লাইসেন্স লাগবে না অটোরিকশাচালকের
- নীতিমালা চূড়ান্ত যেকোনো সময় জারি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশ সয়লাব ব্যাটারিচালিত ই-রিকশায়, যা পরিচিত অটোরিকশা নামে। গলি থেকে শুরু করে মহাসড়ক পর্যন্ত কোনো শৃঙ্খলা ছাড়াই চলছে অনিবন্ধিত এই বাহন। নিত্যদিনই অসংখ্য দুর্ঘটনায় ঘটছে হতাহতের ঘটনা। যার বেশিরভাগেই সম্পৃক্ততা ই-রিকশার। দেশে কী পরিমাণ ই-রিকশা চলছে, এর কোনো পরিসংখ্যান নেই খোদ সরকারের কাছেই। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংখ্যাটি এক কোটির কাছাকাছি। এমন প্রেক্ষাপটে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ এবং ই-রিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা চূড়ান্ত করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। যে নীতিমালা অনুযায়ী অটোরিকশাচালকদের লাগবে না কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স। তবে ই-রিকশার জন্য নিতে হবে সরকারি কর্তৃপক্ষের নিবন্ধন। একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) বিপরীতে এক সিটিতে নিবন্ধন নেওয়া যাবে সর্বোচ্চ পাঁচটির। রাজধানী ঢাকায় আটটি জোনে চলাচল করবে আট রঙের রিকশা। তবে জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং বাস চলাচলের প্রধান সড়ক বা করিডরে পারবে না চলতে। কোন ই-রিকশা কোন সড়কে চলবে, তা যৌথভাবে নির্ধারণ করবে সিটি করপোরেশন এবং পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। ই-রিকশা শুধু চলাচল করবে অভ্যন্তরীণ সড়ক বা গলিপথে। নিবন্ধন ছাড়া চলাচল করতে পারবে না কোনো ই-রিকশা। আর নীতিমালা লঙ্ঘনে জরিমানা হবে অনধিক ৫ হাজার টাকা।
এমন নীতিমালার সত্যতা নিশ্চিত করে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম আগামীর সময়কে বললেন, ‘স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯ এবং স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর আলোকে ই-রিকশা ব্যবস্থাপনার জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। সুষ্ঠু ও কার্যকরভাবে এ নীতিমালা বাস্তবায়ন করা গেলে নগরীর যানজট নিয়ন্ত্রণ, যান চলাচলে শৃঙ্খলা এবং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নীতিমালা তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে। নীতিমালাটি আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ বিভাগে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে। ভেটিং শেষে যত দ্রুত সম্ভব জারি হবে।’
সরকারের এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করার তাগিদ দিলেন সড়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তাদের ভাষ্য, এতে সড়কে দুর্ঘটনা আরও বাড়বে। সরকারকে এটি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘ই-রিকশা দুর্ঘটনাতেই মৃত্যু বেশি। এসব রিকশার চালকদের প্রশিক্ষণ ও ড্রাইভিং লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। চালকদের আইনি কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। নইলে সড়ক দুর্ঘটনা আরও বাড়বে।’
প্রায় অভিন্ন সুর বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরীর কণ্ঠেও। তিনি বললেন, ‘বর্তমানে সারা দেশে ৮০ লাখের মতো ই-রিকশা চলছে। শুধু রাজধানীতেই রয়েছে ১২ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। এসব অটোরিকশা দুর্ঘটনায় আহত হয়ে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা সদর হাসপাতালে ২০ থেকে ২৫ জন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৮ থেকে ১০ জন ভর্তি হচ্ছেন। প্রতিদিন এসব ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দুর্ঘটনায় হাত বা পা ভেঙে পঙ্গু হচ্ছেন ৩৫ থেকে ৪০ জন। অটোরিকশার নীতিমালা তৈরির পাশাপাশি চালকদের লাইসেন্স ও খণ্ডকালীন প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে, যা ভূমিকা রাখবে দুর্ঘটনা কমাতে।’
কী আছে প্রস্তাবিত নীতিমালায়
