Agamir Somoy E-Paper
রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬
আগামীর সময়
রোগীর সেবাই সালমানের নেশা
রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬
আগামীর সময়
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • বিচিত্রা
  • চাকরি
  • ছবি
  • সাহিত্য
  • বিবিধ
  • ধর্ম
  • প্রবাস
  • ফ্যাক্টচেক
  • সোশ্যাল মিডিয়া
  • ধন্যবাদ
  • বিশেষ সংখ্যা
  • সর্বজনের গল্প
  • বিশেষ লেখা
EN
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • ইপেপার
  • EN
লোড হচ্ছে…

প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : আবদুস সাত্তার মিয়াজী

সম্পাদক : মোস্তফা মামুন

আগামীর সময়
আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগশর্তাবলিগোপনীয়তাআমরা

ইডিবি ট্রেড সেন্টার (লেভেল-৬ ও ৭), ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ানবাজার, ঢাকা-১২১৫

যোগাযোগ: ০৯৬৬৬ ৭৭১০১০

বিজ্ঞাপন: ০১৭৫৫ ৬৫১১৬৪

[email protected]

স্বত্ব © ২০২৬ | দৈনিক আগামীর সময়

আগামীর সময় সাহিত্য

শুভ জন্মদিন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়

কথাকারের মোড়কে আদতে এক ক্ষ্যাপা কবি

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন
agamir somoy
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ২০:১১
কথাকারের মোড়কে আদতে এক ক্ষ্যাপা কবি

২০১৭ সালে কলকাতা বইমেলায় আজকালের স্টলে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতির সামনে লেখক

‘লেখার কথা বলবে লোকে, লেখক নয়’— এই একটি বাক্য সারাজীবন ধরে বহন করেছেন তিনি। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখ থেকে শোনা এই নির্দেশ যেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যজীবনের মন্ত্র হয়ে উঠেছিল। ১৯৩৩ সালের ২৫ অক্টোবর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করা এই মানুষটি ২০০৫ সালের ১২ ডিসেম্বর চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন এমন এক সাহিত্যভুবন যা আজও পাঠককে হতবাক করে, চ্যালেঞ্জ করে, ভাবায়। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে একজন কবি লিখেছিলেন— ‘তিনি যুদ্ধকালীন বিমানবন্দরের মতো। যুদ্ধের সময় অতিব্যবহৃত, কিন্তু শান্তির সময় সেখানে কোনো বিমান নামে না’। এই উপমা কত নিখুঁত! সন্দীপন সর্বদা সমকালের বাইরে, সমকালের বিরুদ্ধে, সমকালকে অস্বীকার করে চলা এক লেখক। যারা তার সময়ে জনপ্রিয়তার সিঁড়ি বেয়ে উঠছিলেন, তিনি সেই সিঁড়িটাই ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন।

জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতে পছন্দ করতেন— লেখাপড়া যত্রতত্র। পেশাগত সূত্রে জড়িত ছিলেন কলকাতা কর্পোরেশনের সঙ্গে। জড়িত ছিলেন একটি জনপ্রিয় বাংলা দৈনিকের সঙ্গেও। কিন্তু এই সাধারণ পরিচয়ের আড়ালে তিনি ছিলেন এক অসাধারণ সাহিত্যিক, যিনি বাংলা সাহিত্যের গতিপথ চিরতরে বদলে দিয়েছিলেন আর তার পরে কথাসাহিত্য করতে আসাদের রাস্তায় যেন বিছিয়ে দিয়েছিলেন নানাবিধ প্রশ্নের কাঁটা।

সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ( (২৫ অক্টোবর, ১৯৩৩ — ১২ ডিসেম্বর, ২০০৫) আঁকা: দেবব্রত পালনতুন সাহিত্যভাষার নির্মাতা

সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের ‘আভাঁ গার্দ’ লেখকদের অন্যতম। মাত্র ২১টি উপন্যাস, ৭০টি গল্প এবং শতাধিকসন্দেহ বা সংখ্যাতিরিক্ত নিবন্ধ লিখে তিনি প্রমাণ করেছেন— সাহিত্যের মান পরিমাপ হয় সংখ্যায় নয়, ভাষার নতুনত্বে। তার প্রথম উপন্যাস ‘একক প্রদর্শনী’ প্রকাশিত হয় ১৯৭১ সালে। কিন্তু তার আগেই ‘ক্রীতদাস ক্রীতদাসী’ (১৯৬১) দিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যে প্রবেশ করেন এবং সেই প্রবেশটাই ছিল এক বিস্ফোরণের মতো। তার রচনায় বিজ্ঞাপনের ভাষা, মান্যভাষা, ইতরামি ও রকের ভাষা— কোনটাই তার কাছে ব্রাত্য ছিল না। তিনি সাহিত্য প্রস্তাবে অস্বীকার করেছিলেন সাহিত্যের ক্লিশে ভাষা আর প্রথাগত নির্মাণকে।

‘ক্রীতদাস ক্রীতদাসী’র দ্বিতীয় গল্প ‘আট বছর আগের একদিন’ (১৯৬২)-এ তিনি যে পিঁপড়ের প্রতীক ব্যবহার করেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে চিরস্মরণীয়। জলের বূহ্যবন্দী পিঁপড়েটির আর্তচিৎকার— যাকে বিজন শুনতে পায় তার প্রত্যাখ্যানের আট বছর পর। মণিমালা তাকে বিয়ের কনে দেখতে আসা সেই সন্ধ্যায় প্রত্যাখ্যান করেছিল। অসত্য বলে নয়, নিজেকে লুকিয়ে। সেতার আর গানের কথা লুকিয়ে। বিজন প্রতিশোধ নেয়— জল শুকিয়ে গেলে ধীরে ধীরে হত্যা করে পিঁপড়েটিকে। পা ছিঁড়ে দেয়। আহত পিপীলিকা লেংচাতে লেংচাতে টেবিল পার হয়। বিজন মনে মনে বলে, বাড়ুক প্রতিরোধ স্পৃহা। বাড়ুক হিংসা। বাড়ুক অবর্ণনীয় বেদনাবোধ। আত্মহনন ছাড়া ওর প্রতিহিংসা চরিতার্থ হবে না কোনোদিন। মৃত্যুর মুহূর্ত পর্যন্ত ওর সবই মনে থাকবে।

