ডেঙ্গুতে অন্তঃসত্ত্বার মৃত্যু, মাকে খুঁজছে চার বছরের মৈত্রী
- দেড় মাসে মারা গেল ৩ প্রসূতি
- মোট মৃত্যু ৩৩
- আক্রান্ত সাড়ে ৬ হাজার

মেয়ে মৈত্রীর সঙ্গে আনিসা দাশ মলি
মায়ের সঙ্গে সময় কাটাতে দুর্গাপূজায় বাপের বাড়ি আনোয়ারার খিলপাড়ায় গিয়েছিলেন আনিসা দাশ মলি। সঙ্গে চার বছরের মেয়ে মৈত্রী। অন্তঃসত্ত্বা মলির একদিকে পূজার আনন্দ, অন্যদিকে নতুন অতিথি বরণের অপেক্ষা। বেশ হাসিখুশিতে কাটছিল সময়। কিন্তু একটি ঝড় মুহূর্তেই সবকিছু এলোমেলো করে দিয়ে চলে গেল। ডেঙ্গু কেড়ে নিয়েছে মলি ও অনাগত সন্তানের প্রাণ।
মলি-রাজীব সরকারের প্রথম সন্তান মৈত্রী সরকার। মেয়েটি সারাক্ষণ মায়ের সঙ্গে থাকত। এখন তার সময় কাটে না। কখনো কখনো খেলে। পুতুল, চকোলেট দিয়ে ছোট্ট মৈত্রীকে মায়ের স্মৃতি ভুলিয়ে রাখতে চায় বাবা, দাদি, স্বজনেরা। কিন্তু মৈত্রী ভাবে তার মা ফিরে আসবে।
গত রবিবার (২৫ অক্টোবর) ভোরে মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ২৫ বছরের মলি মারা যায়। ওইদিন নগরের বলুয়ার দিঘি মহাশশ্মানে তার শেষকৃত্য হয়। গত দেড় মাসে চট্টগ্রামে এ নিয়ে তিনজন অন্তঃসত্ত্বা নারী ডেঙ্গুতে মারা গেলেন। ১১ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩৫ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা অর্পিতা দাশ মারা যায়। এক সপ্তাহ পর নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা যায় মণি আকতার নামে অপর অন্তঃসত্ত্বা নারী।
এবার ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় সাড়ে ৬ হাজারের বেশি। সরকারি হিসাবে মারা যায় ৩৩ জন। এরমধ্যে ১৮ জন নারী। দু-একটি মৃত্যুর হিসাব সরকারি রেকর্ডে নেই। সব হাসপাতাল থেকে প্রতিদিন ডেঙ্গু রিপোর্ট আসে না। ফলে কিছু আক্রান্ত ও মৃত্যু বাইরে থেকে যায়।
রবিবার মারা যাওয়া মলি ছিলেন ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ১৭ নভেম্বরে তার সন্তান জন্ম দেওয়ার কথা ছিল। মলি থাকতেন নগরের হামজারবাগ এলাকার ভাড়া বাসায়। পূজা উপলক্ষে বাপের বাড়ি গিয়েছিলেন। তারা দুই বোন, মলি ছোট। বাবা মারা গেছেন ছোটবেলায়। মা ছবি দাশ একা থাকেন বাড়িতে। তাই মায়ের কাছে পূজার সময়টা কাটাতে গিয়েছিলেন মলি।
সেখানেই জ্বরে আক্রান্ত হন। মলির চাচাতো ভাই শুভ্র দাশ জানান, ২০ অক্টোবর বাড়িতে মলির জ্বর আসে। জ্বরের ওষুধ খাওয়ার পর কমে যায়। শুক্রবার সকালে মেয়েসহ শহরের বাসায় চলে আসেন মলি। ওইদিনই নগরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। কিন্তু তার অবস্থা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খারাপ হচ্ছিল। পেটের বাচ্চার নড়াচড়া ছিল না। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানানো হয় বাচ্চা মারা গেছে।
গত দেড় মাসে চট্টগ্রামে এ নিয়ে তিনজন অন্তঃসত্ত্বা নারী ডেঙ্গুতে মারা গেলেন। ১১ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩৫ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা অর্পিতা দাশ মারা যায়। এক সপ্তাহ পর নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা যায় মণি আকতার নামে অপর অন্তঃসত্ত্বা নারী
এই অবস্থায় স্বজনেরা শনিবার সকালে মলিকে মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করেন। অবস্থা সংকটাপন্ন ছিল। তাকে বাঁচানোর জন্য নানা চেষ্টা চলে। কিন্তু মলির এক্সপান্ড ডেঙ্গু সিনড্রোম দেখা দেয়। বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আক্রান্ত হয়।
মলির স্বামী রাজীব সরকার জানান, ‘তার (মলি) ডেঙ্গু পজিটিভ আসছিল। রবিবার ভোরে আইসিইউতে তার মৃত্যু হয়। আগামী মাসে ডেলিভারির তারিখ ছিল তার। আকস্মিক জ্বরে এভাবে চলে যাবে ভাবতে পারিনি। কোনো কথায় বলতে পারেনি সে। এখন মেয়েটাকে নিয়ে আমি আর আমার মা আছি।’