ই-রিকশা নিবন্ধনের ক্ষেত্রে নিতে হবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) অথবা সরকারি পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের অটোমোবাইল শাখার প্রত্যয়ন। পাশাপাশি ১ হাজার টাকার বিনিময়ে নিতে হবে ট্রাফিক বিভাগের ফিটনেস সনদও। ই-রিকশাচালকের ড্রাইভিং লাইসেন্সের কথা উল্লেখ করা না হলেও প্রশিক্ষণের বিষয়ে বলা হয়েছে— কর্তৃপক্ষ কর্তৃক স্বীকৃত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চালকদের জন্য ট্রাফিক আইন, সড়ক নিরাপত্তা, ব্যাটারি ও ই-রিকশা রক্ষণাবেক্ষণ এবং আনুষঙ্গিক বিষয়ে প্রশিক্ষণের আয়োজন করবে। তবে এর আগে গত ৩১ আগস্ট স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ-সংক্রান্ত সভায় ই-রিকশা চালকদের ৫০০ টাকার বিনিময়ে পাঁচ বছরের জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্স নেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল। পরে অটোরিকশা চালকদের রাজধানী জুড়ে আন্দোলনের পর সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে সরকার।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, ই-রিকশা তৈরির কারখানাগুলোকেও নির্দিষ্ট ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে। বুয়েট বা কোনো প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ই-রিকশা তৈরি করতে হবে। কারখানার জন্য সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন বা পৌরসভা থেকে লাইসেন্স নিতে হবে। ঢাকায় প্রতিটি জোনের ব্যাটারিচালিত ই-রিকশার জন্য আলাদা রঙ নির্ধারণ করা হবে। এক জোনের ই-রিকশা যাতে অন্য জোনে চলাচল করতে না পারে, সে ব্যবস্থাও রাখা হবে। এ ছাড়া প্রধান সড়কে ই-রিকশা চলাচল করতে পারবে না। ঢাকায় দুই ও চার যাত্রী বহন করতে পারে, এমন ই-রিকশাকে নিবন্ধন দেওয়া হবে। দুই যাত্রীর রিকশার জন্য নিবন্ধন ফি ৮ হাজার এবং চার যাত্রীর জন্য ১০ হাজার টাকা লাগবে। জেলা শহর ও গ্রামীণ এলাকায় দুই, চার ও ছয় যাত্রী বহনকারী ই-রিকশা নিবন্ধনের সুযোগ থাকবে। কর্তৃপক্ষ প্রতিটি নিবন্ধিত ই-রিকশার জন্য একটি কিউআর (QR) কোডযুক্ত ইউনিক নিবন্ধন নাম্বার ও নাম্বার প্লেট দেবে এবং কিউআর কোডযুক্ত নিবন্ধন নাম্বার ই-রিকশার দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন করতে হবে।
চার্জিং ব্যবস্থার বিষয়ে নীতিমালায় বলা হয়েছে, পর্যায়ক্রমে ই-রিকশার চার্জিং পয়েন্টগুলোতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হবে। এসব চার্জিং পয়েন্টের জন্যও সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার কাছ থেকে লাইসেন্স নিতে হবে। অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে চার্জ দিলে তা অপরাধ বলে গণ্য হবে। নির্ধারিত নকশা ও কারিগরি মান মেনে তৈরি ই-রিকশাই নিবন্ধনের আওতায় আসবে। একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে যেকোনো এক বা একাধিক সিটি করপোরেশন থেকে অনধিক পাঁচটি ই-রিকশার নিবন্ধন নেওয়া যাবে। এক সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য কোনো সিটি করপোরেশন এলাকায় বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে চালানো যাবে না। শুধু বুয়েট কর্তৃক নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ই-রিকশা নিবন্ধন পাবে। সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন এলাকার যেকোনো পাবলিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ অথবা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অটোমোবাইল বিভাগ অথবা সরকার কর্তৃক নির্ধারিত প্রতিষ্ঠান অনুমোদিত ডিজাইন স্পেসিফিকেশন মোতাবেক প্রস্তুতের প্রত্যয়ন দেবে। পর্যায়ক্রমে সব ই-রিকশা আনা হবে বীমার আওতায়। প্রতিটি ই-রিকশার ইকোনমিক লাইফটাইম হবে নিবন্ধনের তারিখ থেকে ১২ বছর। ই-রিকশায় স্পিডোমিটার বা ওডোমিটার স্থাপন করতে হবে। চলাচল করতে পারবে না ফুটপাতে। সবসময় সড়কের বাম লেনে চলাচল করবে। স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় বা জনবহুল স্থানে ই-রিকশার সর্বোচ্চ গতি হবে ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পুরাতন বা অকার্যকর ব্যাটারি বা তার অংশবিশেষ উন্মুক্ত স্থান, মাটি, জলাশয় বা সাধারণ বর্জ্যে নিক্ষেপ বা পোড়াতে পারবে না।