সমবেত প্রতিদ্বন্দ্বী। বাঁ দিক থেকে দীপক মজুমদার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়, পেছনে উৎপল রায়চৌধুরী ও শক্তি চট্টোপাধ্যায়। ছবি: পূর্ণেন্দু পত্রীএই গল্পের ভাষা— যেন খেলার রিলে রেস। কিংবা অগ্নিপ্রজ্জ্বলিত বাজি, খুব দ্রুত পুড়ে যাচ্ছে। সেই দ্রুততা ভাষায়ও এসে যাচ্ছে। ভাষা সম্পূর্ণ হতে পারছে না। নায়কের রিলে রেসের ভাষাও জ্বলে যাচ্ছে। শুধু একটা বই শেষ পর্যন্ত পুড়ল না। সন্দীপন তারাশঙ্করকে বলেছিলেন এই গল্পের কথা। তারাশঙ্কর খর্বকায় হলেও খুব উঁচু হয়ে গিয়ে ঘাড় নেড়ে বলেছিলেন— অ্যাডভোকেসি কোরো না। লেখার কথা বলবে লোকে। লেখক নয়। সেই দুটি কথাই জীবনের অমূল্য নির্দেশ হয়ে ছিল সন্দীপনের জন্য। আমাদের জন্যও হতে পারে। বা এর বিপরীতটাও। কিংবা সন্দীপনের বলা— লেখার বিষয়? তা চলে আসবে ভাষার পেছনে। যেমন গরুর পেছনে লাঙ্গল? হ্যাঁ। লেখকের তখন কাজ কেবল শুধু লাঙ্গলের খোঁটা চেপে ধরে লক্ষ্য করে যাওয়া।

অন্তর্গত মনোলগের জাদুকরী কথনশৈলী

সন্দীপনের গল্প বা উপন্যাসের কথনের ভিত্তি ইন্টারনাল মনোলগ। স্বগত একটা ভাষা তিনি তৈরি করেছিলেন যেখানে তার চরিত্রগুলো ক্যালাইডোস্কোপের মতো তাদের মানসিক অবস্থার উচ্চারণ করে চলেছে। কমলকুমার-এর প্রভাব তার লেখার শুরুর দিকে অত্যন্ত স্পষ্ট। কমলকুমারের রুক্মিণীকুমার আর বিজনের রক্তমাংসের কথনশৈলীতে ভীষণ মিল। কারণ নাগরিকতার দোলাচলে গল্পের কালপঞ্জিগত কথনের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে নাম চরিত্রের মানসিকতা ও জীবনযাপনের ভঙ্গুর দিকগুলো। 'বিজনের রক্তমাংস', 'ক্রীতদাস ক্রীতদাসী' বা 'আমি আরব গেরিলাদের সমর্থন করি'-তে তার লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য এটা। কথনের ঘটনাক্রমকে গুরুত্ব না দিয়ে এই যে রচনাশৈলী— এটা নিছক স্টাইলাইজেশন নয়। আসলে গদ্যে যত এই ঘটনাক্রমের থেকে দূরত্বে যাওয়া যায় কথনটা তত মেটাফর বা উপমার কাছে চলে আসে। ফলে গদ্য আর কাব্যের ভাষাগত বাঁধ ভেঙে যায়। সন্দীপন এ বিষয়ে ওয়াকিবহাল ছিলেন।

আলোবাতাস সন্দীপন সংখ্যায় প্রকাশিত ক্যারিক্যাচারসন্দীপনের পাঠক জানেন যে কীমত বাংলা সাহিত্যের ভক্ত পাঠক ছিলেন তিনি। বঙ্কিমকে তিনি মনে করতেন শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক, এবং তার উপন্যাস যে কাব্যের কতটা কাছাকাছি— এ স্বীকারোক্তি করতেও ভোলেন না। সেই বঙ্কিম যাকে আমরা প্রতিক্রিয়াশীল বলে বাদ দিয়ে দিয়েছি, তার সম্পর্কে জানালেন— 'পৃথিবীতে বাংলাই একমাত্র সাহিত্য যার প্রথম ঔপন্যাসিকই দেখা দিলেন সেই ভাষা-মর্ম নিয়ে যা কবিতার। ... যা পাবার জন্য ইউরোপকে প্রায় ৪০০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল...।' সন্দীপনের নিজের ভাষা কতদূর কবিতা-সম্পৃক্ত দেখুন—

‘আজ তার মশারিতে একটাও মশা নেই। আজ বাড়ি ফিরে, তারপর বাড়ি থেকে বেরিয়ে, সে চলে গিয়েছিল অদূরে – লেভেলক্রশিং-এর ওপারে। সম্পূর্ণ অচেনা সেলুনে সহসা ঢুকে শান্ত ও নিস্তব্ধভাবে সে কামিয়ে নিয়েছে তার শেষ কয়েক মাসের সর্বনাশা দাড়ি।’ (নিদ্রিত রাজমোহন, সমবেত প্রতিদ্বন্দ্বী ও অন্যান্য)

