময় দেশের বেসরকারি খাতের সর্ববৃহৎ ব্যাংক খ্যাত শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নেই পূর্ণাঙ্গ বোর্ড। যদিও বিতর্কিত ব্যবসায়িক গ্রুপ এস আলমের ব্যাপক লুটপাটের শিকার প্রতিষ্ঠানটিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক (ইডি) মোহাম্মদ জহির হোসেন গত ১৪ জুন এককভাবে চেয়ারম্যান পদসহ েবার্ডের সামগ্রিক দায়িত্ব পান। মূলত এর লক্ষ্য ছিল, ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকের আস্থা অর্জনসহ অস্বাভাবিক হারে টাকা তোলা বন্ধ করা।
উপস্থিত গ্রাহককে চাহিদামতো টাকা দিয়ে ব্যাংকের ওপর আস্থা ফেরাতে শুধু জুন মাসেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক নগদ ১৭ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দেয়। এতে টাকা তোলার হিড়িক কমলেও বাস্তবে দৃশ্যমান হয়নি আস্থা ফেরার প্রমাণ। বরং এক মাসে ব্যাংকে টাকা জমার চেয়ে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা তুলে নেন আমানতকারীরা। মূলত পূর্ণাঙ্গ বোর্ড না থাকায় আস্থার সংকটে ভুগছেন গ্রাহকরা। কেননা, ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড যথাযথ শরিয়াহ অভিজ্ঞতা ছাড়া একজন দিয়ে চালাতে গিয়ে থেকে যাচ্ছে সমস্যা। এ ছাড়া ৬০ বছর পর্যন্ত চাকরির বয়স থাকা সত্ত্বেও পাঁচ অভিজ্ঞ উপব্যবস্থাপনা পরিচালককে (ডিএমডি) এ মাসেই কৌশলে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর উদ্যোগ ব্যাংকটিকে নতুন সংকটে ফেলবে বলে শঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
ইসলামী ব্যাংকের লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, চলতি বছরের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে টাকা তুলতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলেন আস্থার সংকটে থাকা অধিকাংশ আমানতকারী। কিন্তু গ্রাহকের চাহিদামতো টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হয় ব্যাংকটি। সংকট নিরসনে চাওয়া হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তা। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে প্রথমে বোর্ড বাতিল করে ইডি জহির হোসেনকে চেয়ারম্যানের ক্ষমতা দিয়ে নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। সঙ্গে নগদ তারল্যসহায়তা দেয় ১৭ হাজার কোটি টাকা।
এতে গ্রাহক একটু একটু করে টাকা জমাও দিতে থাকেন। আবার প্রয়োজনে টাকা তোলেন। কিন্তু ব্যাংকটির করপোরেট গ্রাহকরা আস্থা তেমন একটা পাননি। প্রায় তিন কোটি গ্রাহক আস্থার দালাচালে ভুগতে থাকেন। অনেকে শাখা-উপশাখাসহ সবখানে পূর্ণাঙ্গ বোর্ডের দাবি জানিয়ে আসেন। পূর্ণাঙ্গ বোর্ডের দাবিতে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়সহ শাখাগুলোর সামনে নানা কর্মসূচিও পালন করে সচেতন গ্রাহক ফোরাম। কিন্তু চার মাসের বেশি সময় পার হলেও অজানা কারণে ব্যাংকটিতে পূর্ণাঙ্গ বোর্ড দেয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ততদিনে ব্যাংকটির আমানত কমেছে ১৮ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা। কেননা, গত ৩১ মে ব্যাংকটির আমানত ছিল ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা, যা ৩০ জুন কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ৬৪ হাজার ৬২১ কোটি টাকায়। ৩০ সেপ্টেম্বর সর্বশেষ হালনাগাদে হয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা। সামান্য উন্নতি হলেও এর পেছনে কাজ করেছে ব্যাংকটির বড় ধরনের ঋণ বিতরণ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত। আবার খেলাপি ঋণ আদায়েও আসেনি গতি।
ইসলামী ব্যাংকের লোকাল অফিসের গ্রাহক হামিদুল হক জানালেন, ইসলামী ব্যাংক নিয়ে সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাবনা ক্লিয়ার নয়। ব্যাংকটির প্রতি আস্থা কাজ করছে না। সেজন্য গত আগস্ট মাসে ২০ লাখ টাকা তুলে দুটো সরকারি ব্যাংকে জমা রেখেছি। শুনেছি, আগের যারা অভিজ্ঞ ডিএমডি তাদের চাকরির বয়স শেষ না হলেও পাঁচজনকে এ মাসে বাদ দেওয়া হবে। তখন ব্যাংকে ব্যাপক সংকট দেখা দেবে।
কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ব্যাংকটিতে ২০২৪ সালে এই পাঁচজনকে এসইভিপি থেকে ডিএমডি পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। পদোন্নতি ও নিয়োগপত্রে দুই বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হলেও নিয়োগপত্রে উল্লেখ ছিল, ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত তারা চাকরির সব সুযোগ-সুবিধা পাবেন এবং ব্যাংকের সার্ভিস রুল অনুযায়ী বহাল থাকবে তাদের চাকরি। এই পাঁচ ডিএমডির কারও বয়স ৩০ অক্টোবর ৬০ বছর হচ্ছে না। অথচ চুক্তির মেয়াদ দুই বছর পূর্ণ হচ্ছে— এই অজুহাতে ৩০ অক্টোবরই তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হচ্ছে।
