ডেঙ্গু আক্রান্ত ১৬ শতাংশের বয়স ১৫ বছরের কম
- মোট মৃত্যু ৩৭৭, ১৫ বছরের নিচে ৫৬
- বয়স যত কম মৃত্যুঝুঁকি তত বেশি
- জ্বর হলেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের ডেঙ্গু বিশেষায়িত ওয়ার্ডের ৫১ নম্বর শয্যায় চিকিৎসা নিচ্ছে ১১ মাস ২৩ দিন বয়সী জাওয়াদ। ছোট্ট হাত-পায়ে আর ক্যানুলা করার জায়গা নেই। বাধ্য হয়ে স্যালাইন চলছে মাথায় ক্যানুলা করে। পাশে ৫২ নম্বর শয্যায় চিকিৎসা চলছে জাওয়াদের বড় ভাই ডেঙ্গু আক্রান্ত আজোয়াদের (৪ বছর)। তাদের আরেক ভাইয়ের জ্বর থাকার পরও গ্রামে রেখে এসেছেন অভিভাবকরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর মশাবাহিত এ রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে এসেছে ১ লাখ ২১ হাজার ৬৯৯ ব্যক্তি। এর মধ্যে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা ২০ হাজার ৪টি। আর এ সময়ে মারা গেছে ৩৭৭ ব্যক্তি, এর মধ্যে ৫৬ জনের বয়সই ১৫ বছরের কম।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু আক্রান্ত হচ্ছে। মারাও যাচ্ছে অনেকে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া হিসাবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ চিত্র উঠে আসছে না। আবার হাসপাতালের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবের গরমিলও থাকে। পাশাপাশি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ‘৫ বছরের ব্যবধানে হিসাব রাখার পদ্ধতি’র কারণেও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত শিশুদের (১৮ বছর পর্যন্ত) সঠিক সংখ্যা জানা যায় না।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেনের মতে, ‘যেকোনো রোগের ক্ষেত্রেই শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও বৃদ্ধরা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। ডেঙ্গুতেও এমন। শিশুরা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেই সেকেন্ডারি হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে রাখতে হবে। এতে শিশুদের জটিলতা কম হবে এবং মৃত্যুঝুঁকি কমে যাবে।’
গতকাল শনিবার সকালে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের ডেঙ্গু বিশেষায়িত ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, জাওয়াদের দেখাশোনা করছেন মা। আর নানু আজোয়াদের দেখভালে ব্যস্ত। জাওয়াদের মা বলছিলেন, ‘দুদিনের ব্যবধানে ছেলেদের জ্বর এসেছে। জ্বরের মাত্রা ছিল ১০৫ ডিগ্রি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা দ্রুত ঢাকা নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। আর সাত বছরের বড় ছেলের জ্বরের মাত্রা কম থাকায় তাকে দাদা-দাদির কাছে রেখে এসেছি।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দুই শিশুর মতো এই হাসপাতালে মশাবাহিত এ রোগে ৫৮ শিশু চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে রাত ১২টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভর্তি হয়েছে ৬ জন নতুন রোগী। এক শিশু মারা গেছে। আর চলতি বছর এই হাসপাতালে ৭৫৫ শিশু ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। মারা গেছে ৬ শিশু।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মো. কামরুজ্জামান বলছেন, ‘ছোট শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তুলনামূলক কম থাকে। নিজেরা শারীরিক সমস্যাগুলো প্রকাশ করতে পারে না। পাশাপাশি অসুস্থ হলে খাবার বন্ধ করে দেয়। তখন জটিলতা আরও বেড়ে যায়।’ তাই জ্বর হলেই দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেন এ চিকিৎসক। জ্বর হলে তিন দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করার কারণে অনেক শিশুর জটিলতা বাড়ে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, ডেঙ্গু আক্রান্ত ৬ হাজার ২৭০ শিশুর বয়স ৫ বছরের কম। এ বয়সী ২৪ শিশু মারা গেছে। আবার ৫ থেকে ১০ বছর বয়সী ৬ হাজার ২৩৮ শিশু আক্রান্ত হয়েছে, মারা গেছে ১৮ শিশু। ১০ থেকে ১৫ বছরে ৭ হাজার ৪৯৬ শিশু আক্রান্ত হলেও মারা গেছে ১৪ জন। অর্থাৎ ছোট শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি।
গত ৯ অক্টোবর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে ২ বছর ৭ মাস বয়সী মুসকান। পূর্ব শেওড়াপাড়ার মুসকানের চিকিৎসা চলে শিশু হাসপাতালে। এ হাসপাতালে মারা যাওয়া চার শিশুর তথ্য পাওয়া গেছে, যাদের সবার বয়স ১০ বছরের নিচে।
বারডেম জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট আবিদ হোসেন মোল্লা বলছেন, ‘সামগ্রিকভাবে বয়স যত কম হয়, মৃত্যুঝুঁকি তত বেশি থাকে। অন্যান্য রোগের মতো ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। সেই দিক থেকে কম বয়সী শিশুদের ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় বেশি।’ ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত চিকিৎসার পাশাপাশি যত্নও বেশি দরকার বলে জানিয়েছেন তিনি।
এই চিকিৎসক আরও বলছেন, দ্বিতীয়বার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে শিশুদের ঝুঁকি বেড়ে যায়। মশাবাহিত এ রোগে আক্রান্ত হলে রক্তনালি থেকে জলীয় অংশ বের হয়ে রক্তচাপ কমে যায়। এতে শিশুর মস্তিষ্ক, হার্ট, কিডনি, ফুসফুসে রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক থাকে না। আবার প্রোটিনের ঘাটতি ও প্লাটিলেট কমে যাওয়ার কারণে রক্তপাত হওয়ারও আশঙ্কা থাকে।
ডেঙ্গু আক্রান্ত কয়েক শিশু রোগীর অভিভাবকরা বলছেন, তারা সন্তানের সুরক্ষার বিষয়ে সচেতন ছিলেন। কখন সন্তানকে মশা কামড় দিয়েছে তারা বুঝতে পারেননি।
এ বিষয়ে চিকিৎসক মো. কামরুজ্জামানের ভাষ্য, ছোট শিশুরা নড়াচড়া কম করায় ও নিজেরা মশা না তাড়াতে পারায় তাদের মশায় কামড় দেওয়ার সুযোগ বেশি পায়। এ ছাড়া অনেক শিশু ডিভাইস ব্যবহার করে, এতেও শিশুরা খেয়াল রাখতে কম পারে। আবার টয়লেট ব্যবহারের সময়ও মশা কামড়িয়ে থাকে। শিশুদের দিকে বাড়তি মনোযোগ দিতে বললেন এই শিশুবিষয়ক চিকিৎসক।