এ ক্ষেত্রে কথনের ঘটনাক্রমের কার্যকারণ সম্পর্ক ও ইউনিটি অফ টাইম একেবারেই ঢিলে। এই গল্পের রস পেতে গেলে পাঠককে কবিতার ক্ষেত্রে যে ভাবে আমরা বুঝি সে ভাবেই রাজমোহন নামের চরিত্রটিকে অনুধাবন করতে হবে। সোজাসাপ্টা গল্প হিসেবে পড়তে গেলে হোঁচট খাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের কিছু বইতবে বাঙালি পাঠকের একটা বড় দোষ যে কোনো লেখাই একটু আবেগপূর্ণ, উদাস উদাস, রুখু রুখু ব্যাপার থাকলেই কাব্যিক বলে দেন। যেমন সমরেশ বসুর 'কোথায় পাবো তারে'— ভাষাগতভাবে উপমা নির্ভর নয় বরং ঋজু কথন, তবুও তাতে কাব্য খুঁজতে হবে। সন্দীপনকে সে গোত্রে ফেলা যাবে না কিন্তু। 'ক্রীতদাস ক্রীতদাসী' দেখুন— একটা প্রেমের গল্প, অন্তত কাহিনীর প্রেক্ষিত সেটাই। কিন্তু ওই পর্যন্তই। এবং বারবার দেখা গেছে সন্দীপনের কোনো চরিত্র যখন প্রেমিকার সঙ্গে কোর্টশিপ করছে (এখনকার ভাষায় ফ্লার্ট) তখন চরিত্রের মুখের কথা আর মনের ভাবনা এক নেই।

অপবাদ রয়েছে সন্দীপনের নারীরা সব পাউটিং সুন্দরী। কিন্তু তাতে কিছু এলো গেল না। প্রেমের মধ্যে হিপোক্রেসি, রাগ, আবার ভাললাগা একসঙ্গে চরিত্রের মনের ভিতর খেলা করছে— তা ধরা পড়ে গেল সন্দীপনের আতস কাঁচে। প্রেম আর ফেরেব্বাজি যে একজন সাধারণ গড়পড়তা মানুষের মধ্যে থাকতেই পারে, তার যে ভীষণ প্রেমের সময় মদ খেতে, ঘুমিয়ে পড়তে, এমনকি পালিয়ে যেতেও ইচ্ছে করে— এটা সন্দীপন সাবলীলভাবে এনে ফেলেছিলেন আমাদের সামনে। নিজেদের আচরণের দিকে তাকালে সন্দীপনের এই সব ব্যাপারগুলো খামোখা চালাকি বলে মনে হবে না আমাদের। কারণ সন্দীপনের লেখায় চরম কোনো আবেগ নেই, যা থাকে ঈশ্বর বা শয়তান প্রেরিত মহামানবের। মুশকিল হল মহামানবদের নিয়ে উপন্যাস লেখা যায় না। সবাই রবীন্দ্রনাথ নন যে অমিত, গোরা, সন্দীপ— সব বিশালাকায় চরিত্র হাজির করবেন। দৈত্যদের দিনকাল নেই। ছ'ফুটের বাঙালি যেমন বিরল হয়ে যাচ্ছে তেমনি সে সব মানুষেরা আশপাশে নেই। সেক্ষেত্রে সন্দীপনের লেখায় ডোবা ছাড়া গত্যন্তর নেই।

সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের কিছু বইভাষা নয়, ভঙ্গি

সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন— ‘তথাকথিত জীবনানুগ অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ কত ঔপন্যাসিকের পসথুমাস মৃত্যু যে দেখলাম। শুধু ভাষা ছিল না বলে। আসলে হীরে থেকে যে আলো বেরোয় সেটাই হীরে। বহুকৌণিক পাথরটা নয়। তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না।’

কী কথা! যেন প্রেমিকার শরীর নয়, তার আচরণ, তার অন্তর্গত সুষমা— তাই হীরের দ্যুতি। তাই চাওয়া হচ্ছে। যেন ভাষা নয়, ভঙ্গি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সরল সরস গদ্যের বিপরীতে, অনায়াসে কমার পর কমা আর অযাচিতপ্রায় কিন্তু অর্থপূর্ণ যতিচিহ্নের ব্যবহারে সন্দীপন তার গদ্যকে আলাদা করে নিয়েছিলেন তার প্রিয় মানিক, তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণের থেকে।

সন্দীপন সুনীলদের আড্ডা, দেখুন তো চিনতে পারেন কাকে কাকে?সন্দীপন একই বাক্য দুইবার লিখে দুই রকম ব্যঞ্জনা তৈরি করতে পারতেন। একটি শব্দও উল্টেপাল্টে না দিয়ে। যেমন— ‘আপনাদের, যাঁদের গল্পটা ভাল লাগল, তারা অনুগ্রহ করে আমাকেও ভালবাসুন, কেননা, আমি ও আমার গল্প একই।’ এই বাক্যটি পরপর দুইবার পাঠ করলে পাঠকের মগজে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ কাজ করে। এই ছিল তার কারিগরি। এই ছিল তার জাদু। সন্দীপন বাক্যের মধ্যেও রেখে দিতে পারতেন নতুন নতুন পাঠ-সম্ভাবনা। কাহিনী কথনের পরম্পরাকে অগ্রাহ্য করেও তিনি লিখে ফেলতে পারেন ‘স্বর্গের নির্জন উপকূলে’, ‘অস্তিত্ব অতিথি তুমি’, ‘হিরোশিমা, মাই লাভ’, ‘আমি আরব গেরিলাদের সমর্থন করি’, ‘একক প্রদর্শনী’, ‘ধ্বংসের মধ্য দিয়ে যাত্রা’, ‘আমি ও বনবিহারী’— এমন সব উপন্যাস, যা আশ্চর্য করে না শুধু, চোখে কালো পট্টি বেঁধে পাঠককে প্রায় অন্ধভক্ত বানিয়ে ফেলতে চায়।