ডিএমডিরা হলেন— মাহমুদুর রহমান, মনিরুল আলম আল মামুন, রফিকুল ইসলাম, মোহাম্মদ সাইদ উল্লাহ ও মাকসুদুর রহমান। এই পাঁচজনই দীর্ঘদিন বিভিন্ন পদে যোগ্যতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্বের পর্যায়ে পৌঁছেছেন।
ব্যাংকটির কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের বৃহত্তম ব্যাংক হওয়ার কারণে রেমিট্যান্স, বৈদেশিক বাণিজ্য, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও নারীর ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংকের রয়েছে বিশাল ভূমিকা। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশিত রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারসংশ্লিষ্ট কর্মসূচি বাস্তবায়নেও ইসলামী ব্যাংক মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। আর এই পাঁচ কর্মকর্তা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা বাস্তবায়ন, ব্যাংকের নীতিনির্ধারণ, তহবিল ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করছেন, যা ব্যাংকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আমানতকারী, বিনিয়োগ গ্রাহক এবং বিদেশি প্রতিনিধিদের সঙ্গেও তাদের রয়েছে তিন দশকের বেশি সময়ের নিবিড় সম্পর্ক। তাদের বাদ দিলে ধুঁকতে থাকা ব্যাংকটি আবার নেতৃত্বশূন্যতা ও ভয়াবহ আস্থার সংকটে পড়বে।
জানা গেছে, এর মধ্যে ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত তাদের চাকরি অব্যাহত রেখে তা নবায়নের আবেদন করেছেন এই পাঁচ ডিএমডি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্যাংকের প্রশাসন বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আবেদনে তারা চাকরি নবায়নের যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলেছেন, ব্যাংকের বিদ্যমান মানবসম্পদ নীতি, নিয়োগপত্রের শর্ত ও দেশের আইন অনুযায়ী তাদের ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত চাকরি করার অধিকার রয়েছে। আবেদনপত্রে আরও উল্লেখ করেন, ‘ব্যাংকের চাকরি বিধিমালার চ্যাপ্টার-০৪ (প্রমোশন পলিসি)-এর অনুচ্ছেদ ১.১৪ অনুযায়ী, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগ মূলত পদোন্নতি। ২০১৭ সালের আগে এ পদ চুক্তিভিত্তিক ছিল না। পরবর্তী সময়ে প্রবর্তিত চুক্তিভিত্তিক কাঠামো একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা মাত্র, যা পদোন্নতির মৌলিক চরিত্র পরিবর্তন করে না।’
গত ১৯ আগস্ট এ ধরনের এক মামলার রায়ে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ উল্লেখ করেন, ‘চাকরিতে প্রবেশের সময় কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী যে অধিকার ও পদোন্নতির যোগ্যতায় থাকেন, পরবর্তী সময়ে প্রবিধানমালা বা বিধি সংশোধন করে তা কেড়ে নেওয়া যাবে না।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র জানিয়েছে, এই কর্মকর্তাদের অপরিহার্যতার বিষয়টি অবহিত করে ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ইডি মোহাম্মদ জহির হোসেন ৬ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কাছে একটি চিঠি পাঠান এবং তাদের মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়ে নির্দেশনা চান। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘ইসলামী ব্যাংক একটি ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক। এ-সংক্রান্ত নীতি ও কৌশল প্রণয়ন এবং তার বাস্তবায়নে তাদের রয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। উপরন্তু ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের যে সক্ষমতা তাদের রয়েছে, তা দেশের ব্যাংক খাতে অনন্য এবং যা সহজেই প্রতিস্থাপনযোগ্য নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ইডি জহির আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘ব্যাংকটির জন্য যা যা করা দরকার সব চেষ্টা করা হবে। আর ডিএমডিদের চাকরির মেয়াদ তো আমি বাড়াতে পারি না। এটি গভর্নর ভালো জানেন। আর পূর্ণাঙ্গ বোর্ড দেওয়ার বিষয়টিও আমার হাতে নেই। এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিষয়। এর বাইরে কথা বলা সম্ভব নয়।’
ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হোসেন জানালেন, ইসলামী ব্যাংক গ্রাহকের চািহদামতো টাকা ফেরত দিচ্ছে। বড় সংকট নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক নজরদারি করছে।



