পরিবেশবান্ধব চুলা ছড়িয়ে দেন কবুলজান

রাজশাহীর তানোরের হরিদেবপুর গ্রামে প্রতিবেশীর বাড়িতে পরিবেশবান্ধব চুলা তৈরি করে দিচ্ছেন কবুলজান
২০০৯ সালে রান্নাঘরের ধোঁয়া কমাতে ৫০০ টাকায় নিজ বাড়িতে তৈরি করেন পরিবেশবান্ধব চুলা। সেটি এখন ছড়িয়ে পড়েছে রাজশাহীসহ তিন জেলার আট উপজেলায়। কার্বন নিঃসরণ কমাতে রাজশাহীর তানোরের কবুলজান বেগম মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে এ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার পরিবেশবান্ধব চুলা তৈরি করে দিয়েছেন। এর মধ্যে বেশিরভাগই তৈরি করে দিয়েছেন বিনামূল্যে। পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন কৃষিবৈচিত্র্য শেখার কেন্দ্র। সেখানে সংরক্ষণ করছেন দেশি বীজের ১৪০টি জাত। ৬২ বছর বয়সী এই নারী এখন গ্রামীণ নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, টেকসই কৃষি ও স্থানীয় জ্ঞান সংরক্ষণে কাজ করছেন।
রাজশাহীর তানোরের হরিদেবপুর গ্রামের এই নারীর তৈরি চুলা ছড়িয়ে পড়েছে তানোর, গোদাগাড়ী, পবা ও মোহনপুর; নওগাঁর নিয়ামতপুর, মহাদেবপুর ও মান্দা এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার প্রায় ৯৫টি গ্রামে। রাজশাহী নগরের শ্রীরামপুর ও নামোভদ্রা এলাকার বস্তিতেও চুলা তৈরি করেছেন তিনি।
এই চুলায় কাঠ, খড় ও শুকনো পাতা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। চিমনি দিয়ে ধোঁয়া বাইরে বেরিয়ে যায়। ছিদ্রযুক্ত মাটির ঢাকনা ধোঁয়ার ক্ষতিকর কণা কমাতে সহায়তা করে। এই চুলায় জ্বালানি কম লাগে। রান্নাঘরে ধোঁয়া ও কালি জমে কম।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চুলায় পোড়ানো কাঠ, কয়লা ও ফসলের অবশিষ্টাংশের মতো কঠিন জ্বালানি থেকে নির্গত ধোঁয়া গৃহস্থালি বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস। স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার-২০২৫ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে এ ধরনের বায়ুদূষণের সঙ্গে বিশ্বে প্রায় ২৮ লাখ মানুষের মৃত্যুর সম্পর্ক ছিল। এই দূষণ হৃদরোগ, স্ট্রোক, নিউমোনিয়া ও দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। আর কবুলজানের পরিবেশবান্ধব চুলা এসব রোগের ঝুঁকি থেকে মানুষকে রক্ষা করছে।
কবুলজান আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘২০০৮ সালে উন্নয়নকর্মীদের থেকে কার্বন নিঃসরণ কমাতে পরিবেশবান্ধব চুলা তৈরির প্রশিক্ষণ পাই। প্রথমে নিজের জন্য চুলা তৈরি করেছি ২০০৯ সালে। এরপর আশপাশের প্রায় ২৫০টি বাড়িতে গিয়ে বিনামূল্যে চুলা তৈরি করে দিয়েছি। বর্তমানে রাজশাহী জেলা ছাড়াও নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জে গিয়েও এই চুলা তৈরি করছি। পরিবেশের জন্য আমৃত্যু এটি করে যাব।’
তিনি যোগ করেন, ‘এ পর্যন্ত আমার তৈরি করা প্রায় ১০ হাজার চুলার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি বিনামূল্যে করে দিয়েছি। অনেক সময় খুশি হয়ে কেউ ৫০-১০০ টাকা যাতায়াত ভাড়া দিলে সেটি নিতাম। কারণ আমার উদ্দেশ্য-পরিবেশবান্ধব চুলার বিপ্লব ঘটিয়ে সাধ্যমতো কার্বন নিঃসরণ কমানো।’
তার এমন উদ্যোগ স্থানীয় প্রশাসন ও উন্নয়নকর্মীদের নজরে আসার পর বিভিন্ন উদ্ভাবনী মেলায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পান তিনি। পরে যুক্ত হন উন্নয়ন সংস্থা বারসিকের সঙ্গে।
উন্নয়ন সংস্থা বারসিকের রাজশাহী আঞ্চলিক সমন্বয়ক মো. শহিদুল ইসলাম বলেছেন, ‘তার তৈরি চুলা সহজ, সাশ্রয়ী এবং রান্নাঘরকে স্বাস্থ্যকর রাখতে সহায়ক।’
প্রতিবেশী বাণী রাণী সূত্রধর বললেন, ‘কবুলজানের তৈরি চুলায় ঘরের ভেতরের ধোঁয়া থেকে মুক্তির উপায় পেয়ে আমরা সত্যিই খুশি।’
সরেজমিনে দেখা যায়, চুলা তৈরির পাশাপাশি তার বাড়িতে কৃষি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে রয়েছে ফুল, ফল, সবজি, ঔষধি ও বুনো গাছের ১২১টি প্রজাতি। সংরক্ষণ করছেন দেশি বীজের ১৪০টি জাত। এ ছাড়া ২০১৫ সালে প্রায় ২০০ নারীকে নিয়ে গড়ে তোলেন হরিদেবপুর নারী সংগঠন।
১৯৭৮ সালে ১৪ বছর বয়সে বিয়ে হয় কবুলজানের। পড়াশোনা প্রাথমিক পর্যন্ত। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৬ সালে পেয়েছেন জয়িতা পুরস্কার। গত ১৫ অক্টোবর গ্রামীণ নারী দিবসেও পেয়েছেন বিশেষ সম্মাননা।