 কলকাতার দিনরাত্রি ও সাহিত্য-রাজনীতি

সন্দীপনের সময়ে সাহিত্যে রাজত্ব করছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়— আনন্দবাজারের জনপ্রিয়তা আর নিজঅর্জিত খ্যাতির কল্যাণে। সন্দীপন একবার স্বাভাবিক আলাপে কষ্ট দিয়ে বসেছিলেন সুনীলকে। সেই অপমানের কথা সন্দীপন চিঠিতে লিখেছেন— ‘অপমান করা আপনার সঙ্গত হয়েছিল কি হয়নি, সে-কথা ভাবছি না। কারণ, এটাই ভাবছি যে, অপমান হচ্ছে অপমান। এবং বন্ধুকে কেউ অপমান করে না।’

জীবনানন্দের কথা মনে পড়ে যায়! নৌবিহারে ডেকে হো-হো হাসাহাসি, কীর্তিনাশা নদীর বাঁকা জল, বন্ধুদের বঙ্কিম মুখ। জীবনানন্দের বন্ধুরাই তা করেছিল। সন্দীপনের ক্ষেত্রেও ঘটল। সমকাল চিরদিন বড়লেখকদের বুঝতে পারে না। পারেনি, পারছে না, পারবেও না। জীবনানন্দের সাথে সন্দীপনের মিলের জায়গাটা ঐ— জীবদ্দশায় সহলেখকদের তাচ্ছিল্যই অর্জন তাদের। সমকাল চিরদিন বড়লেখকদের যে বুঝতে পারে না, পারলো না, পারছে না, পারবে না— তার এক প্রমাণ যেনো!

আজকালের অনুষ্ঠানে, অভ্যাগতদের সঙ্গে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়। ছবি অমিত ধরতবে সন্দীপনের অর্জিত তাচ্ছিল্যের মাত্রা ছিল একটু বেশি। তার মৃত্যুর পর অদ্রীশ বিশ্বাস সম্পাদনা করে ডায়েরি প্রকাশ করলেন— শুনতে হলো, ‘এ এক সেক্স-প্রিডেটরের ডায়েরি’। অথচ সেই ডায়েরিতেই লেখা— ‘ঘুম থেকে উঠে ক্লান্ত লাগে এত। মিকি মাউসের কার্টুনে মিকির ওপর দিয়ে একটা রোলার চলে গেছে যেন। কাগজ হয়ে গেছি। ফুলে-ফেঁপে আবার মাউস হই। কী হল আমার।’ ২১ ডিসেম্বর ১৯৯৩-এর এই এন্ট্রি। এমন বাক্য হাতে নিয়ে সারারাত বসে থাকা যায়। এত যত্ন, এত গভীরতা, এত নিখুঁত পর্যবেক্ষণ— অথচ অভিযোগ সেক্স-প্রিডেটরের! বইয়ের ব্যাক কভারে লেখা হয়েছে— ‘দুঃসাহসী, অকপট, আনপ্রেডিক্টেবল। যা মনে করেছেন তাই লিখেছেন। গোটা বাংলা লেখালেখির জগৎকে ফালাফালা করেছেন। এমনকি বাদ যায়নি নিজেও। শুধু বিতর্কিত নয়, একই সঙ্গে গভীর, মননশীল, বুদ্ধিদীপ্ত।’

নিজের পাঞ্জা দিয়ে করা সন্দীপনের উপন্যাস সমগ্রের প্রচ্ছদযৌনতা, সাহস ও সততা

সন্দীপন সেক্সিস্ট ছিলেন। নিঃসন্দেহে ছিলেন। স্বঘোষিত সেক্সিস্ট। কিন্তু তিনি সেই দৃষ্টিভঙ্গি কখনো লুকোননি। বরং ডকুমেন্টেশন করেছেন। নির্মমভাবে লিপিতে লিপিতে লিখেছেন। নিজের প্রতি সহানুভূতি না দেখিয়েই। যৌনতাকে স্বাভাবিক ভেবে স্বাভাবিকভাবেই অ্যাপ্রোচ করেছেন। নিজের নিরহংকার নোংরামি-সমেত। সুনীলদের মতো পদতলে বসে কৃপাপ্রার্থী হতে চাননি নারীতনুর। এটাও মাথায় রাখা প্রয়োজন যে বাকিরা এই কাজটা করেননি; হাংরিরা যেমন পুরুষ ও প্রকৃতির বাইনারি টেনেছেন— এটা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েই যে পুরুষ এবং তার ‘শক্তি’-ও আসলে প্রকৃতি থেকেই সৃষ্ট।

‘স্বর্গের নির্জন উপকূলে’ (২০০৩)-তে তিনি কন্যা-পিতার যৌনতা, কন্যার প্রেমিকের প্রতি পিতার দৃষ্টিভঙ্গি— এমন মানবিক সংকটে ফেলে দিয়েছেন পাঠককে। ‘ডাবলবেডে একা’ (২০০১)-র মর্ষকামিতা, ‘আমি আরব গেরিলাদের সমর্থন করি’ (১৯৮৫)-র রাজনৈতিক সাহস— এমন এক মানুষের পক্ষেই সম্ভব লেখা যে তার জীবন থেকে যৌনবিবেচনা, প্রতিমুহূর্তে নারীকে বিচার করতে থাকার অভ্যাস বাদ দিয়েছে। যে আধুনিক মানুষ, যে মুক্তচিন্তার মানুষ, স্তনকে যে আদর করার কথাই ভাবে, যোনীকে কর্ষণ করার কথা, নারীকে ভালোবাসার কথা। যৌনতাকে অস্বীকার করার অশ্লীলতা যে করে না।

