২৪ বছরেও বেতন নেই, শিক্ষক হামিদ বিক্রি করেন কাঁঠালপাতা

মহাসড়কের পাশে কলার বাগান এলাকায় ঘাস ও কাঁঠালপাতার স্তূপ নিয়ে বসে আছেন আবদুল হামিদ, ছবি: আগামীর সময়
দিনাজপুর-গোবিন্দগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে কলার বাগান এলাকায় ঘাস ও কাঁঠালপাতার স্তূপ নিয়ে বসে আছেন আবদুল হামিদ। সড়ক দিয়ে চলাচল করা পরিচিত ক্রেতাদের কেউ কেউ ডাক দেন, ‘হামাক এক বোঝা ঘাস দেও, মাস্টার।’ ক্রেতার চাহিদা মতো ঘাস কিংবা পাতা তুলে দেন তিনি। বিক্রি শেষে হাতে আসে কয়েক শ টাকা। সেই টাকাতেই চলে সংসারের খরচ।
৫৯ বছর বয়সী আবদুল হামিদ শুধু ঘাস-পাতার ব্যবসায়ী নন, তিনি একজন শিক্ষকও। দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার দুর্গাপুর উচ্চবিদ্যালয়ে কৃষি বিষয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে ২৪ বছর ধরে পাঠদান করছেন। অথচ দীর্ঘ এই কর্মজীবনে সরকারি খাত থেকে বেতন পাননি এক টাকাও। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদান আর জীবিকার তাগিদে সড়কের পাশে ঘাস-পাতা বিক্রি—এভাবেই কাটছে তার দিন।
আবদুল হামিদ জানান, ২০০২ সালের ১ জুন দুর্গাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে কৃষি বিষয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন তিনি। এরপর থেকে নিয়মিত পাঠদান করে আসছেন। কিন্তু শিক্ষকতা করেও সংসার চালানোর মতো আয় না থাকায় বেছে নিতে হয়েছে বিকল্প পেশা। প্রতিদিন মহাসড়কের পাশে বসে ঘাস ও কাঁঠালপাতা বিক্রি করে তার আয় হয় প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। এই সামান্য আয় দিয়েই কোনোমতে চলে সংসার।
তবে অর্থকষ্ট তাকে শ্রেণিকক্ষ থেকে সরিয়ে নিতে পারেনি। সরকারি বেতন না পেলেও বিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের প্রতি টান থেকে নিয়মিত পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। একদিকে সংসারের ব্যয় মেটানোর দুশ্চিন্তা, অন্যদিকে শিক্ষকতার দায়িত্ব—দুইয়ের ভারই বহন করছেন আবদুল হামিদ।
এমপিওভুক্তির আবেদন, বারবার প্রত্যাখ্যান
আবদুল হামিদের শিক্ষকতা জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমপিওভুক্তির দীর্ঘ অপেক্ষা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এমপিওভুক্তির জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে এ পর্যন্ত নয়বার আবেদন করেছেন। কিন্তু প্রতিবারই কোনো না কোনো জটিলতায় আবেদন বাতিল হয়েছে।
তিনি জানান, ১৯৯৭ সালের ৬ অক্টোবর দুর্গাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে অফিস সহকারী হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। পরে বিএজিএড ডিগ্রি সম্পন্ন করে ২০০২ সালে কৃষি বিষয়ের শিক্ষক হন। ২০০৭ সালে এমপিওভুক্তির আবেদন করার পর বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের ৩০ শতাংশ নারী কোটা পূরণ না হওয়ার কারণ দেখানো হয়। পরবর্তী সময়ে এনটিআরসিএর নিয়োগবিধি-সংক্রান্ত জটিলতায়ও তার আবেদন আটকে যায় বলে জানান তিনি।
আবদুল হামিদ বলেন, এমপিওর জন্য যতবার আবেদন করেছি, ততবারই কোনো না কোনো কারণ দেখিয়ে আমার আবেদন বাতিল করা হয়েছে। প্রায় দুই যুগ ধরে বেতন পাচ্ছি না।
অবসরের আগে শেষ আশাটুকুও অনিশ্চিত
চাকরিজীবনের শেষ পর্যায়ে এসে এমপিওভুক্তির মাধ্যমে বেতন পাওয়ার আশা করছেন আবদুল হামিদ। তার হিসাবে, আর মাত্র এক বছর পর অবসরে যেতে হবে। তাই দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে শিক্ষক হিসেবে প্রাপ্য স্বীকৃতি ও আর্থিক সুবিধা পাওয়াই এখন তার প্রত্যাশা।
গত বছরের অক্টোবরে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে পরামর্শ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবারও এমপিওভুক্তির আবেদন করেন তিনি। সে সময় বিরামপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শমসের আলী মণ্ডল জানিয়েছিলেন, আবদুল হামিদের কাগজপত্র যাচাই করে অনলাইনে আবেদন পাঠানো হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে এবার তার চাকরি এমপিওভুক্ত হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
কিন্তু সেই আশাও পূরণ হয়নি। রবিবার আবদুল হামিদ জানান, বিএজিএড ডিগ্রির নম্বরপত্র না থাকায় এবারও তার এমপিওভুক্তির আবেদন বাতিল হয়েছে।
বারবার আবেদন বাতিল হওয়ার কারণ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এই শিক্ষক। তার ধারণা, বিভিন্ন দপ্তরে উৎকোচ দিতে না পারার কারণেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়ে থাকতে পারে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করেও বেতন না পাওয়া এবং অবসরের আগে বারবার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঘটনা তার জীবিকার অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। যে মানুষটি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব পালন করছেন, তাকেই নিজের সংসার চালাতে প্রতিদিন মহাসড়কের পাশে ঘাস ও কাঁঠালপাতা বিক্রি করতে হচ্ছে।



