‘আই অ্যাম অ্যাট গান পয়েন্ট’- বলেছিলেন তাহসিফ

কে এম তাহসিফ সাউরি। ছবি: তাহসিফের ফেসবুক পেজ
প্রাণ সংশয়ের আশঙ্কা করেছিলেন কে এম তাহসিফ সাউরি; সেকথা এক প্রতিবেশীকে বলেছিলেন তিনি।
বিমানবাহিনীর সাবেক এই ফ্লাইট লেফটেন্যান্টের মরদেহ উদ্ধারের পরদিন নানা আলোচনার মধ্যে আজ বৃহস্পতিবার এই তথ্য প্রকাশ করলেন তার প্রতিবেশী সৈয়দ গোলাম মাহমুদ নামে এক ব্যক্তি।
ঢাকার উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরে একটি ফ্ল্যাটে পরিবারের সঙ্গে থাকতেন তাহসিফ। বৃহস্পতিবার বিকালে ১৮ নম্বর সেক্টরের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে তার জানাজার পর আগামীর সময়ের সঙ্গে কথা হয় মধ্যবয়সী গোলাম মাহমুদের।
তিনি বলেন, তাহসিফ আতঙ্কিত অবস্থায় ছিলেন এবং এ বছরের শুরুতে নির্বাচনের আগে একদিন ঘণ্টাখানেকের আলাপে জীবন বিপন্ন অবস্থায় থাকার কথা বলেছিলেন।
কী বলেছিলেন- জানতে চাইলে গোলাম মাহমুদ বলেন, ‘তাহসিফ বলেছিল- আই অ্যাম ইন এ গান পয়েন্ট (আই অ্যাম অ্যাট গান পয়েন্ট)। ভেরি ডেঞ্জার পয়েন্টের মধ্যে আমি আছি।’
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পলায়নের ভিডিওর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতায় নাম এসেছিল তাহসিফের। এরপর বিমানবাহিনী থেকে অবসর নিতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। তবে তার দাবি, ওই ভিডিওর সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা ছিল না।
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বাসা থেকে এক বন্ধুর সঙ্গে বেরিয়েছিলেন তাহসিফ। মধ্যরাত থেকে নিখোঁজ ছিলেন তিনি। এক দিন পর বুধবার বিকালে রাজধানীর উত্তরখান থানা এলাকার রাজাবাড়ি নৌঘাট এলাকায় তুরাগ নদে তার মরদেহ পাওয়া যায়।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে ময়নাতদন্তের পর ছেলের মরদেহ গ্রহণ করেন তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম।
তার সন্দেহ, তাহসিফকে হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। তবে কারা, কেন এই হত্যাকাণ্ড ঘটাল, সেই বিষয়ে কোনো ধারণা দিতে পারেননি তিনি। তিনি বলছেন, সরকার তদন্ত করলে তা বেরিয়ে আসবে।
তাহসিফ গত জুলাই মাসে এক পডকাস্টে অংশ নিয়ে বলেছিলেন, কোনো ধরনের হেনস্তার শিকার হবেন না, এই শর্তে বিমানবাহিনী ছাড়তে রাজি হয়েছিলেন তিনি। তবে তারপরও তাকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছিল।
কোন শঙ্কায় ছিলেন তাহসিফ- এই প্রশ্নে তার প্রতিবেশী গোলাম মাহমুদ বলেন, ‘তাহসিফ বলেছিল- যেহেতু আমি জুলাইয়ে এক পক্ষকে সমর্থন করেছি, সেহেতু অন্য পক্ষের রোষানলে আমাকে পড়তেই হবে।’
তাহসিফকে ‘স্মার্ট’ এক যুবক হিসেবেই দেখতেন গোলাম মাহমুদ। প্রতিবেশী অন্যরাও একই চোখে দেখত তাকে।
তাহসিফদের ভবনের পাশের ভবনের বাসিন্দা একজন আগামীর সময়কে বলেন, ‘তাহসিফ খুবই নম্র-ভদ্র ছিল, বন্ধুসুলভ ছিল, সবার সাথেই মিশত। আমার ছোট ছেলের সাথে ফুটবল খেলত।’
জানাজা শেষে উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টর কবরস্থানে যখন তাহসিফকে দাফন করা হয়, তখন স্থানীয়দের মধ্যে ছিল স্বজন হারানোর শোক।
জানাজায় অংশ নেওয়া জাতীয় নাগরিক পার্টির কার্যনির্বাহী সদস্য ফরহাদ সোহেল আগামীর সময়কে বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ডের পিছনে কারা আছে? রাষ্ট্রীয় কোনো হাত আছে, নাকি ভারতের ‘র’-এর কোনো হাত আছে? এই জিনিসগুলো অবশ্যই জনগণের সামনে আনা উচিত।’