আলোবাতাস আয়োজিত অনুষ্ঠানের মঞ্চে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।এখানেই মনে পড়ে ‘ভারতবর্ষ’ (১৯৯৯) উপন্যাসের কথা। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বরের দুপুর। বাবরি মসজিদ ভাঙার দিন। সেই দুপুরে সঈদুল তার স্টুডিওর নিচে, নিজের বেডরুমে ধর্ষণ করেছে রাখিকে। রাখি জানত না, কিন্তু সঈদুল নিশ্চয় জানত দুপুরে কী ঘটে গেছে। গম্বুজের মাথা তখনই ভেঙে পড়েছিল। বিবিসি দেখেছিল সঈদুল। পরস্পরে মিলিত হওয়া আর সমস্তটা হিন্দু-মুসলমানের মতো হয়ে যাওয়া এক নয়। ফেরার সময়, ট্যাক্সিতে তুলে দেওয়ার সময়ও ক্ষমা চায়নি সঈদুল। রাখিকে বেডরুমে টেনে নিয়ে গিয়েছিল সে আত্মরক্ষার কারণে ট্রেঞ্চে ঢোকার মতো করে। তার দুই চোখ দিয়ে বেরিয়ে আসছিল আগুন ঝরানো বুলেট। তাকেও সে ভেঙেছিল যেন শাবল গাঁইতি দিয়ে, যেভাবে ভাঙা হয়েছিল গম্বুজ। শোধ নিয়েছিল সঈদুল। সে তখন আহত মুসলমান হয়ে গিয়েছিল। আসলে সেই দুপুরে সঈদুলের বেডরুমেও একটি দাঙ্গা হয়ে গিয়েছিল। অথচ এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। কী ভয়ানক এক মরণের কথা লিখেছিলেন সন্দীপন এই গল্পে। তার দেখার চোখ ছিল আলাদা। একজন আধুনিক মানবিক লেখকের মুখ আমি ওই গল্পে দেখতে পাই।

সেই দুপুরের পরে আর কী ঘটেছিল? ভারতবর্ষজুড়ে তখন দাঙ্গা বিস্তৃত হচ্ছিল। নিরীহ মানুষ মরছিল। কিন্তু রাখির ভেতরে সঞ্চারিত হচ্ছিল নতুন প্রাণ। সেই ৬ ডিসেম্বর রাখির কোনো প্রোটেকশন ছিল না। পিরিয়ড বন্ধ। সন্তান আসছে। সে সমস্তটা খুলে বলছে হেমাঙ্গকে। ভাবলেশহীন মুখে হেমাঙ্গ শুনে যাচ্ছিল ছয় ডিসেম্বরের দুপুরের কথা। সন্দীপনই এই লেখা লিখতে পারতেন। সন্দীপনের সেই ৬ ডিসেম্বরের ভারতবর্ষের জন্য আর একবার মাথা নুয়ে থাকি। আপনাকে না পড়ে এই ভারতবর্ষকে চেনা যায়?

সন্দীপন ও সুনীল, কিছু বন্ধুত্ব শর্তহীন, বহু সংঘর্ষ ও দ্বিমতসমেতপ্রেম, মমতা ও নিঃশব্দ মৃত্যু

সন্দীপন সেই প্রাণপূর্ণ প্রেমিকের জন্য লিখেছেন যে সমস্ত অবহেলা ও তাচ্ছিল্যের জবাবে মমতাকে চায়। এই মমতা আক্ষরিক অর্থে মমতা। আবার সমান্তরালে ‘ভারতবর্ষ’-এর চরিত্র মমতা। যে মমতাকে সঈদুল বিবিসিতে বাবরি মসজিদ ভাঙার দিন প্রকারান্তরে ধর্ষণ করে। যে মমতা সঈদুলকে শারীরিকভাবে চায়, অথচ ঘর নেই বলে যাদের যৌনতা হয় না। মমতার ভেতরটা ভেঙে দিতে দিতে সঈদুল সেদিন বিবিসিতে বাবরি মসজিদ ভাঙা দেখে।

‘হিরোশিমা মাই লাভ’ (১৯৮৯)-এ সেই প্রেমিক যুগল, যাদের সঙ্গমের জায়গা নেই। কবরখানার নির্জনতা যাদের একমাত্র সম্বল বেঁচে থাকার শহরে। ‘স্বর্গের নির্জন উপকূলে’-র সাড়ে তিন কিলো সাঁতরে একবার সঙ্গমের জন্য আসা নায়ক। মালাবার হিলস, মুম্বাইয়ের জুহু বিচের সৈকত, আন্দামান, শ্রীলঙ্কার ক্যান্ডির উপকূলজীবন— এর প্রায় প্রত্যেকটা লোকেশন আমি দেখে এসেছি। এই উপন্যাস আমার এতোই পছন্দ যে পাঠকের সাথে শেয়ার করার লোভ সংবরণ করতে পারছি না প্রায়। এই সব চরিত্ররা সন্দীপনের মাথার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে।

অনুষ্ঠানে বক্তৃতারত সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়সন্দীপন লিখেছেন— ‘সময় থাকতেই আমাদের প্রত্যেকের একা হয়ে যাওয়া উচিত। বড় ফাঁকা মাঠ বিশাল জনসমুদ্র একা পেরোনো উচিত। সবাই যদি নিজেকে এমন একা করে নেয় তাহলে কাউকে আর ভিড়ের মাঝখান থেকে তুলে নিতে হয়না। মৃত্যু একাকীত্বকে আলিঙ্গন করে, যদিও মৃত্যুকে এ কথা আমরা কোনদিন বলতে পারিনি...’

