একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
বাংলা প্রথম পত্র

বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ: পাঠ পদ্ধতি, পর্ব-১
অনেক শিক্ষার্থীর মতে, মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত ‘বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ’ কাব্যাংশটির পাঠ অত্যন্ত কঠিন। আপাতদৃষ্টিতে দুরূহ মনে হলেও একটু সময় ও কৌশল অবলম্বন করলে বিষয়টি আয়ত্তে আনার পাশাপাশি সাহিত্যের রসও আস্বাদন করা যায়।
শুরুতেই পাঠ্যবই থেকে লেখক পরিচিতির সম্পূর্ণ অংশ শিখে নিতে হবে। কবির জন্ম-মৃত্যু সন, জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা, তার সাহিত্যের মূল প্রবণতা সযত্নে জেনে নিয়ে মনে রাখতে হবে। লেখক পরিচিতি আয়ত্তে আনার পর পাঠ্যবইয়ে উল্লিখিত শব্দার্থগুলো জেনে নেওয়াটা খুবই দরকার। এর বাইরে অজানা শব্দগুলোর অর্থও অভিধান থেকে জানতে হবে। সমাপনীসহ উচ্চমাধ্যমিকের বিভিন্ন পরীক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা, বিবিধ চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় পাঠ্যবইয়ের লেখক পরিচিতি ও শব্দার্থ থেকে প্রশ্ন আসে বলে যাদের এসব তথ্য আয়ত্তে থাকে, তারা সহজেই পার হতে পারে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা ও চাকরির কঠিন বৈতরণী।
‘বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ’ কাব্যাংশটুকু নেওয়া হয়েছে মধুসূদন দত্ত রচিত ১৮৬১ সালে প্রকাশিত বাংলা সাহিত্যের সার্থক মহাকাব্য ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ থেকে। এর মানে উচ্চমাধ্যমিক স্তরের বিদ্যার্থীরা এ কাব্যাংশ পড়ে মহাকাব্য পাঠের স্বাদ নিতে পারবে। বাল্মীকি বিরচিত সংস্কৃত ভাষার মহাকাব্য ‘রামায়ণ’-এর পটভূমি, কাহিনি ও চরিত্রের সঙ্গে অনেকটা মিল রয়েছে ‘মেঘনাদবধ কাব্য’র। তবে মধুসূদনের কৃতিত্ব ‘রামায়ণ’-এর কাহিনির সঙ্গে মিল বা সাদৃশ্যের কারণে নয়; বরং মধুকবির স্বাতন্ত্র্য অমিল বা বৈসাদৃশ্যের কারণে।
‘রামায়ণ’-এর নায়ক রাম অবতারতুল্য আর রাবণ অসুর বা অপদেবতাতুল্য। কিন্তু ‘মেঘনাদবধ কাব্য’র প্রধানতম চরিত্র বা নায়ক দশানন রাবণ; রাম ও লক্ষ্মণ মধুসূদন দত্তের কাব্যে ভিখারি, তস্কর বা প্রতারক হিসেবে উপস্থাপিত। আর এখানটাতেই মধুসূদন দত্তের বিদ্রোহ এবং তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রথম বিদ্রোহী কবি।
‘মেঘনাদবধ কাব্য’ রাজনৈতিক ও নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহে ইংরেজরা বহিরাগত ও সিপাহিরা আমাদের দেশীয় বীর। দেশপ্রেমিক কবি মধুসূদন রাম-রাবণের যুদ্ধকে রূপক হিসেবে উপস্থাপন করে সিপাহি বিদ্রোহের মাত্র তিন বছর পর প্রকাশ করেছেন তার মহাকাব্যটি। এখানে ভারতবর্ষে আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দে আগত আর্যগোষ্ঠীর প্রতিনিধি রাম, লক্ষ্মণ, সীতার সঙ্গে সাদৃশ্য রয়েছে বেনিয়া ইংরেজদের। আর রাবণ, কুম্ভকর্ণ, বীরবাহু, বিভীষণের পক্ষ লঙ্কাবাসী দেশীয় অনার্যদের প্রতিনিধি।
‘মেঘনাদবধ কাব্য’-তে রাম-রাবণের যুদ্ধ মূলত বহিরাগত আর্য ও দেশীয় অনার্যদের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধ। এবং এ কাব্যের নায়ক দেশপ্রেমিক রাবণ। মধুসূদন দত্তের পক্ষপাত দেশপ্রেমিক রাবণের প্রতি। রাবণনন্দন মেঘনাদের প্রতি। আলোচ্য কবিতাংশে রাবণের ভাই বিভীষণ নিজ পক্ষ ত্যাগ করে রামের পক্ষ নিয়েছে। নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে বীরযোদ্ধা ইন্দ্রজিৎ মেঘনাদ যখন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার আগে ইষ্ট দেবতার পূজায় মগ্ন, তখন চাচা বিভীষণের সহায়তায় লক্ষ্মণ যজ্ঞাগারে প্রবেশ করে। এ ব্যাপারটি মেঘনাদকে স্তম্ভিত করে। ঘরের শত্রু চাচা বিভীষণকে নিজ জাত ভোলার জন্য, নিজ পক্ষ ত্যাগ করার জন্য রাগে-ক্ষোভে-আবেগে যে কথাগুলো বলেছেন, তারই সুসংহত কাব্যিক উপস্থাপন ঘটেছে ‘বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ’ কাব্যাংশে।