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশ ছেড়ে বিমানে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি ছিল বিশ্ব জুড়ে আলোচিত। তবে ওই ঘটনার কেবল একটি ভিডিও পাওয়া যায়, যেখানে তাকে একটি হেলিকপ্টারে চড়তে দেখা যাচ্ছিল। ওই হেলিকপ্টারে করে কুর্মিটোলায় যাওয়ার পর সামরিক বাহিনীর একটি বিমানে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাকে।
তখন কেউ কেউ দাবি করেছিলেন, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফই সেই ভিডিওটি করেছিলেন। আবার তিনি করেননি, তবে তিনি প্রকাশ করেন, এমন দাবিও করেন কেউ কেউ। তাকে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার চর হিসেবেও দেখানো হয়েছিল একটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে।
এ বছরের ২১ জুলাই প্রচারিত পডকাস্টে তাহসিফ এসবকে অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, ‘আমি জানি না, তাদের উদ্দেশ্য কী? প্রতিবেদনে ক্লিয়ারলি লিখেছে যে, আমি ভিডিওটা ছড়িয়েছি। আমি যে শুট করেছি, এটাও কিন্তু তারা বলেনি। বলেছে, যে … ভিডিওটি করেছে এবং আমি ভিডিওটি নাকি ছড়িয়ে দিয়েছি।
‘আমি যদি ভিডিওটা করেও থাকি বা ছড়িয়েও থাকি, হোয়াট ইজ দা প্রুফ দে হ্যাভিং—আমি এটা জিজ্ঞেস করতে চাই। আর এটাও হতে পারে যে, এজন্যই আমি আজকে হয়তো এয়ারফোর্সে নেই।’
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ব্যর্থতার দিকটি প্রকাশ করেছে দাবি করে তা তদন্তের দাবি জানিয়েছে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন,
তাহসিফের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই এবিষয়ে কথা বলবেন তিনি।
তাহসিফের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এখনো পাওয়া যায়নি। তবে পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে মরদেহে জখমের কোনো চিহ্ন না পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তবে তাহসিফের নাক দিয়ে রক্তপাতের আলামত পাওয়ার কথা লেখা হয়েছে সুরতহাল প্রতিবেদনে। বিবরণ অনুযায়ী, তার দুই হাত মাথার সামনে বাঁকানো ও মুষ্টিবদ্ধ অবস্থায় ছিল। পেট ছিল ফোলা।
তাহসিফের হাতে ঘড়ি ছিল, তার আইফোনটিও ছিল পকেটে। ফলে তিনি ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছিলেন, এমন ধারণা নাকচ করছেন অনেকে।
এনায়েতুল করিমের ভাষ্য অনুসারে, নিখোঁজ হওয়ার আগে মঙ্গলবার সারা দিন তাহসিফ ছিলেন তার মায়ের সঙ্গে। কেনাকাটা করেন তারা। বাসায় ফেরার পর সন্ধ্যায় দীপ নামে এক বন্ধুর ডাকে ঘর থেকে বের হন তার মোটরসাইকেলটি নিয়ে।
তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবার যোগাযোগ করেছিল দীপের সঙ্গে। তবে দীপ তাদের জানান, ওই রাতেই তাহসিফকে তার বাসার কাছে ছেড়ে গিয়েছিলেন তিনি।
২৮ বছর বয়সী তাহসিফ বিমানবাহিনী ছাড়ার পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এবং নেত্র নিউজের সঙ্গে কাজ করেছিলেন বলে জানান তার বাবা এনায়েতুল করিম। তিনি বলেন, সর্বশেষ ভার্গ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসন ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন তাহসিফ।