মৃত্যুকে তিনি আঁকতে আঁকতে জীবনের স্তব্ধতার দিকে পৌঁছে গেছেন। কালান্তক অসুখে। টের পেয়েছিলেন ঘণ্টা বেজে গেছে, এবার ঘুমন্ত বিড়ালের লেজে পা দেবে অন্ধ শিশুরা। তাতেই বিড়াল খ্যাঁক করে উঠে কামড়ে দেবে তার হাঁ-এর ভেতরে ঢোকা ইঁদুরের মাথা। সন্দীপন তার কালান্তক অসুখের বর্ষপূর্তি পালন করেছিলেন। চিয়ার্স হয়েছিল। এই আশ্চর্য ঘটনা কলকাতা শহরেই ঘটেছিল। সন্দীপন তার সদর দরজা খুলে দিয়েছিলেন আর কান পেতে ছিলেন মৃত্যু তার বুটপরা পা নিয়ে মশমশিয়ে ঢুকে পড়বে তার ফ্ল্যাটের ভেতর।

সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, বইয়ের ফ্ল্যাপে হাংরি আন্দোলন ও প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা

সন্দীপন হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। মলয় রায়চৌধুরী ও সমীর রায়চৌধুরী তাকে জানিয়েছিলেন তার লেখা তাদের ভালো লেগেছে। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের একটি গল্প তাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল— যে গল্পে একটি ছেলে তার ছাত্রীর আঁচলের খুঁট খেতে শুরু করে, তারপর ধীরে ধীরে পুরো শাড়ি, জানালা, চেয়ার, ছাপাখানা, নোটবুক, এমনকি এক হোটেলের সান্ত্রীকে খেয়ে ফেলে। গঙ্গার ধারে প্রেমিকার সঙ্গে বসে জাহাজ খেতে চায়, পারে না, তখন একটি চিরকুট গঙ্গায় ভাসিয়ে দেয়। এই গল্পই তাকে হাংরি আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। তিনি বলেছিলেন— এই গল্পটা আমাকে সেসময়ে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল এবং আমার মনে হয়েছে ক্ষুৎকাতর আন্দোলনের এটাই মূল কথা।

কিন্তু পরের দিকে ওরা তাকে না জানিয়ে তার নামে পত্রিকা বের করে। যা তাকে ক্ষুব্ধ করেছিল। তিনি মুচলেকা দিয়ে হাংরি আন্দোলন ত্যাগ করেন। দুটি কারণে— এক, তিনি পুলিশকে ভীষণ ভয় পান, দুই, তার বউ তাকে জেলে যেতে বারণ করেছিল। বউ বলেছিল, যে একেই তো তোমার মতো মদ্যপকে বিয়ে করার জন্য আমার আত্মীয় পরিজনরা সব আমার সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়েছে। তার ওপর তুমি যদি জেলে যাও তাহলে সোনায় সোহাগা হবে।

নিজের ঘরের দরজায় বসে আছেন লেখক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়। ছবি: অমিত ধর। সূত্র: আজকাল পত্রিকাসন্দীপন বলেছিলেন— ‘আমি মনে করি ওরকমভাবে দল পাকিয়ে সাহিত্য হয় না। একজন লেখক নিজেই অতীত, নিজেই ভবিষ্যত, নিজেই সমাজ, নিজেই সভ্যতা, এবং নিজেই সবকিছু। সাহিত্য সৃষ্টিতে দলের কোনো ভূমিকা থাকতে পারে না।’ প্রতিষ্ঠানের লোভ তার কোনোদিনই ছিল না। ভারত-বাংলাদেশে যদি কেউ আগাগোড়া প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার ভূমিকা পালন করে থাকে তবে তা তিনি। ‘বিজনের রক্তমাংস’ গল্পটি বেরোনোর পর থেকে তার সে ভূমিকা অব্যাহত ছিল আমৃত্যু।

উপমার রাজা, ছেনালীপনায় ভরা

সন্দীপন বলেছিলেন— উপমামাত্রই ছেনালিতে ভরা। মানে ছেনালি সহ্য না হলে সাহিত্য পড়তে এসো না! এই ছেনালি, এই পারভার্সন— এট ইটস বেস্ট। তবে যে লেখক আর্তনাদের কারণ ও উৎসসন্ধান করতে পারেন, তার বিবৃতিতে নয়, বরং সংশয়ে বিশ্বাস করতে চাই। সন্দীপন একটি স্বাভাবিক ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছেন— ‘ভদ্রলোকের গায়ে দামী শাল, পাশে অতীতে ঘুঁটে দিয়েছেন এমন মধ্যবয়সী গম্ভীর স্ত্রী, শোফারও গাড়ি এগিয়ে এনে দরোজা খুলে দাঁড়িয়েছে।’ পাঠক রসিক না হলে এই বয়ানের মর্মবাণী বুঝে নিয়ে মজাটা লুটতে পারবে না। বুঝবে না কেন অয়দিপাউস, কেন সর্বনাশ, কেন পৌষমাস!

জীবনের দিকে এই কৌতুকপূর্ণ চাহনিতে তাকাতে পারেন বলেই সন্দীপন লিখতে পেরেছেন। তিনি বলেছিলেন— ‘আমি প্রায় সবকিছুকেই মিথ্যা ও ভুল বলে ধরে নিয়েছি। সবচেয়ে বড় ভুল ও মিথ্যা বলে ধরে নিয়েছি আমার আন্তরিকতাকে। কোনো ভোর ভালো লাগলে, বা কোথাও গড়ের পিছনে সূর্যাস্ত দেখে মুগ্ধ হলে কোনদিন, কাঁধে হাত রেখেছি নিজের, সত্যি তো? নাকি বই পড়ে শিখেছো? জানতে চেয়েছি, বা, এইরকম প্রচলিত বলে ভালো লাগছে?’

