বছরে রাজস্ব ক্ষতি ২০ কোটি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নিবন্ধন নেই, ফিটনেসের মেয়াদও পেরিয়েছে, তবু বগুড়ার সড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে হাজার হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা। নতুন নিবন্ধনের পথ বন্ধ থাকলেও এসব যানবাহন চলাচল থেমে নেই। এতে একদিকে সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে অনিবন্ধিত যানবাহন নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাব অনুযায়ী, এ খাতে বছরে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি অন্তত ২০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) বগুড়া কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় নিবন্ধিত সিএনজিচালিত অটোরিকশা রয়েছে ৭ হাজার ৭৫৮টি। তবে দপ্তরটির হিসাবে, জেলায় প্রায় ২০ হাজার অটোরিকশা চলাচল করে। সেই হিসাবে নিবন্ধনহীন অটোরিকশার সংখ্যা ১২ হাজার ২৪২টি। যদিও পুলিশ, বিআরটিএ ও মালিক সমিতির সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, জেলায় চলাচলকারী অটোরিকশার প্রকৃত সংখ্যা ৩০ হাজারের কাছাকাছি।
বিআরটিএ বলছে, একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশার নিবন্ধন ও ট্যাক্স টোকেন বাবদ সরকারি খরচ প্রায় ১০ হাজার ৬০০ টাকা। এই হিসাব ধরে ১২ হাজার ২৪২টি অনিবন্ধিত অটোরিকশা নিবন্ধিত না হওয়ায় সরকারের এককালীন রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১২ কোটি ৯৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। নিবন্ধিত ৭ হাজার ৭৫৮টি অটোরিকশার ফের নবায়ন করা হয়নি। ফিটনেস নেই অধিকাংশের। এই হিসাবে বছরে সরকারি রাজস্ব ঘাটতি থাকছে অন্তত ২০ কোটি টাকা।
সাধারণ যানবাহনের মতো ইচ্ছা করলেই সিএনজিচালিত অটোরিকশার নিবন্ধন নেওয়ার সুযোগ নেই। এজন্য জেলা আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির (আরটিসি) অনুমোদন প্রয়োজন। জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের এই কমিটিতে বিআরটিএ, মোটর শ্রমিক সংগঠন ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা থাকেন।
বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে নতুন করে আরটিসি কমিটির কার্যক্রম না থাকায় ব্যক্তিপর্যায়ে নিবন্ধন দেওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে। সর্বশেষ ২০২৩ সালে আরটিসির বৈঠকে বেসরকারি সংস্থা টিএমএসএসকে ২০০টি অটোরিকশার নিবন্ধন দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এরপর নতুন নিবন্ধনের উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগের তথ্য পাওয়া যায়নি।
বিআরটিএর দাবি, জেলায় সর্বোচ্চ ১০ হাজার অটোরিকশা চলাচলের সক্ষমতা রয়েছে; কিন্তু বাস্তবে এর চেয়ে অনেক বেশি যানবাহন সড়কে চলছে। ফলে নিবন্ধন দেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ থাকা এবং যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার মধ্যে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের ব্যবধান।
নিবন্ধন না থাকলেও বগুড়ার বিভিন্ন সড়কে নির্বিঘ্নে চলাচল করছে এসব অটোরিকশা। চালকদের অভিযোগ, সড়কে চলাচল করতে তাদের মাসে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে হয়, যা তাদের ভাষায় ‘মান্থলি’। অভিযোগ রয়েছে, মোটর শ্রমিক সংগঠন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে এই টাকা তোলা হয়। বিনিময়ে মামলার হয়রানি থেকে সুরক্ষা পাওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয় চালকদের।
চালকদের ভাষ্য, নিবন্ধন না থাকলেও সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলে সড়কে চলাচলে বড় সমস্যা হয় না। ধুনটের বাসিন্দা হলেও বগুড়া শহরে অটোিরকশা চালান শামীম। তার ভাষায়, তিন বছর আগে তিনি একজনের কাছ থেকে নম্বরসহ একটি অটোরিকশা কিনেছেন। তবে সেটির ডিজিটাল নম্বর প্লেট নেই। অনেক অটোরিকশারই নিবন্ধন নম্বর ও নবায়ন হালনাগাদ নেই।
বগুড়া জেলা সিএনজি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মমিনুল হক মঞ্জুর দাবি, নিবন্ধন না থাকায় অনেক চোরাই অটোরিকশা জেলায় ঢুকে পড়ছে। তার মতে, নিবন্ধনের ব্যবস্থা থাকলে অনিবন্ধিত যানবাহন শনাক্ত করা এবং চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হতো। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি চেইন মাস্টারদের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন।
বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ বলছে, অনিবন্ধিত ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। বগুড়া জেলা বিআরটিএর সহকারী পরিচালক হারুন অর রশিদের ভাষ্য, জেলায় নিবন্ধিত ৭ হাজার ৭৫৮টি অটোরিকশার অধিকাংশেরই ফিটনেস হালনাগাদ নেই। নিয়মিত অভিযান চালানো হয় এবং এসব অভিযানে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা উপস্থিত থাকেন।
অটোরিকশা মালিকরা বলছেন, নিবন্ধন ও ফিটনেস হালনাগাদ না থাকলে কোনো অটোরিকশার মালিকানা, কারিগরি সক্ষমতা এবং আইনগত বৈধতা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে নিবন্ধন প্রক্রিয়া বন্ধ থাকা, পর্যাপ্ত তদারকির অভাব এবং সংগঠনকেন্দ্রিক অর্থ আদায়ের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নিবন্ধন প্রক্রিয়া কার্যকর করা, বিদ্যমান যানবাহনের তথ্য যাচাই, ফিটনেস ও নবায়ন নিশ্চিত করা এবং অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে সড়কে চলাচলকারী প্রতিটি অটোরিকশার আইনগত অবস্থান যাচাইয়ে বিআরটিএ, পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বগুড়া পুলিশের মিডিয়া মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) মো. আতোয়ার রহমানের দাবি, জেলায় প্রয়োজনের তুলনায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা বেশি। পুলিশ তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। তবে তিনি মনে করেন, জনসাধারণের যাতায়াতের জন্য এসব যানবাহনের প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে।