সন্দীপ কুমারের তোলা সেই বিখ্যাত ভেঙ্চি কাটার ছবি, প্রথাগত সাহিত্যচর্চাকে এভাবেই ভেংচি কেটে গেছে সন্দীপনের লেখাএই Menschen-এর রিপুর পাশে দাঁড়ানো সন্দীপনকে পড়তে গেলে সজনীকান্ত বুঝতে হবে অনেকটা। ওই লেভেলের প্যারডি সেই সময় দাঁড়িয়ে সজনীকান্ত লিখেছিলেন। ভাবতে পারেন সজনীকান্ত প্রিয় বন্ধু মনোজ বসুকে একজায়গায় বর্ণনা করছেন বনজ মোষ বলে। এই উইটটা সকলে নিতে পারেন না। যেভাবে রবীন্দ্রনাথকে মাগীবাজ এবং শরৎচন্দ্রকে মাতাল আখ্যা দেওয়া হয় কিংবা জীবনানন্দকে অশ্লীল কবি, অনেকটা সেভাবেই এরা সন্দীপনকেও দাগিয়ে দেন, ‘সেক্স প্রিডেটর’। তবে তাতে, যে সন্দীপনকে ভালোবাসতে পারে, বাসতে পারে নিজস্ব বেশ্যাকে ভালো, তার কিছু আসে যায় না!

রিড সন্দীপন

সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ১৯৯৫ সালে বঙ্কিম পুরস্কার এবং ২০০২ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন ‘আমি ও বনবিহারী’ বইয়ের জন্য। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগত্তারিণী স্বর্ণপদকও লাভ করেছেন। কিন্তু এই পুরস্কারগুলো তার প্রতিভার সামনে নগণ্য।

তিনি বলেছিলেন— ‘সামাজিক ও ঐতিহাসিক উপন্যাস, রাজনৈতিক বা মনস্তাত্বিক— এরা এখন মৃত। এখন উত্তর-জীবনানন্দ আধুনিক উপন্যাসের যুগ। এখন বিষয় যৎসামান্য তথা কাজ একটাই। ব্যান্ডেজ খুলে রক্তঝরা ক্ষতস্থানটি দেখানো। সেটাই উপন্যাস।’

দেবব্রত ঘোষের আঁকা সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়সন্দীপন সেই ক্ষতস্থান দেখিয়েছেন। দেখিয়েছেন নির্লজ্জভাবে, নির্মমভাবে, অকপটে। তিনি লিখেছেন নিজের মনের সকল অন্ধকার, সকল আলো— একেবারে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে, অনায়াসে। এজরা পাউন্ডের মৃত্যুর পর প্রকাশিত এক বিশাল কমমেমোরিয়াল ভলিউমে সবাই দিস্তে দিস্তে লিখলো! শুধু এজরা পাউন্ড লিখেছিলেন পাঁচ লাইন। সন্দীপন সেই এজরা পাউন্ডের কথাই মনে করিয়ে দেন— ‘কে আর লন্ডনের অলি-গলি দিয়ে হাঁটার সময় অমন শুখা হিউমার করবে! আর ওর কবিতা নিয়ে কি আবার বলব। শুধু বলতে পারি: রিড হিম।’

আমার একটা কবিতার লাইন অনেকে স্ট্যাটাসে ঘুরতে দেখি— আমরা সবাই একলা, কেবল যৌথ থাকার ভান করি। একা না হলে দেখা হয় না যে, এই নির্মম সত্য সন্দীপন পাঠকের মগজে গজাল ঢুকিয়ে দিতে পারেন। সন্দীপন আমার প্রিয়তম, কারণ ভয়ে আতঙ্কিত জলের বূহ্য-বন্দী পিঁপড়ার আর্তচিৎকার কে আর শুনতেন এই আপাত ক্ষ্যাপাটে, জাতে মাতাল, তালেও স্বঘোষিত বেতাল এই বিরলপ্রজ লেখক ছাড়া!

প্রিয় লেখকের জন্মদিনে, এই মোর অঞ্জলি। রিড সন্দীপন, ইফ ইউ আর অ্যাট লিস্ট, ডাবলবেডে একা।

 তথ্যসূত্র

১. সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের ডায়েরি — সম্পাদনা: অদ্রীশ বিশ্বাস। এই ডায়েরি থেকে ‘মিকি মাউসের কার্টুন’ এন্ট্রি (২১ ডিসেম্বর ১৯৯৩), ‘সময় থাকতেই আমাদের প্রত্যেকের একা হয়ে যাওয়া উচিত’ উদ্ধৃতি, এবং ‘আমি প্রায় সবকিছুকেই মিথ্যা ও ভুল বলে ধরে নিয়েছি’ উদ্ধৃতি নেওয়া হয়েছে।

২.প্রতিক্ষণ প্রকাশিত সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের পঞ্চাশটি গল্প — ২০০৫ সালের ১২ ডিসেম্বরের পর প্রকাশিত। এখান থেকে ‘বিজনের রক্তমাংস’ গল্পের বিশদ বিবরণ নেওয়া হয়েছে।

৩.’গদ্য পদ্য সংবাদ’ পত্রিকা, অক্টোবর ১৯৮৬ সংখ্যা — সম্পাদনা: সুমিতাভ ঘোষাল। এখানে প্রকাশিত হয় ‘সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়: কেন মুচলেকা দিয়ে হাংরি আন্দোলন ত্যাগ করেন তার ব্যাখ্যা’। হাংরি আন্দোলন, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের গল্প, মুচলেকার কারণ— এসব তথ্য এখান থেকেই নেওয়া।

৪. অমর মিত্রের লেখা ‘নতুন সাহিত্য ভাষার নির্মাতা সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়’ — এখান থেকে ‘ক্রীতদাস ক্রীতদাসী’র প্রকাশকাল, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উক্তি, এবং সন্দীপনের কালান্তক অসুখের বর্ষপূর্তি পালনের ঘটনা নেওয়া হয়েছে।

৫. আজকাল পত্রিকার সংগ্রহ — সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের ছবি এবং ‘স্বর্গের নির্জন উপকূলে’ উপন্যাসের আলোচনা সূত্র।

6. সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের চিঠি (দেবী রায়কে লেখা), ৩ ডিসেম্বর ১৯৬৩ — এখান থেকে ‘উৎপল’, ‘সুনীল’, ‘শক্তি’ প্রসঙ্গ এবং সন্দীপনের ব্যক্তিগত জীবনযাপনের আভাস নেওয়া হয়েছে।

৭.সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে লেখা সন্দীপনের চিঠি — ‘অপমান করা আপনার সঙ্গত হয়েছিল কি হয়নি’ উদ্ধৃতিটি এখান থেকে নেওয়া।

৮. তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সন্দীপনের কথোপকথন — ‘লেখার কথা বলবে লোকে, লেখক নয়’ এবং ‘অ্যাডভোকেসি কোরো না’ উদ্ধৃতি দুটি এই কথোপকথন থেকেই নেওয়া, যা সন্দীপনের ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ।

৯. সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমগ্র — আজকাল প্রকাশিত, প্রায়-আর্টপেপারে ছাপা। এখান থেকে সমস্ত উপন্যাসের তালিকা ও প্রকাশকাল নেওয়া হয়েছে।

১০. ছোটগল্প সংকলন — ক্রীতদাস-ক্রীতদাসী, সমবেত প্রতিদ্বন্দ্বী ও অন্যান্য, হ্যাঁ প্রিয়তমা, এক যে ছিল দেয়াল, সোনালী ডানার ঈগল।

সাহিত্যসন্দীপন চট্টোপাধ্যায়শিমুল সালাহ্উদ্দিন
    আগামীর সময় ইপেপার
    শেয়ার করুন:
    মডেল-অভিনেত্রী তুলনা মারা গেছেন

    মডেল-অভিনেত্রী তুলনা মারা গেছেন

    সৌদিতে চাকরির প্রলোভনে নারীকে নিয়ে বিক্রি, চাচাতো ভাই গ্রেপ্তার

    সৌদিতে চাকরির প্রলোভনে নারীকে নিয়ে বিক্রি, চাচাতো ভাই গ্রেপ্তার

    ‘মব করতে নয়, গিয়েছিলাম বিচার চাইতে’

    ‘মব করতে নয়, গিয়েছিলাম বিচার চাইতে’

    আসিফকে টার্গেট করেই গুলি, শুটাররা আসে মগবাজার থেকে

    আসিফকে টার্গেট করেই গুলি, শুটাররা আসে মগবাজার থেকে

    স্বামীর বিষপানে বাধা দিতে গিয়ে পড়ল স্ত্রীর মুখেও, দুজনই হাসপাতালে

    স্বামীর বিষপানে বাধা দিতে গিয়ে পড়ল স্ত্রীর মুখেও, দুজনই হাসপাতালে

    ‘সময় কখনো সাদাকালো, কখনো রঙিন’ লিখে চলে গেলেন এসআই মিজান

    ‘সময় কখনো সাদাকালো, কখনো রঙিন’ লিখে চলে গেলেন এসআই মিজান

    মাদ্রাসায় মেয়ের সঙ্গে কী ঘটেছিল, জানালেন মা

    মাদ্রাসায় মেয়ের সঙ্গে কী ঘটেছিল, জানালেন মা

    সাঈদীর মামলার বাদী মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ দাফনে বাধা জামায়াতের

    সাঈদীর মামলার বাদী মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ দাফনে বাধা জামায়াতের

    পদ্মা যমুনায় এক সেতু রেললাইন ছাড়া

    পদ্মা যমুনায় এক সেতু রেললাইন ছাড়া

    ‘চিরদিন রাখবে মনে এমন সময় কারও নেই’

    ‘চিরদিন রাখবে মনে এমন সময় কারও নেই’

    সংগীতশিল্পী আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলি

    সংগীতশিল্পী আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলি

    টঙ্গীতে গাড়ির ধাক্কায় বাবা ও ছেলে নিহত

    টঙ্গীতে গাড়ির ধাক্কায় বাবা ও ছেলে নিহত

    মামলা হলে আমাকে যেন প্রধান আসামি করা হয় : রুমিন ফারহানা

    মামলা হলে আমাকে যেন প্রধান আসামি করা হয় : রুমিন ফারহানা

    থানার দেড় কিলোমিটার দূরে ছিনতাই, পুলিশ জানল ফেসবুক দেখে

    থানার দেড় কিলোমিটার দূরে ছিনতাই, পুলিশ জানল ফেসবুক দেখে

    বাবার বাড়ি থেকে নাস্তা কম পাঠানোয় অন্তঃসত্ত্বাকে মারধর, ৯ দিন পর মৃত্যু

    বাবার বাড়ি থেকে নাস্তা কম পাঠানোয় অন্তঃসত্ত্বাকে মারধর, ৯ দিন পর মৃত্যু